
সরকারি কেনাকাটার একটি অংশ এখনো ই-জিপির বাইরে, কাগজে হয়; পোর্টালে কেবল ফলাফল টুকে রাখা হয় “অফলাইন চুক্তি” হিসেবে। এই অনুসন্ধানে ১৭ জুলাই পর্যন্ত পোর্টালে থাকা ১১ জেলার ৯১টি অফলাইন চুক্তির নথি সংগ্রহ করে চট্টগ্রামের ২৬টিকে একই ছাঁকনিতে ফেলা হয়েছে।
বাইরে থাকা অংশটি ছোটও নয়। টিআইবির ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ বলছে, ২০১১ সাল থেকে ই-জিপির মাধ্যমে হয়েছে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯২১ কোটি টাকার ক্রয়; কিন্তু এই ব্যবস্থায় ওঠা সর্বোচ্চ চুক্তির মূল্য ৮৮১ কোটি টাকা- তার চেয়ে বড় চুক্তিগুলো বাইরেই থেকে গেছে।
ফল স্পষ্ট। ২৬টির ২৫টিতেই- ৯৬ শতাংশ নোটিশ ও চুক্তি সই একই দিনে। অনলাইনে ২ হাজার ১৮৫টি চুক্তির মধ্যে এমন ঘটেছে ২৬৫টিতে, অর্থাৎ ১২ শতাংশ। ডিজিটাল নজরদারির বাইরে যা কার্যত নিয়ম, ভেতরে তা ব্যতিক্রম।
সবচেয়ে ঘন উদাহরণ হাটহাজারী পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ। ১৫টি অফলাইন চুক্তির ১২টির গল্প হুবহু এক- কোটেশনের বিজ্ঞাপন ২৫ জুন ২০২৪, আর নোটিশ ও সই দুটোই ৩০ জুন। অর্থবছরের শেষ দিনে, এক দিনে ১২ চুক্তি, ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
আর এই ১২টির একটিতে সবচেয়ে অদ্ভুত সারিটি। এটিআই রোড-রেলস্টেশন সংযোগ সড়কের ৫ লাখ টাকার কাজে “ঠিকাদারের নাম”-এর ঘরে লেখা- “হাটহাজারী পৌরসভা, চট্টগ্রাম”। খাতা আক্ষরিকভাবে পড়লে, পৌরসভা কাজটি দিয়েছে পৌরসভাকেই।
২৬ জুলাই ফোনে সেই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বেলাল আহমেদ খান নীতিগত ভুলটাই স্বীকার করেন- “ঠিকাদারের ঘর হলে তো ওখানে ঠিকাদারের নামই আসার কথা।” একই রাতে নিজে থেকেই আবার ফোন করে বলেন, “আপনার এটা ঠিক আছে, ওইটা বোধহয় ভুল হয়েছে।”
ভুলের ধরনটি একটি দপ্তরের নয়। ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালের ৯টি অফলাইন চুক্তির ৭টিতে ঠিকাদারের নামের ঘরে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামই নেই, লেখা শুধু একটি সংখ্যা: ছয়টিতে “৩”, একটিতে “৭”। ২৭ জুলাই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. ইফতেখার আহম্মদ নিজেই পর্দায় দেখে থেমে যান: “তার ঠিকানা আছে কিন্তু নাম নাই, নাম দেখাচ্ছে ৩।”
এক জেলার সমস্যা নয়। অন্য ১০ জেলার ৬৫টি অফলাইন চুক্তির ছবি চট্টগ্রামের মতো প্রকট নয়, তবু অনলাইনের প্রায় চারগুণ। সবচেয়ে চেনা ছায়াটি বাগেরহাটে- সেখানকার ২৬টি অফলাইন চুক্তির পুরোটাই বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি একদিনেই সই হয় ১১টি চুক্তি; সবগুলোর নোটিশও সেদিনই, সবই কোটেশন পদ্ধতির, প্রতিটির মূল্য ২ লাখের নিচে।
সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে দেখা চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯ মে-র ১৫ চুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। ভিন্ন জেলা, একই সংস্থা, একই আচরণ- সমস্যাটা একটি শহর বা একজন কর্মকর্তার নয়, ব্যবস্থার নকশায় গাঁথা।
টিআইবির পরিচালক ও ক্রয়-বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের মতে, এগুলো সম্ভবত জালিয়াতি নয়- তথ্য তোলার অবহেলা। কিন্তু ঠিক সেখানেই প্রশ্নটি: যে জাতীয় ব্যবস্থার প্রতিটি ঘর জবাবদিহির দলিল হওয়ার কথা, সেখানে ঠিকাদারের নামের জায়গায় “৩” লিখলেও রেকর্ড প্রকাশিত হয়ে যায়।
মূল প্রতিবেদন: সরকারি কেনাকাটা: তারিখ যা খুশি লেখা যায়, কেউ আটকায় না