আনোয়ারার সিংহোরায় ক্ষেত্রপাল মন্দিরের পাশের পুকুরটির পাড় প্রতি বর্ষায় একটু একটু করে ভাঙে। পাড় ভাঙলে কী হয়, তা এলাকার মানুষ জানেন- মাটির সঙ্গে যাবে বিদ্যুতের খুঁটি, তারপর ঘরবাড়ি, তারপর মন্দিরটাই।
তাই তাঁরা উপজেলায় দরখাস্ত দিয়েছিলেন, একটি গাইড ওয়ালের জন্য।
সরকারের ডিজিটাল ক্রয়-খাতায় সেই গাইড ওয়াল হয়ে গেছে। ই-জিপির প্রকাশিত নথি বলছে, কাজটি “সম্পন্ন” ৭ এপ্রিল ২০২৬।
১৬ জুলাই সেখানে গিয়ে দেখা গেল, পুকুরপাড়ে কিছুই হয়নি।
মন্দিরসংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা লক্ষ্মী চৌধুরীকে নথির ছাপানো পাতাটি দেখানো হলে তিনি বললেন:
“আমরা তো বড় কিছু চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম পুকুরের পাড়টা যেন রক্ষা করা হয়। এই পাড় ভেঙে গেলে শুধু মাটি যাবে না- আমাদের ঘরবাড়ি, মন্দির, বিদ্যুতের খুঁটি সব ঝুঁকিতে পড়বে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা জানতেই পারলাম না যে আমাদের জন্য কাজের টাকা এসেছে, কাজও নাকি শেষ হয়ে গেছে! অথচ মাঠে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, কিছুই হয়নি। কাগজে যদি কাজ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই দুর্ভোগের দায় নেবে কে? আমরা শুধু চাই, আমাদের চোখের সামনে যেন মন্দিরটা বা কারও ঘর ধসে না পড়ে।”
মন্দির কমিটির সদস্য রবি চৌধুরী জানালেন, উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরে গেলে তাঁদের বলা হয়েছিল- টাকা এখনো আসেনি।
তাঁকেও কাগজটি দেখানো হয়। তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর, খানিক বাকরুদ্ধ থেকে: “আমাদেরকে কেউ বলছে না যে গাইড ওয়ালের জন্য বরাদ্দ এসেছে… আপনারা আমাদের জন্য কিছু করুন, আমাদের মন্দিরটি বাঁচান।”
[সরকারি কেনাকাটার ডিজিটাল ব্যবস্থা ই-জিপি বানানো হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। চট্টগ্রাম জেলার তিন মাসের (২০২৬ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে) ২ হাজার ১৮৫টি সরকারি চুক্তির প্রতিটি নথি এক এক করে পড়ে দেখেছেন এ প্রতিবেদক; মোট মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ১৪ ধরনের যাচাই মিলিয়ে ১ হাজার ৬৪৯টি চুক্তিতেই অন্তত একটি “খটকা” বা “সতর্ক সংকেত” মিলেছে- খটকা মানে প্রমাণিত দুর্নীতি নয়, প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ চতুর্থ পর্ব।]
এক চুক্তি, দশ কাজ, উল্টো ক্যালেন্ডার
গাইড ওয়ালটি একটি বড় চুক্তির ছোট অংশ। তাহাসিন এন্টারপ্রাইজের ২৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ওই চুক্তির ভেতরে দশটি আলাদা কাজ- আটটি রাস্তা, দুটি গাইড ওয়াল।
নথিতে চুক্তি সই ৩০ এপ্রিল। কাজ শুরুর প্রস্তাবিত তারিখ ১৫ এপ্রিল। আর সমাপ্তি তারও আট দিন আগে- ৭ এপ্রিল।
অর্থাৎ কাগজ অনুযায়ী কাজটি শুরু হওয়ার আগেই শেষ, আর শেষ হয়েছে চুক্তি সইয়ের তেইশ দিন আগে।
এটি একক ঘটনা নয়।
চট্টগ্রামের তিন মাসের ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির মধ্যে ৯৫৪টিতে কাজ শুরুর প্রস্তাবিত তারিখ চুক্তি সইয়েরও আগের- প্রতি ১০০টির প্রায় ৪৪টি। আর ১৪৪টি চুক্তিতে কাজ “শেষ” হয়ে গেছে চুক্তি সইয়ের আগেই; এগুলোর মোট মূল্য ২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
আরও এক ধাপ আগে গেলে সংখ্যাটি আরও অস্বস্তিকর: ৮২৯টি চুক্তিতে কাজ শুরুর তারিখ কার্যাদেশেরও আগের। অর্থাৎ কে কাজ পাচ্ছেন তা ঘোষণার আগেই কাজ শুরুর দিন ঠিক করা।
কারণটি মৌলিক: ই-জিপি চুক্তি সইয়ের আগের তারিখে কাজ “শুরু” বা “শেষ” দেখানো আটকায় না।
সংখ্যাটি প্রথম শোনার পর ব্যবস্থাটির ভেতরের মানুষদের প্রতিক্রিয়া প্রায় এক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক ২৬ জুলাই কাগজটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “না না, এটা কোনো সিস্টেমে নাই। এটা একদম পুরা ভুল। একদম অবাস্তব।”
প্রথমে তিনি একটি ব্যাখ্যা খুঁজলেন- হয়তো তারিখটা পেছনের নয়, সামনের কোনো মাসের। কিন্তু যখন স্পষ্ট হলো তারিখগুলো চুক্তিরও আগের, সুর কড়া হলো: “ভুল করছে যারা, না জানে একবারে, গাধা না হলে এত বড় ভুল করার কথা না, পুরা ননসেন্স।”
নিজে নিশ্চিত হতে তিনি তখনই ফোন করলেন ই-জিপিতে কাজ করা এক সহকর্মীকে। ওপাশ থেকে জবাব এল একই সুরে: “না এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব না।”
সম্ভব হয়েছে। এক জেলার তিন মাসেই ৯৫৪ বার।
দপ্তরের ফাইলে পেন্সিলের দাগ
সরেজমিনের তিন দিন পর, ১৯ জুলাই সকালে আনোয়ারা উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরে বসে জানতে চাওয়া হয়- দশটি কাজের কতগুলো শেষ।
ফাইলের পাতা উল্টে উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহেদুল আলম চৌধুরী পড়ে শোনালেন: ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০ নম্বর শেষ।
এই প্রতিবেদক মনে করিয়ে দেন- ৭ ও ১০ নম্বর, অর্থাৎ দুটি গাইড ওয়ালই মাঠে নেই। সরেজমিনে দেখা, স্থানীয়রাও তা-ই বলেছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী তখন কক্ষের বাইরে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসাইনকে ফোন করেন। ফোন রাখতেই হিসাব বদলে যায়- ৭, ৮ ও ১০ নম্বর, এই তিনটি হয়নি।
এইমাত্র বললেন হয়েছে, এখন বলছেন হয়নি- এ কথা তোলার পর তিনি ফাইল খুলে দেখান: “এই দেখুন, পেন্সিল দিয়ে দাগ দেওয়া হয়েছে, এগুলো হয়নি।”
ই-জিপির খাতায় যে কাজ কালিতে “সম্পন্ন”, দপ্তরের নিজের ফাইলে তা ঝুলে আছে পেন্সিলের দাগে।
কাজ না হলে বিল থেকে সেই অংশ বাদ যাবে- উপজেলা প্রকৌশলীর এই দাবিটি যাচাই করার একটাই পথ ছিল: দপ্তরের পরিমাপ বহি (মেজারমেন্ট বুক) ও বিল-নথি। সেগুলো দেখতে চাইলে তিনি রাজি হননি; বলেন, সরকারি নথি দেখানো যাবে না।
দাবিটি নথিতে মেলানোর পথ দপ্তরই বন্ধ রেখেছে।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-১: “পেন্সিলের দাগ”]
ঠিকাদারের হিসাবও মেলে না। ২৩ জুলাই মুঠোফোনে তাহাসিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রওশন আক্তার প্রথমে বলেন, “নয়টা কাজ শেষ করছি।” কয়েক মিনিট পর দুটি গাইড ওয়ালের কথা তুলতেই তিনি বলেন, “না না, এগুলো তো হয় নাই… বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে আর করতে পারি নাই তো।” একটাও হয়নি? “না না, একটাও হয় নাই।”
দশটির নয়টি শেষ হলে বাকি থাকে একটি; অথচ তিনি নিজেই বলছেন দুটি হয়নি।
আর ই-জিপির তারিখ নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট: “ইজিপিতে চুক্তির নথিতে তারিখ কী লেখা আছে না আছে- এসব সরকারি অফিসের বিষয়, তারাই কাজটি করে।”
কথাটি ফেলে দেওয়ার নয়। প্রকাশিত পাতাটি ঠিকাদার তৈরি করেন না; করে ক্রয়কারী দপ্তর।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-২: “একটাও হয় নাই”]
বালুর বস্তা দিয়ে গ্রামবাসীর গাইড ওয়াল
আনোয়ারারই আরেকটি চুক্তিতে হাইলধর ইউনিয়নের উত্তর ইছাখালীতে মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম চৌধুরী সড়কে আরসিসি রাস্তা ও গাইড ওয়াল- দুটি কাজ এক প্যাকেজে। নথিতে দুটোই “সম্পন্ন” ৭ এপ্রিল, কার্যাদেশেরও ১৪ দিন আগে।
মাঠে মিলেছে একটি। রাস্তা হয়েছে, তা-ও স্থানীয়দের হিসাবে জুন মাসে। গাইড ওয়ালের জায়গায় সারি সারি বালুর বস্তা- সেগুলো দিয়েছেন গ্রামবাসী নিজেরাই।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলছিলেন, “মাসখানেক হচ্ছে আরসিসি রাস্তা হয়েছে, গাইডওয়াল হয়নি। রাস্তার দুই পাশে আমরা বালুর বস্তাগুলো দিয়েছি, যাতে রাস্তাটি ঠিকে থাকে। সরকার শুধু রাস্তা দিয়েছে, গাইডওয়াল দেয়নি।”
সরকারের খাতায় অবশ্য দুটোই “দেওয়া” হয়ে গেছে- তিন মাস আগেই।
যে সংযোগ জানুয়ারিতে “চালু”, চুক্তি এপ্রিলে
কাজটি মাঠে হয়েছে কি না, তা সবসময় চোখে দেখে যাচাই করা যায় না। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যন্ত্র নিজেই সাক্ষী রাখে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর তিনটি চুক্তিতে কম্পিউটার, সিসিটিভি ও ইন্টারনেট সংযোগের কাজ নথিতে “শেষ” জানুয়ারিতে- অথচ চুক্তি সই এপ্রিল-মে মাসে, ৯৯ থেকে ১১০ দিন পরে। দুটি চুক্তিতে শুরু-শেষের তারিখ হুবহু এক, যেন এক নথি থেকে আরেকটিতে কপি-পেস্ট হয়েছে।
সত্যিটা জানার জন্য ২২ জুলাই চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবদুন নূরের কাছে লিখিত প্রশ্ন যায়। জবাব আসেনি।
চার সপ্তাহ পর, ২০ আগস্ট, প্রশ্নটি নিয়ে আবার ফোন করা হয়। এবার যা ঘটল, তা একটি চুক্তির গল্প নয়- একটি দপ্তরের।
সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আবদুন নূর ফোন ধরেই পাঠিয়ে দেন ওপরে: “ওইটা নিয়ে আমাদের ডিজি’র সাথে কথা বলেন।” মনে করিয়ে দেওয়া হয়, এই দরপত্রের ক্রয়কারী হিসেবে নথিতে তাঁরই নাম আছে। তখন তিনি পাঠান নিচে- “আমার অফিসের তথ্যপ্রদানকারী অফিসারের সাথে কথা বলুন। আমি ঢাকায়, জরুরি কাজে আছি।”
চুক্তিটির বিবরণ শুনে (টেন্ডার আইডি ১১৯৩০৯১, সেকেন্ডারি ডেটা কানেক্টিভিটি, ৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা; নথিতে কাজ শুরু ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, শেষ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, অথচ চুক্তি সই ১৮ মে ২০২৬) তাঁর জবাব: “আমি কিছুই বলতে পারব না এখন। অফিসে যোগাযোগ করুন।”
তথ্য অধিকার আইনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (আইটি) মো. গোলাম সারোয়ারও একই কাজ করেন, “আমার কাছে তথ্য আপনি পাবেন না আরকি। আমি আপনাকে সঠিক তথ্য দিতে পারব না।” আইটির দায়িত্বে থেকেও কেন জানবেন না, এই প্রশ্নে তাঁর ব্যাখ্যা: “আমি খুব রিসেন্ট জয়েন করছি… আর আমার জানারও কথা না, এটা প্রকিউরমেন্ট থেকে হয় আরকি পুরো।”
তবে তাঁর কাছ থেকেই প্রথম সূত্রটি মেলে। সংযোগটি তাঁরা এখনো বুঝে পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিলিং সফটওয়্যারটি বসবে ঢাকায়, তাঁরা এখান থেকে টার্মিনাল ব্যবহার করবেন, “তো ওই সফটওয়্যার তো আমরা এখনো…”
তৃতীয় ফোনটি যায় সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) জাহিদ হাসানের কাছে। তিনিও শুরু করেন গোপনীয়তার যুক্তিতে- “প্রকিউরমেন্টের তথ্য সেনসিটিভ”, “অবশ্যই আপনাকে অফিসে এসে এটা সংগ্রহ করা লাগবে”।
কিন্তু এরপরই, তারিখের অসংগতির প্রশ্নটি খারিজ করতে গিয়ে তিনি এমন একটি কথা বলেন, যা প্রশ্নটিকেই প্রমাণ করে দেয়:
“তারিখের অসঙ্গতির বিষয় নাই… এখন ওটার ইমপ্লিমেন্ট এখন শুরু হয়নি এখনো। এই যে অক্টোবর বা নভেম্বর মাস থেকে শুরু হবে, তখন তারা হলো এটা ইফেক্টিভে আসবে। এখনো ওইটা ইফেক্টিভ হয় নাই। আমরা শুধু ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে রাখছি।”
সরকারি খাতা বলছে, কাজটি শেষ হয়েছে ২৮ জানুয়ারি ২০২৬। দপ্তরের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা বলছেন, কাজ শুরুই হবে অক্টোবর-নভেম্বরে। অর্থাৎ খাতার “সমাপ্তির” নয় মাস পরে।
তারিখটি তাঁকে আবার পড়ে শোনানো হলে তিনি থমকে যান: “২৮ জানুয়ারি ২০২৬ এ শেষ হইছে? আমাকে একটু দেখা লাগবে এটা তো আমি মুখস্ত বলতে পারব না।”
আলাপের শেষে তিনি জানান, তথ্য পেতে হলে লিখিত আবেদন করতে হবে। মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ২২ জুলাই সেই আবেদন পাঠানো হয়েছিল- তাঁদের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারের দাপ্তরিক ই-মেইলেই। তাঁর জবাব: “আমি এরকম কোনো আবেদন পাই নাই… আমার মনে হয় মেইল এড্রেস টেড্রেস ভুল দিতে পারেন।”
তিনজন কর্মকর্তা, তিনটি ফোন, একই দিন। কেউ অস্বীকার করেননি, কেউ জবাবও দেননি- প্রত্যেকে দেখিয়ে দিয়েছেন পরের জনের দিকে।
আর তার ফাঁক দিয়েই বেরিয়ে এসেছে সবচেয়ে জরুরি তথ্যটি: যে কাজ সরকারি খাতায় সাত মাস আগে শেষ, সেটি বাস্তবে শুরুই হয়নি।
৭৭ কোটি টাকার খনন, একটাও শুরু হয়নি
সংখ্যার আকার বদলালে ছবিটি বদলায় না, কেবল বড় হয়।
খাগড়াছড়ি শহর রক্ষায় চেঙ্গি নদী খননের প্রকল্প। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-২-এর অধীনে নদীর বিভিন্ন অংশ খননের সাতটি চুক্তি, মোট ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির ইতিহাস জানা দরকার। চেঙ্গি ও মাইনি নদীর ৫৮ কিলোমিটার খনন শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু চেঙ্গির খনন কিছুদূর এগিয়ে থমকে যায়- ঠিকাদার ড্রেজার তুলে নিয়ে চলে যান। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৫৮৬ কোটি টাকার প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ।
ঠিক এই থমকে থাকা প্রকল্পেই, মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে, ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে সই হলো ৭৭ কোটি টাকার সাত চুক্তি।
সাতটিরই কাজ শুরুর প্রস্তাবিত তারিখ চুক্তি সইয়ের ৪ থেকে ১৩ দিন আগের। আর পাঁচটির- ৬৭ কোটি টাকার- কাজ শেষের প্রস্তাবিত তারিখ ৩০ জুন, অর্থবছরের শেষ দিন। সইয়ের দিন থেকে গুনলে হাতে সময় ৭০ থেকে ৮৬ দিন, তা-ও বর্ষা মাথায় নিয়ে।
মাঠ কী বলছে? ১৭ জুলাই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, “চেঙ্গী নদীতে বর্তমানে কোনও কাজ হচ্ছে না। গত কয়েক মাসেও কোনও কাজ হয়নি।” একই দিনে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাতের ভাষ্য: “বৃষ্টি কমলে চর অপসারণ ও নদী খনন শুরু হবে।”
ক্রিয়াপদটি লক্ষ করুন- “শুরু হবে”। অথচ ই-জিপির খাতায় ৬৭ কোটি টাকার খননের সমাপ্তির তারিখ পেরিয়ে গেছে তারও দুই সপ্তাহ আগে।
উত্তরটি এল দপ্তরের ভেতর থেকেও, এবং তাতে কোনো অস্পষ্টতা রইল না।
৯ আগস্ট টেন্ডার আইডি ও ই-জিপির লিংকসহ সাতটি চুক্তির পূর্ণ তালিকা এবং ছয়টি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় পওর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদের হোয়াটসঅ্যাপে। সেদিন তিনি বাঁশখালীতে সরকারি কর্মসূচিতে ছিলেন; তবু পাঁচ মিনিটের মধ্যে জবাব দেন।
ইংরেজি হরফে বাংলায় লেখা সেই বার্তায় তিনি জানান- “চেঙ্গিতে এই কাজগুলো একটাও শুরু হয়নি।”
সঙ্গে যোগ করেন, “এগুলোর টাইম এক্সটেনশন দরকার হবে”, আর কাজ শুরু হবে বর্ষার পরে- “মনসুন সিজন শেষ হওয়ার পর ড্রাই সিজনে কাজ শুরু হবে।”
সংখ্যাটি এবার পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যায়। ৬৭ কোটি টাকার কাজের প্রস্তাবিত সমাপ্তির তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পাঁচ সপ্তাহ পরেও, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজের ভাষায়, একটি কাজও শুরু হয়নি।
আর সরকারের ডিজিটাল খাতা এখনো বলছে, কাজ শুরু হয়েছিল মার্চ-এপ্রিলে, শেষ হয়েছে ৩০ জুন।
খাতাটি একবারও জানতে চায়নি সত্যি কি না।
এক তারিখে ৪৭টি স্কুল-কলেজ
তৃতীয় দৃশ্যটি শহরের ভেতরে, এবং সেখানে ফারাকটি মাপা গেছে দিন ধরে।
২৬ জুলাই দুপুর। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া সরকারি কলেজের আঙিনায় একতলা একটি ভবনের ওপর কাজ চলছে- দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের জন্য রড বাঁধছেন শ্রমিকেরা। এই ভবনটিকেই ছয় তলায় উন্নীত করার কথা, ২ কোটি ৯১ লাখ টাকার একটি চুক্তিতে।

কাজ কবে শুরু হয়েছে? ফোরম্যান নুরুল আলম প্রথমে বললেন, “ডেটটা আমার মনে নাই, দেখতে হবে”; পরে যোগ করলেন, “গত মাসের মনে হয় ২৬-২৭ তারিখে শুরু করছি।” দ্বিতীয় ফোরম্যান দিদারের হিসাবও কাছাকাছি, “এক মাসের কাছাকাছি।”
অর্থাৎ মাঠের কাজ শুরু জুনের শেষ সপ্তাহে।
ই-জিপির নথি অন্য কথা বলে। সেখানে কাজ শুরুর তারিখ ১ এপ্রিল ২০২৬। আর চুক্তি সই হয়েছে ১২ মে, ঠিকাদার নিয়োগের চিঠি জারি ৩ মে।
তিনটি তারিখ, তিন জায়গায়: কাগজে ১ এপ্রিল, দপ্তরের ফাইলে ১২ মে, মাঠে ২৬ জুন।
কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক প্রসেনজিৎ পালকে নথির তারিখটি শোনানো হলে তিনি নিজেই হিসাব মিলিয়ে নেন: “চুক্তি হইছে ১২ মে। তো এটার কাজ শুরু হওয়ার কথা এক এপ্রিল। এক এপ্রিল তো আর হয়নি…”
আর সেই “১ এপ্রিল” বাকলিয়ার একার তারিখ নয়।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের তিন মাসের ৫৭টি চুক্তির মধ্যে ৪৭টিতেই কাজ শুরুর প্রস্তাবিত তারিখ একটিই- ১ এপ্রিল ২০২৬।
এর ১৭টির চুক্তি সই হয়েছিল ১ এপ্রিলের আগে; সেগুলোতে ভবিষ্যতের একটি তারিখ বসানো স্বাভাবিক। কিন্তু বাকি ৩০টির সই হয়েছে ১ এপ্রিলের ১৪ থেকে ৪৬ দিন পরে– অথচ শুরুর তারিখ বদলায়নি। এই ৩০টির মোট মূল্য ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
ওই ৩০টি প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে আছে হাটহাজারী, মিরসরাই, সাতকানিয়া, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারাসহ ১৩টি এলাকায়। ২০টি মেরামত-সংস্কারের, ১০টি নতুন ভবনের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২৮টি, আলাদা আলাদা।
এলাকা আলাদা, কাজের ধরন আলাদা, ঠিকাদার আলাদা- কিন্তু কাগজে সবার কাজ শুরু একই সকালে।
আর ৩০টির ১৬টির ঠিকাদার-নিয়োগের চিঠি জারি হয়েছে একই দিনে, ৩ মে; আরও ১৩টির ১৩ এপ্রিল। অর্থাৎ দপ্তরটি গুচ্ছ ধরে ঠিকাদার চূড়ান্ত করেছে, আর শুরুর ঘরে সবার জন্য বসিয়েছে একটিই তারিখ।
২৮টি আলাদা প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ভুলটা হুবহু এক। এটি কারও একজনের হাতের ভুল নয়।
আরও অদ্ভুত তিনটি চুক্তি- হাটহাজারীর গাউছিয়া মনিরিয়া আহমদিয়া দাখিল মাদ্রাসা, মিরসরাইয়ের তৈতিয়া দাওয়াতুল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা আর সন্দ্বীপের সরকারি হাজী আবদুল বাতেন কলেজ। তিনটিরই একাডেমিক ভবন সংস্কারের কাজ নথিতে শুরু ও শেষ একই দিনে, ১ এপ্রিল; আর তিনটিরই চুক্তি সই সেই “সমাপ্তির” ১৪ থেকে ৪২ দিন পরে।
দেয়ালের প্লাস্টার, রং, ছাদ মেরামত- এর কোনোটাই এক সকালে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার কাজ নয়; রং শুকাতেই লাগে একাধিক দিন। গোটা তথ্যভান্ডারে এমন শুরু-শেষ-এক-দিন চুক্তি ৩৭টি।
আর ৩৭টির চেয়েও অদ্ভুত একটি দল আছে- ১৩টি চুক্তি, যেখানে কাজ শেষ হয়েছে শুরু হওয়ার আগে।
ই-জিপির খাতা বলছে, এসব কাজে সমাপ্তির তারিখ পড়েছে সূচনার তারিখেরও এক থেকে ২০ দিন আগে। মোট মূল্য ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। চারটি সংস্থায় ছড়ানো- আনোয়ারা উপজেলা পরিষদে চারটি, চট্টগ্রাম বন্দরে তিনটি, মেরিন ফিশারিজ একাডেমিতে তিনটি, আর বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডে তিনটি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানটি বন্দরের একটি চুক্তিতে- কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতির মেরামত, ১৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। চুক্তি সই ৪ মে, কাজ শুরুর তারিখ ১১ মে, আর সমাপ্তির তারিখ ২১ এপ্রিল। অর্থাৎ শুরুর ২০ দিন আগেই কাজ শেষ।
এই তালিকায় আছে চাতরীর সেই চুক্তিটিও, যেটি দিয়ে এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল। ২৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ওই কাজে সমাপ্তির তারিখ ৭ এপ্রিল, শুরুর তারিখ ১৫ এপ্রিল।
তাৎপর্যটি এখানেই। “তারিখটা তো প্রস্তাবিত”- এই ব্যাখ্যা দিয়ে চুক্তির আগের তারিখ বোঝানো যায়, কারণ প্রাক্কলন ভুল হতেই পারে। কিন্তু কোনো প্রাক্কলনেই সমাপ্তি সূচনার আগে বসে না। পরিকল্পনা যত কাঁচাই হোক, কেউ ধরে নেয় না কাজটি শুরুর আগেই শেষ হবে।
অর্থাৎ এই ১৩টি ঘর প্রাক্কলনের ভুল নয়- এগুলো এমন তথ্য, যা কোনো অর্থই বহন করে না। তবু ই-জিপি সেগুলো নিয়েছে, সংরক্ষণ করেছে, আর নাগরিকের জন্য প্রকাশ করেছে।
যে যুক্তিটি দেওয়া হয়
এই অনুসন্ধানের সময় বারবার একটি ব্যাখ্যা এসেছে: ই-জিপিতে লেখা তারিখগুলো “প্রস্তাবিত”, দরপত্র আহ্বানের সময় দেওয়া একটি ইঙ্গিত মাত্র; প্রকৃত মেয়াদ বসে পরে, কার্যাদেশে।
শিক্ষা প্রকৌশলের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের ভাষায়, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা করার সময় “যেকোনো একটা কাজের টেন্টেটিভ একটা ডেট দেওয়া হয়… কিন্তু এরপর টেন্ডার হলো, অনুমোদন হলো- দেখা যাচ্ছে অনেক সময় ওই টেন্টেটিভ ডেটে থাকে না।” প্রকৃত সূচনা কোনটি? “কাজের শুরু হচ্ছে যখন ঠিকাদারকে আমরা নোয়া দিব।”
দ্বিতীয় কথাটি ঠিক- কাজ শুরুর প্রকৃত ভিত্তি কার্যাদেশই। প্রশ্নটি ছিল অন্য: তাহলে নাগরিকের জন্য প্রকাশিত পাতায় ১ এপ্রিল রয়ে গেল কেন?
ব্যাখ্যাটি ফেলে দেওয়ার নয়- এ কারণেই কাজ শুরুর তারিখ চুক্তির আগে থাকাকে এই সিরিজে “প্রমাণিত অনিয়ম” নয়, “সতর্ক সংকেত” হিসেবেই ধরা হয়েছে।
কিন্তু চারটি কারণে এটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে না।
এক, সংখ্যাগুলো নেওয়া হয়েছে ই-জিপির চুক্তি-প্রকাশের পাতা থেকে- যে পাতা প্রকাশিতই হয় চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পরে। সেখানে কাজ শুরুর তারিখ সইয়ের ছয় সপ্তাহ আগের থাকলে সেটি আর “প্রাক্কলন” থাকে না।
দুই, প্রাক্কলন হলেও শুরু ও শেষ একই দিনে হয় না। ভবন সংস্কারের প্রাক্কলিত মেয়াদ এক দিন- এমন পরিকল্পনা কোনো দপ্তরই করে না।
তিন, ব্যাখ্যাটি কেবল কাজ শুরুর ঘরটি ঢাকে। কাজ শেষের তারিখ চুক্তির আগে চলে যাওয়া- যা ১৪৪টি চুক্তিতে মিলেছে- তার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দেননি।
চার, এবং সবচেয়ে জরুরি: সরেজমিনে ফারাকটি কয়েক দিনের নয়। বাকলিয়ায় প্রায় তিন মাস, চাতরীতে মাসের পর মাস, চেঙ্গিতে কাজই শুরু হয়নি।
স্বাধীন মূল্যায়নও একই দিকে যায়। টিআইবির পরিচালক ও ক্রয়-বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের বিশ্লেষণ হলো- বাস্তবে চুক্তি সইয়ের আগে কাজ শুরু হয়ে থাকলে তা সুস্পষ্ট পিপিআর লঙ্ঘন; আর না হয়ে থাকলে তা সরকারি নথিতে পদ্ধতিগত ভুল তথ্যের প্রমাণ।
দুটির কোনোটিই স্বস্তির নয়।
এই পার্থক্যটি ফোনে বোঝানো কঠিন হচ্ছিল। তখন নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলাম নিজেই একটি পথ বাতলে দেন: “আমার কক্ষের পাশে যে উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন আহমেদ আছেন, আপনি ওনার সঙ্গে একটু দেখা করেন, তিনি বিষয়টি আপনাকে বুঝিয়ে দেবেন।”
সেই সাক্ষাতেই বেরিয়ে আসে প্রকৃত কারণ- এবং তা “টেন্টেটিভ ডেট” নয়, একেবারে অন্য কিছু। সে কথা শেষ পর্বে।
তবে সেই আবিষ্কারের কথা জানিয়ে ২০ আগস্ট আবার ফোন করা হয় তানভীর ইসলামকে। ৪৭টি চুক্তির পাতায় ভুল তারিখ রয়ে গেছে- দপ্তর কি সংশোধনের উদ্যোগ নেবে?
তিনি এড়িয়ে যাননি: “ওটা সংশোধন করে নেব আমরা, ওটা সংশোধন করে ফেলা যাবে।”
তবে তাঁর সংশোধনের ধারণাটি কাগজের ফাইলের- “ই-জিপির পরে আমরা তো ম্যানুয়াল ফাইলও তো মেইনটেইন করি, ম্যানুয়াল ফাইলে ওটা আমরা কারেকশন করে নিয়ে নেই আরকি।” তাঁর ব্যাখ্যায়, কার্যাদেশ জারির পর কাজের বাস্তবায়ন চলে হার্ড ফাইলের ভিত্তিতেই।
সমস্যাটি যে তাঁর দপ্তরের একার নয়, সেটিও তিনি জানেন: “পিপিআর ২৫-এর পরে ই-জিপি সিস্টেমেও তো অনেক আপগ্রেডেশন চলছে। ওই ধরনের সমস্যা, তারিখের সমস্যা, যা কিন্তু অন্য অনেক ডিপার্টমেন্টেরও হইছে আরকি।”
কিন্তু নাগরিক তো হার্ড ফাইল দেখতে পান না; তিনি দেখেন প্রকাশিত পাতাটি। আর সেখানেই সংশোধনটি বসেনি- জামাল উদ্দীন আহমেদ চেষ্টা করেও পারেননি, এ কথা তুলতেই তানভীর ইসলাম বলেন, “ই-জিপিতে কেস টু কেস আমরা এটা সলভ করে নিই আরকি।”
শেষ পর্যন্ত তিনি একটি প্রতিশ্রুতি দেন। বিপিপিএকে বিষয়টি জানানো যাবে কি না, এই প্রশ্নে তাঁর জবাব: “হ্যাঁ জানানো যাবে… আমরা সংশোধনের জন্য বলব, পাঠায় দিব।”
এটিই এই অনুসন্ধানের প্রথম দৃশ্যমান ফল- একটি দপ্তর লিখিতভাবে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে রাজি হয়েছে।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৩: “তারিখটা তো প্রস্তাবিত”]
দুটি সম্ভাবনা, দুটি প্রশ্ন
শেষ পর্যন্ত দুটি সম্ভাবনাই থাকে, এবং দুটিই সমস্যাজনক।
যদি কাজ সত্যিই চুক্তির আগে শুরু (কোথাও শেষও) হয়ে থাকে- তাহলে জামানত ও চুক্তির আগেই সরকারি টাকার কাজ মাঠে নেমেছে, যেখানে সরকারি অর্থ সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
আর যদি কাজ আগে না হয়ে থাকে, দপ্তর ভুল তারিখ বসিয়ে থাকে- তাহলে হাজার কোটি টাকার ক্রয়-তথ্যভান্ডারে এমন ভুল ঢুকতে পারলে নাগরিক এই তথ্যের ওপর ভরসা করবেন কীভাবে?
প্রথম সম্ভাবনাটির উত্তর মিলেছে একটি ক্রয়কারী দপ্তরের ভেতর থেকেই। ১৬ জুলাই আনোয়ারা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিকী রেকর্ডে বলেন, “অনেক ঠিকাদার চুক্তি সই হওয়ার আগেই তারা কাজ শুরু করে দিছে… নোয়া (কার্যাদেশ) ইস্যু হওয়ার আগেই উনি লেআউট দিয়ে, মনে করেন, ঢালাইও দিয়ে দিছে।”
কখন শুরু করেন? সীমিত দরপত্রে সমান দরের লটারির ড্র যেদিন হয়, “ওই দিনে দুই-তিনটা ঠিকাদার এখানে চলে গেছে সাইটে লেআউট দিতে।”
তিন দিন পর একই দপ্তরে উপজেলা প্রকৌশলী দিলেন উল্টো ব্যাখ্যা- এসব এন্ট্রির ভুল। “এটা যে ইনপুট দিছে, আমার যে স্টাফ ইনপুট দিছে, এটা ভুল দিছে।” সফটওয়্যারের দায়? “সফটওয়্যারের কোনো ভুল নাই… গাধায়ে ভুল করছে।”
কিন্তু একই আলাপে চুক্তির আগে কাজ শুরুর প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বললেন, “সে মনে করতেছে, স্যার, আমি ঠিক টাইমের আগে কাজ করে ফেলব। এ রকম ঠিকাদার আমাদের জন্য ভালো।”
এক মুখেই দুই ব্যাখ্যা: তারিখগুলো “ভুল”, আবার চুক্তির আগে কাজে নেমে পড়াও “ভালো”।
লক্ষ্মী চৌধুরীর প্রশ্নটিই এই পর্বের শেষ প্রশ্ন: “কাগজে যদি কাজ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই দুর্ভোগের দায় নেবে কে?”
দায়টি নেওয়ার কথা ছিল সেই খাতার, যেটি বানানোই হয়েছিল প্রমাণ রাখার জন্য। কিন্তু খাতাটি প্রমাণ রাখে না- সে যা লেখা হয়, তা-ই ছাপে।
চাতরীতে পুকুরপাড় আজও অরক্ষিত। ইছাখালীতে গাইড ওয়ালের জায়গায় গ্রামবাসীর বালুর বস্তা। চেঙ্গিতে ৭৭ কোটি টাকার খনন শুরুই হয়নি। বাকলিয়ায় ছাদের রড বাঁধা হয়েছে জুনের শেষে।
আর সরকারের প্রকাশিত খাতায় এসবের সবই “সম্পন্ন”- এপ্রিল-জুনের মধ্যেই।
তাহলে ভুলটা ধরা পড়ে না কেন? কেউ কি একবারও পাতাটি খুলে দেখেন না?
সেই প্রশ্নের উত্তর- এবং কী করলে খাতাটি নিজেই প্রশ্ন করতে শিখবে- শেষ পর্বে।
[পার্শ্বপ্রতিবেদন-৪: “সংখ্যাগুলো এল কোথা থেকে”]
আগামীকাল পড়ুন: ‘সরকারি কেনাকাটা: তারিখ যা খুশি লেখা যায়, কেউ আটকায় না’
প্রথম পর্ব পড়ুন: ২৪৮ জন বনাম ২ জন: যে তুলনাটা আর কেউ করতে পারবেন না
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: ‘তিন থেকে পাঁচটা লাইসেন্স আমরাই বেছে দিই, অন্য কেউ দেখবেও না’
তৃতীয় পর্ব পড়ুন: ‘এটা ১০০% পেতে পারি আমি’: এক মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান, ৮২ শতাংশ কাজ’
সরকারি কেনাকাটার ছয় ধাপ
সরকারি কেনাকাটার ছয়টি ধাপ পরপর ঘটার কথা: প্রথমে দরপত্র আহ্বান, অর্থাৎ বিজ্ঞাপন প্রকাশ। এরপর দাখিল ও মূল্যায়ন- কে যোগ্য, কার দর কত। তারপর চুক্তিসম্পাদনের নোটিশ বা কার্যাদেশ (এনওএ; কথ্য ভাষায় বলা হয় “নোয়া”)- কাকে কাজ দেওয়া হলো, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর পরের ধাপ কার্যসম্পাদন জামানত (পিজি)- ঠিকাদারের জমা দেওয়া টাকা, যা কাজ না করলে বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত ব্যাংকে যাচাই হওয়ার পরই হয় চুক্তি স্বাক্ষর। আর সবশেষে শুরু হয় কাজ।
সহজ কথায়: আগে কাগজ, পরে কাজ। এই ক্রম উল্টে গেলে কী দাঁড়ায়- সেটিই এই সিরিজের বিষয়।
[এই অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া প্রতিটি চুক্তির টেন্ডার আইডি, সংকেতের (খটকা) হিসাব ও আর্কাইভ লিংকসহ পূর্ণ তথ্যভান্ডার প্রকাশিত হবে সিরিজের শেষ (পঞ্চম) পর্বের সঙ্গে, একসঙ্গে- যাতে পাঠক পুরো সিরিজের প্রতিটি দাবি নিজে মিলিয়ে দেখতে পারেন।]