মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

৫০ চাল ব্যবসায়ীর চোখের জলে হাবিবের হুন্ডিবাণিজ্য

| প্রকাশিতঃ ২৩ অগাস্ট ২০১৬ | ১২:২৩ অপরাহ্ন

Screenshot_29‌চট্টগ্রাম: ইসমাইল হাবিব নামের এক ‘হুন্ডি ব্যবসায়ী’র অভিনব প্রতারণার শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের শতাধিক চাল ব্যবসায়ী। কয়েক কোটি টাকার চাল বকেয়া নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন হাবিব। তার ফাঁদে পা দিয়ে দিকবিদিক ছুটছেন খাতুনগঞ্জসহ দেশের অন্তত ৫০ জনের বেশি চাল ব্যবসায়ী। কেউ কান্নাজড়িত ম্যাসেজ পাঠাচ্ছেন, কেউ দ্বারস্থ হয়েছেন থানা-পুলিশ কিংবা আদালতের। কিন্তু কিছুতেই ধরা দেন না ইসমাইল হাবিব। অথচ ঠিকই তিনি নীরবে হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোটি কোটি টাকা লেনদেন করছেন প্রতিদিন।

অধরা এই হুন্ডি ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা। লোহাগাড়ার আমিরাবাদ কাঁচাবাজারের হাজী ট্রেডার্সের মালিক তিনি। এছাড়াও আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ও আনোয়ারা এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ‘অস্থিত্ববিহীন’ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে তার।

চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জের অর্ধশত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার চাল বকেয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গা ঢাকা দিয়েছেন ইসমাইল হাবিব। এছাড়া গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও বকেয়ার মাধ্যমে কোটি টাকার চাল কিনেছেন তিনি। এসব বকেয়া টাকা ফেরত না দিয়ে ওই টাকা হুন্ডি ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে।

গত ১৬ ও ১৮ আগস্ট ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে চাল বিক্রির ৮ লাখ ২০ হাজার বকেয়া টাকার দাবিতে চাক্তাইয়ের আলীফ রাইচ এজেন্সীর মালিক মো. হোসাইন পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন।

এছাড়া পাওনা ৪৫ লাখ টাকার দাবিতে উকিল নোটিশ দিয়েছেন চাক্তাইয়ের চাল ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ। এর আগে গত বছরে চাক্তাইয়ের টেকনাফ রাইচ এজেন্সী ৫ লাখ ৭ হাজার টাকা, শাহ জালাল রাইচ মিল ৪৩ লাখ টাকার দুটি মামলা দায়ের করেছিলেন।

এদিকে ইসমাইল হাবিবের কাছ থেকে বকেয়া টাকা পাওয়া চাল ব্যবসায়ীরা হলেন- চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের লাইলা রাইস এজেন্সী ৩ লাখ ৫৬ হাজার, মাতৃ অটো রাইচ মিল ১ লাখ ৫ হাজার, স্টার রাইচ এজেন্সী ৩ লাখ ৫০ হাজার, শাহজালাল রাইচ এজেন্সী ১ লাখ, বিসমিল্লাহ রাইচ এজেন্সী ১ লাখ, এস এ এন্টারপ্রাইজ ১ লাখ, শাহজালাল রাইচ মিলের জহুরুল হক মজুমদার ৪৩ লাখ, নুরুল্লাহ রাইচ এজেন্সী ৪ লাখ ৫০ হাজার, চন্দনাইশের বাগিচার হাটের জরী আহমদ সওদাগর ৮৭ লাখ, গাজীপুরের মোজাদ্দেদী অটোরাইচ মিল ১৪ লাখ টাকা, ময়মনসিংহের ভাই ভাই অটোরাইচ মিল ১ লাখ ৫০ লাখ।

চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ী মো. হোসাইন বলেন, ‘পাওনা টাকার জন্য ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে আমি দুটি মামলা দায়ের করেছিলাম। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে সমন জারী করেছেন আদালত। আমার মতো অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাল বাকিতে কিনে টাকা ফেরত না দিয়ে তিনি হুন্ডি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।’

ব্যবসায়ী ইসমাইল হাবিব হুন্ডি ব্যবসা করে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য গত শনিবার সকাল ১০ টার দিকে লোহাগাড়ার বাজিপাড়ার বাসিন্দা রহমান পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদক তাকে ফোন করেন। প্রতিবেদকের বড় ভাই বিদেশ থেকে ৫ লাখ টাকা পাঠালে দুপুরের মধ্যে পেমেন্ট পাওয়া যাবে কিনা- তা জানতে চাওয়া হয়। এ সময় ইসমাইল হাবিব বলেন, ‘দুপুরে নয় বিকাল ৩টার মধ্যেই পেমেন্ট পেয়ে যাবেন। পাঠিয়ে দিতে বলেন।’

এরপর বিকাল ৩টার দিকে এই প্রতিবেদক পুনরায় তাকে ফোন করে টাকা এসেছে কিনা জানতে চাইলে ইসমাইল হাবিব বলেন, ‘টাকা এখনো আসেনি। আসলে ফোন করে জানানো হবে।’

পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে হুন্ডি ব্যবসা ও চাল ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবসায়ী। কোটি টাকা আমার কাছে পাওনা থাকতে পারে এটা স্বাভাবিক। আমিও অনেকের কাছে টাকা পাওনা আছি। এটি স্বাভাবিক লেনদেনের একটি ব্যাপার।’

হুন্ডি ব্যবসার অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবী করে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক লেনদেনের মনোমালিন্য থাকায় কোন ধরনের তথ্য প্রমাণ ছাড়া কেউ কেউ এ ধরনের মিথ্যা দাবি করতে পারে।’

পরিচয় গোপন রেখে ‘বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো’ নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপ প্রসঙ্গ ও হুন্ডির টাকা ছিনতাই হওয়া প্রসঙ্গে একটি ভিডিও প্রমাণ থাকার কথা তুলে ধরা হয় ইসমাইল হাবিবের কাছে। এরপর তিনি বলেন, ‘ওহ, ওটা আপনি ছিলেন!’ এরপরপরই মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৩ জুলাই ব্যবসায়ী ইসমাইল হাবিবের হুন্ডির টাকা পরিবহনের সময় তার এক কর্মচারীর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। কিন্তু তিনি তা গোপন করে ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে আদালতে গত ২০ জুলাই একটি মামলা করেন।

অন্যদিকে একই তারিখ ও সময়ে ঘটনার কথা উল্লেখ করে ওই কর্মচারীকে অপহরণের অভিযোগ এনে ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে গত ১৬ জুলাই পাল্টা মামলা করেছেন ওই কর্মচারীর স্ত্রী। ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি (সিআর মামলা ১৪৮/২০১৬) বর্তমানে লোহাগাড়া থানায় তদন্তাধীন আছে। ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা আরেকটি মামলা (সিআর মামলা ৯৫/২০১৬) বোয়ালখালী থানায় তদন্তাধীন আছে।

পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে চেক দিয়েছেন ইসমাইল হাবিব। চেকগুলোর মধ্যে ট্রাস্ট ব্যাংক লিঃ, যমুনা ব্যাংক লিমিটেড, সাউথ ইস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, পুবালী ব্যাংক লিমিটেডের চেকের কপি ও একটি ভিডিও একুশে পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে লোহাগাড়া থানার ওসি মোঃ শাহজাহান বলেন, ইসমাইল হাবিবের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি মামলার তদন্ত চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যরা তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।