শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ভূমিমন্ত্রীর ওয়াজ!

| প্রকাশিতঃ ১১ এপ্রিল ২০১৯ | ৬:২৭ অপরাহ্ন


ঢাকা: ওয়াজ মাহফিলের ধাঁচে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তিনি পবিত্র কোরআন-হাদীস উদ্ধৃত করে নসিহত করেছেন যে, সবাই যাতে আখিরাত অর্থাৎ পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকেন। পিনপতন নিরবতায় উপস্থিত সবাই শুনেছেন ভূমিমন্ত্রীর এ বয়ান।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে ভূমি সেবা সপ্তাহ ও ভূমি উন্নয়ন করমেলা-২০১৯ উদ্বোধনের পর আয়োজিত আলোচনা সভায় মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, এই ভূমি মেলা দিয়ে জাতিকে একটা সুন্দর ম্যাসেজ দেওয়ার একটা সুযোগ হয়েছে। আমাদের ভূমি সপ্তাহ ও কর মেলার মূল থিমটা কী? মূল থিমটা হচ্ছে সচেতনতা সৃষ্টি করা, বৃদ্ধি করা। ভূমি মন্ত্রণালয় এই প্রথম উন্নয়ন কর মেলার আয়োজন করেছে। ভূমি সপ্তাহ আগেও হয়েছে। কিন্তু এখন এটা ভিন্নমাত্রায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সারা দেশে আমরা এটা করছি। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এটা আমরা শুরু করেছি। আমি বলেছি, করলে সারাদেশেই করবো। বাংলাদেশের মানচিত্র যত বড় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অবস্থানও তত বড়। তাই সারাদেশে করা উচিত। আমরা সেটা করছিও।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, আপনারা জানেন, আমি প্রাইভেট সেক্টরের লোক। রাজনীতি তো আছেই। আমি চট্টগ্রাম চেম্বারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি সেখানে। বলার উদ্দেশ্যে একটাই, সেখানে আমি একটা কথা সবসময় বলতাম। ঢাকা মানে বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশ মানে ঢাকা নয়। আমার কর্মকাণ্ডে আপনারা দেখবেন, আমি সেই থিম নিয়ে কাজ করি। যদিওবা এটা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।

‘কারণ যতই বলি না কেন ঢাকা মানে বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশ মানে ঢাকা নয়, কিন্তু ঘুরেফিরেই বাংলাদেশ মানে ঢাকা। ব্যবসায়ী সংগঠনের হয়ে সরকারের সাথে কথা বলার সময় আমি ওই কথাটি বললেও এখন আমি সরকারের পক্ষে চলে এসেছি। এখন দেখছি, এটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। এটাই বাস্তবতা। তারপরও ন্যুনতম পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। সিস্টেম যদি আমরা উন্নয়ন করতে পারি, অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে। সারাদেশের জন্য আমরা হটলাইন করছি। অটোমেশন হচ্ছে। ডিজিটালাইজেশনের কাজ যা যা করার সব করছি।’

মন্ত্রী বলেন, এখন মূল বিষয় হচ্ছে মাইন্ডসেট। প্রথমেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশে থাকা সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে। গতানুগতিক চিন্তা করলে কাজে গতি আসবে না, স্বচ্ছতা আসবে না, জবাবদিহিতা আসবে না। এবং সারাদিন কাজ করেও দুর্নামের ভাগিদার হবো।

তিনি বলেন, ‘এখন আমি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপনাদের বুঝানোর চেষ্টা করবো। এখানে নিশ্চয় মুসলমান, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা আছেন। কিন্তু একটা কথা ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। অর্থ্যাৎ আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। প্রত্যেক ধর্মে দেখবেন মানবতার বিষয়টা বলা আছে। কোরআন-হাদিসে আছে, মানবতা সবচেয়ে বড় ধর্ম।’

‘এখন আমি প্রকৃত মুসলমান হতে চাই। মুসলমান হওয়ার প্রথম শর্ত কী? অবশ্যই ঈমানকে মজবুত রাখতে হবে। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় সেটাকে বিশ্বাস করতে হবে। কেয়ামত কে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহকে কারো সাথে শামিল করতে পারবেন না। এখানে মানবতার বিষয়গুলোও আছে। এখন আজান দিল। আমি মসজিদে গেলাম। নামাজ পড়লাম পাঁচ ওয়াক্ত। দাঁড়ি রাখলাম, সুন্নত বলে। তাহলে কী আমি মুসলমান হয়ে গেলাম? দাঁড়ি-টুপি রেখেছি, তসবিহ গুনছি, আজান দিচ্ছে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছি। এজন্য আমি বেহেস্ত চলে যাবো? কোথায় লেখা আছে এটা?’ যোগ করেন ভূমিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নামাজ পড়তে হবে, এটা ফরজ। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে এটা একটা। ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত। ঈমান আনতে হবে ও নামাজ অবশ্যই পড়তে হবে। তাহলে তো গ্যারান্টি, বেহেস্তে চলে যাবো। বেহেস্তে চলে যাবো যখন তখন কেয়ামতের মাঠকে আর বিশ্বাস করলাম না! কিয়ামত কী। কিয়ামত হচ্ছে বিচার হবে। কার বিচার হবে? আপনার, আমার, সবার হবে। কিয়ামতকে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে এ কারণে। নামাজ পড়েছে এজন্য বেহেস্তে যাবে এমন না। কিয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশ হবে।

‘এখন কিয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশ কী হবে? সচিব সাহেব কী আপনার বিরুদ্ধে বা পক্ষে সাক্ষী দেবে? আমি দিবো? কারণ ইয়া নফসি। যার যার হিসাব তাকে দিতে হবে। কে হিসাব দেবে, কে সাক্ষী দেবে? চোখ, কান, হাত, দাঁত, মুখ- এসব হিসাব দেবে, কি করেছে, কি দেখেছে। এরপর বিচার হবে। কোরআন শরীফে বলা আছে, ৬০ শতাংশ বিচার পৃথিবীতে হয়ে যাবে আপনার। বাকিটা হবে ওই কিয়ামতের ময়দানে।’ যোগ করেন মন্ত্রী জাবেদ।

তিনি বলেন, এখন মানবতার কথা আমি বলছি। অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে, মন্ত্রী মহোদয় এখানে মানবতার কথা কেন বলছেন। এই ভূমি উন্নয়ন কর মেলার সাথে মানবতার কী সম্পর্ক? আছে। এই যে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। মানুষকে দিনের পর দিন বানান ভুল, এই ভুল, সেই ভুল বলে হয়রানি করা হচ্ছে। কিসের জন্য? টু-পাইসের জন্য। এটা কী হারাম না? এটাকে কোন ক্রাইটেরিয়ায় ফেলা যায়? এটা খারাপ ক্রাইটেরিয়ায় পড়বে না? এখানে অনেক মাওলানা সাহেব আছেন, ওনারা আরো ভালো বলতে পারবেন। আমি নগন্য, গুনাহগার।

‘এখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে বেতন, সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। একটা সময় সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। কিন্তু এখন কোন যুক্তি দাঁড় করাবেন? নিজের বিবেককে নিজে প্রশ্ন করবেন। কোন যুক্তি নিজের বিবেকের কাছে আপনি দাঁড় করাতে পারবেন? তাহলে? নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে কিভাবে সামাল দেবেন? আমি জানি না, সেটা আপনারা ভালো জানবেন।’

মানুষকে কষ্ট দেওয়ার মতো খারাপ কাজ আর নেই উল্লেখ করে ভূমিমন্ত্রী বলেন, আল্লাহতায়ালা কী বলেছেন? আমি তোমাদের রুহের (আত্মা) ভেতর। এটা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মানুষ অনেক কিছু সৃষ্টি করেছে, রোবটসহ অনেক কিছু। সেদিন হোয়াটসঅ্যাপে আমার কাছে একটা ভিডিও আসলো, সেখানে দেখা যাচ্ছে, মানুষ জিজ্ঞেস করছে রোবটের কাছে, তুমি আমাদের মত মুভমেন্ট করছো। কথাবার্তা বলতেছো। একেবারে মানুষের মত। তোমার সাথে তো আমাদের পার্থক্য নেই। রোবট জবাবে বললো, একটা জায়গায় পার্থক্য আছে। সেটা হচ্ছে রুহ (আত্মা)। রুহ কিন্তু কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি।

‘আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। এখন আপনারা আমাকে ফাঁকি দিতে পারবেন। আমি আপনাদেরকে ফাঁকি দিতে পারবো। কিন্তু আমরা কেউই আল্লাহকে ফাঁকি দিতে পারবো না। যদি আমরা কিয়ামত বিশ্বাস করি। রাসূল (সা.) কসম করে বলেছেন, কিয়ামতের ময়দানে বাদী হয়ে আমি মামলা করবো, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোন বিধর্মীকে হত্যা করে তার বিরুদ্ধে। আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করবে, মানুষের ক্ষতি করবে সে প্রকৃত মুসলমান না। সে রাসূলের (সা.) উম্মত না, তিনি সেটা বলে দিয়েছেন।’ যোগ করেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

তিনি বলেন, আমাদেরকে আমল করতে হবে। এই পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময় আমরা কোন পদবী নিতে পারবো না, পরিবারের কাউকে নিয়ে যেতে পারবো না, নিজের করা জিনিসটাও নিতে পারবো না, কিছুই নিয়ে যেতে পারবো না। দুই হাত কাপড় নিয়ে যেতে হবে শুধু। কাফনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নিতে পারবো না।

‘কী নিতে পারবেন? রুহ তো আল্লাহর কাছে চলে যাবে। বডি তো মাটি খেয়ে ফেলবে। আর হিন্দু ধর্মে যাদেরকে পুড়ে, তাদের বডি ছাই হয়ে যাবে। আর মুসলমানরা মাটির ভেতর যাবে, একটা সময় পর বডি আর থাকবে না। মাটির জিনিস মাটির কাছে চলে যাবে। কিন্তু রুহ চলে যাবে সাত আসমানে। কী নিয়ে যাবেন আমাকে বলেন? এই যে পৃথিবীতে থেকে যে আমলটি করবেন, ওই আমলটি নিয়ে যেতে পারবেন। বাকি আর কিছুই আপনার সাথে যাবে না। সুতরাং ভালোভাবে, ঈমানের সাথে কাজ করুন। এটাও ঈমানের পরীক্ষা।’

পৃথিবীকে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট উল্লেখ করে ভূমিমন্ত্রী বলেন, আমরা এখানে এসেছি। কিন্তু এটা আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নয়। এটা আমাদের টেম্পরারি ঠিকানা। আমাদেরকে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। কোথায়? আখেরাত (পরকাল)। আপনি একজন ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর কাছে কী ফরিয়াদ করবেন, সুলেমানি জিন্দেগী। মানে দুনিয়া এবং আখিরাতে ভালো থাকা। এই দুইটাকে বলে সুলেমানি জিন্দেগী। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে চাইবেন, দুনিয়া এবং আখেরাত। এখন দুনিয়াতে ভালো কাজ করলেই তো আখেরাত পাবেন। দুনিয়াতে ভালো কাজ না করলে তো আখেরাত পাবেন না। আখেরাতে কী নিয়ে যাবেন?

‘একটা বিষয় নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। আমরা তো রাসূল (সা.) এর উম্মত। তিনি সমস্ত উম্মতকে বেহেস্তে নিয়ে যাবেন। না নেওয়া পর্যন্ত তিনি আল্লাহর কাছে সিজদা দিতে থাকবেন। এখন এটা ধরে নিলে আমার আর কি বলার আছে। তবে রাসূল (সা.) বলে এটাও বলে দিয়েছেন, যতবেশী আমল করবেন, তত বেশী সুলেমানি জিন্দেগী পাবেন।’

ভূমিমন্ত্রী বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, ভালো কাজ করার জন্য, জাতির সেবা করার জন্য। একজন সাধারণ মানুষের জবাবদিহিতা শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমরা যারা পদ-পদবী নিয়ে আছি আমাদের জবাবদিহিতা দুই জায়গায়। আল্লাহর কাছে তো আছেই, জনগণের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা আছে। অর্থ্যাৎ আমাদের শাস্তি ডাবল, রিওয়ার্ডও ডাবল। খারাপ কাজ করলে শাস্তি ডাবল।’

পৃথিবীর বয়স লক্ষ কোটি বছর জানিয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, অনেক প্রজন্ম এসেছে আর গেছে। আমরা থাকতে পারবো না। আগামী প্রজন্মও থাকতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা। আমরা কাজ করার সময় এসব মাথায় রাখলে কোন সমস্যা হবে না। ভালো কাজ করুন। মাইন্ডসেট পরিবর্তন করুন। সরকারের ভাবমূর্তি যাতে বাড়ে, দেশের মানুষ যাতে শান্তি পায় সে লক্ষে কাজ করুন। এটাও ঈমানী দায়িত্ব। দায়িত্ব তো পালন করতে হবে। এখানে অবহেলা করা যাবে না।

‘যাই হোক, আমি একটু ভিন্ন লাইনে কথা বললাম আজকে। এখানে আমার সচিব মনে করতে পারেন, স্যার মাদ্রাসায় পড়েছেন কিনা। না, আমি মাদ্রাসায় পড়িনি। তবে এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি।’ যোগ করেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।