ঢাকা : গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীতে একটি প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ২১ জন। শনিবার সকালে ট্যাম্পাকো ফয়েলস নামে পাঁচ তলা ওই কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায় বলে জয়দেবপুর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দুপুরে আগুন নেভানোর আগে বেশ কয়েকজনের লাশ বের করে আনা হয়, কয়েকজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।
এদের কেউ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আগুনে কারখানার কাঠামো ভেঙে তার নিচে চাপা পড়ে মারা যান কেউ কেউ।
আহত ৪৫ জন টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।
কারখানার মালিক সিলেটের সাবেক বিএনপি সাংসদ সৈয়দ মো. মকবুল হোসেন হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তার এই কারখানায় সাড়ে ৪শ’র মতো শ্রমিক রয়েছে। সবার ঈদের বোনাসসহ বেতন-ভাতা কয়েকদিন আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল।
শুক্রবার রাতের পালায় ৭৫ জনের মতো কাজ করছিলেন। শনিবার ঈদের ছুটি হওয়ার কথা ছিল।
সকাল ৬টায় আগুনের খবর পেয়ে জয়দেবপুর, টঙ্গী, কুর্মিটোলা, সদর দপ্তর, মিরপুর ও উত্তরাসহ আশে-পাশের ফায়ার স্টেশনের ২৫ ইউনিট নেভানোর কাজ শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, সকাল ৬টার দিকে কাজ চলার সময় নিচ তলায় বয়লার বিস্ফোরণের পর কারখানার পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের স্ত্রী নিগার সুলতানা জানান, পৌনে ৬টার দিকে একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
কারখানার পাশে গোপালপুর এলাকায় তার বাসা। শব্দ শুনে বেরিয়ে স্বামীর কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখে ছুটে যান নিগার। গিয়ে দেখেন তার স্বামীসহ কয়েকজনের লাশ বের করা হচ্ছে।
এসময় পাঁচ তলা কারখানার চতুর্থ তলায় বেশ কিছু শ্রমিক জানালা দিয়ে হাত নেড়ে তাদের বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। স্থানীয়রা মই নিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ধোঁয়া ও তাপের কারণে তাদের ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কিছুক্ষণ পরে ওই তলায় থাকা শ্রমিকদের আর কোনো সাড়া দেখা যায়নি। ততক্ষণে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আশপাশের এলাকাও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেও কারখানাটিতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছিল। তার আগে ভবনের একাংশের ছাদ ধসে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে সোহেল নামের এক দমকলকর্মী আহত হন।
ভেতরে দেয়াল চাপা পড়ে কিংবা অগ্নিদগ্ধ হয়ে আর কেউ মারা গেছেন কি না, তা আগুন পুরোপুরি নেভানোর আগে বলতে পারছেন না ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।
হতাহত যারা : নিহতদের মধ্যে ১৫ জনের লাশ টঙ্গী হাসপাতালে রয়েছে। চারজনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দুজনের লাশ উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে।
টঙ্গী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. পারভেজ মিয়া জানান, হাসপাতালে নারী ও শিশুসহ ১৫ জনের লাশ রয়েছে। এছাড়া আহত ১২ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
টঙ্গীতে থাকা যাদের পরিচয় নাম গেছে, তারা হলেন- আনিসুর রহমান (প্রকৌশলী), জয়নাল আবেদিন (অপারেটর), আনোয়ার হোসেন (অপারেটর), শংকর (ক্লিনার), রেদোয়ান (দারোয়ান), জাহাঙ্গীর (নিরাপত্তাকর্মী), হান্নান মিয়া (নিরাপত্তাকর্মী), রফিকুল ইসলাম (শ্রমিক), ইদ্রিস, আল মামুন, নয়ন, সুভাষ, জাহিদুল, রাশেদ (রিকশাচালক)।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই কারখানার শ্রমিকদের স্বজনরা টঙ্গী ৫০ শয্যার হাসপাতালে গিয়ে ভিড় জমায়। লাশ দেখে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে স্বজনদের খুঁজছিল।
শুরুতে কারখানা থেকে হাতহতদের উদ্ধার করে টঙ্গী হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখান থেকে গুরুতর আহতদের ঢাকা মেডিকেল ও উত্তরা মেডিকেলে পাঠানো হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে এক নারীসহ চারজনের লাশ রয়েছে। তাছাড়া ভর্তি রয়েছেন আরও ১৯ জন, তারা সবাই পুরুষ।
মৃত চারজন হলেন- অপারেটর সিরাজগঞ্জের ওয়াহিদুজ্জামান স্বপন (৩৫), আনোয়ার হোসেন (৪০), দেলোয়ার হোসেন (৫০)। মৃত নারীর নাম জানা যায়নি।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল জানান, আহতদের মধ্যে চারজন তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। এরমধ্যে একজনের শরীরের ছয় ভাগ, আরেকজনের আট ভাগ পুড়েছে। একজনের শরীরের ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দেহের ছয় শতাংশ পুড়েছে শাহ আলমের (৪৬), দিলীপ দাসের (৩৬) পুড়েছে আট শতাংশ বার্ন। রিপন দাসের (৩০) দেহের ৯০ ভাগ পুড়েছে। এছাড়া রাসেল খান (২৬) নামে একজনও বার্ন ইউনিটে রয়েছেন।
ভর্তি অন্যরা নানাভাবে আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। তারা হলেন- রাসেল (২২), আনোয়ার (৫০), কামরুল (২৭), মনোয়ার (৩৫), মিজু মিয়া (২৫), ইকবাল (৩৫), আশিক (১২), শিপন (৩৫), শাহীন আকমল (৩০), রোকন (৩৫), কামরুল (২৭), প্রাণকৃষ্ণ (৩৮), অজ্ঞাত পুরুষ (৫০)।
তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণ : গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম কারখানা পরিদর্শনের পর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা সাংবাদিকদের জানান।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রাহেদুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক আনিস মাহমুদ জানান, বাহিনীর উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. বদিউজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছেন তারা। কমিটিকে ১০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহাম্মদ জানান, উপ-মহাপরিদর্শক মো. শামছুজ্জামান ভূইয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন তারা।
নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।
শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে এই অনুদান দেওয়া হবে। নিহতদের মধ্যে শ্রমিক ছাড়া এক রিকশাচালকের নামও পাওয়া গেছে। তবে তার অনুদান পাওয়ার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসন নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক এস এম আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় এই ঘোষণা দেন। আহতদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
আহতদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার কথা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহাম্মদও জানিয়েছেন।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী চুন্নু ছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. হেলাল উদ্দিন আহমদ, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আসাদুর রহমান কিরণ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকি করেন।