
চবি প্রতিনিধি : কথা কাটাকাটি, মনোমালিন্য, ঝুপড়ি কিংবা শাটলে বসা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শাখা ছাত্রলীগের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। তবে গত বছরের ১৪ জুলাই চবিতে ছাত্রলীগের গঠিত দুই সদস্যের কমিটি এইসব সমস্যা সমাধান করে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আভাস দিলেও বিভিন্ন সময় বগিভিত্তিক সংগঠনগুলো জড়িয়েছে সংঘর্ষে।
আর প্রত্যেকটা সংঘর্ষের পেছনে ছিলো না বড় কোন কারণ। তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে দেখে বগিভিত্তিক সংগঠনগুলো বরাবরের মতো এখনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে করে রেখেছে থমথমে। অন্যসব সংঘর্ষের মতো শাখা ছাত্রলীগের চলমান সহিংসতায়ও ছিলো না বড় কোন কারণ। গত রোববার (২ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের ২৩৮ নাম্বার রুমে থাকা শাখা ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক সংগঠন কনকর্ডের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ বোরহানুল ইসলাম আরমানের সাথে বাকবিতণ্ডা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বগিভিত্তিক সংগঠন বিজয় গ্রুপের কর্মী মোঃ আবিরের।
জানা যায়, হলের ২৩৮ নাম্বার রুমে কনকর্ডের কর্মী মোঃ বোরহানুল ইসলাম ও তার রুমমেটের সাথে রুমের তালা বন্ধ রাখা নিয়ে মনোমালিন্য হয়। বোরহান ওই দিন রাতে রুমে তালা দিয়ে চলে গেলে তার রুমমেট এসে তাকে না পেয়ে আবিরকে জানায়। পরে বোরহান রুমে ফিরলে আবির নামে ওই ছাত্রলীগ কর্মী বোরহান এমন কেন করে সে বিষয়ে কথা বলতে আসলে এক বর্ষ জুনিয়র হয়েও আবিরের সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করে। এসময় বোরহান আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে আপনি কে, ‘আপনার এখানে কাজ কি’? এমন কথা বললে আবির নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে বোরহানের উপর একটি থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
এই ঘটনার পর বোরহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহাজালাল হলে অবস্থান করে আর আবির তার সিনিয়রদের জানায়। আর এই ঘটনায় দু’পক্ষের মধ্যে কথা বলে তখনি সমাধান হয়েছে বলে জানা গেলেও পরের দিন সোমবার রাতের ট্রেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে আবির নামে ওই ছাত্রলীগ কর্মীর উপর অতর্কিত হামলা চালায় বোরহান ও তার সহযোগীরা। এসময় আবির গুরুতর আহত হলে এক শিক্ষার্থী তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে গেলে সেখান থেকে চিকিৎসক আবিরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠায়। এই ছাত্রলীগ কর্মী এখনও চমেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে তুচ্ছ এই ঘটনা রূপ নিতে থাকে বড় আকারে। তিল থেকে তাল হওয়ার মতো সেই রাত থেকেই থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে পরদিন বুধবার বিকেলে বাঁধে সংঘর্ষ। এসময় বিজয় গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহারওয়ার্দী হলে এবং কনকর্ড গ্রুপ শাহাজালাল হলের সামনে থেকে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিজয় গ্রুপের কর্মীরা শাহাজালাল হলে প্রবেশ করলে সেই হলের প্রায় সকলে এক হয়ে ধাওয়া দেয় বিজয় গ্রুপকে। পরে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ৪ জনকে পুলিশ আটক করার পর রাত ১১টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এদিকে পরিস্থিতি শান্ত দেখে বিজয়ের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান ও আলাওল হল নিরাপদ ভেবে ঘুমাতে আসলে রাত ১ টার পর নগর মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন অনুসারী কনকর্ড ও সিক্সটিনাইনের কর্মীরা হঠাৎ হামলা চালায় বিজয় গ্রুপের উপর। এসময় দু’পক্ষে তুমুল সংঘর্ষে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে। পরে সংঘর্ষের ৪৮ মিনিট পর ঘটনাস্থলে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতি, লাঠিচার্জ ও দুই গ্রুপের প্রায় ৬০ কর্মীকে পুলিশের হেফাজতে নিলে দুই পক্ষ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যদিও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এর পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থমথমে। পরে বিকেল তিনটা থেকে সিক্সটিনাইন ও কনকর্ডের কর্মীরা আগের রাতে দখল করা সোহারওয়ার্দী হলে এবং নিজেদের আধিপত্যে থাকা শাহাজালাল হলে অবস্থান করে। অপরদিকে বিজয়ের কর্মীরা এ এফ রহমান ও আলাওল হলে অবস্থান করে। এসময় দু’পক্ষই সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এইদিকে এক হয়ে যায় নগর মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন অনুসারী উপ-গ্রুপগুলো এবং শিক্ষা উপ-মন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরি নওফেলের অনুসারীরা। পরে রাত সাড়ে ৯ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের সাথে বৈঠকে বসেন ছাত্রলীগের সব উপ-গ্রুপের নেতারা। যা রাত ১১ টার দিকে শেষ হয়। এসময় সবাই মিলে একসাথে রাজনীতি করার বিষয়ে একমত হয় সব গ্রুপের নেতারা। এবং পূর্বের ন্যায় যে যেই রুমে ছিলো তাকে সেখানে থাকতে দেওয়াতে রাজি হয়।
পরে রাত সাড়ে ১১ টার দিকে হলগুলো পর্যবেক্ষণের পরে ছাত্রলীগ কর্মীদের নিরাপদে উঠিয়ে দিতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসময় সোহরাওয়ার্দী হলে সিক্সটিনাইন গ্রুপের যারা আগে থাকতো না তারা উঠছে এমন প্রশ্ন তুলে বিজয় গ্রুপের নেতারা। পরে সিক্সটিনাইন গ্রুপের কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী হলে না উঠেই চলে যায়। যদিও বিজয় গ্রুপের কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী হলে স্ব স্ব কক্ষে ফিরে যায়।
এদিকে এমন পরিস্থিতিতে রাতেও বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে ছিলো ভীতিকর পরিবেশ। তাছাড়া ছাত্রলীগের সহিংসতা থেকে রেহাই না পেয়ে প্রতিবন্ধী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ছিলো নিরাপত্তার শঙ্কায়। আজ শুক্রবার সকাল থেকে কেটেছে থমথমে ভাব।
চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, উপাচার্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। আমরা তার কথা মেনে নিয়েছি। এখন আর কোন সমস্যা নেই।
এদিকে চবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা উপাচার্যের কথা মেনে নিয়েছি। এখন আর কোন সংঘাতের সম্ভাবনা নেই।
এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এস এম মনিরুল হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, গতকাল রাতে উপাচার্যের সাথে বৈঠকের পর ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে চলমান বিরোধ মিমাংসা হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে।
সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক, লুটপাট, ভাংচুর ৮৭টি কক্ষঃ
বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে সংঘাতের ঘটনা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের ১৫৯টি কক্ষের মধ্যে ৪৮টি ও সোহরাওয়ার্দী হলে ৪০টি সহ সর্বমোট ৮৭টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। তাছাড়া চারটি মোটরসাইকেল ভাংচুর ও হলের কক্ষে প্রবেশ করে তিনটি ল্যাপটপ চুরিসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের খবর পাওয়া গিয়েছে। আর এই ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত অর্ধশতাধিক।আহতদের মধ্যে দর্শন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মিনহাজ, সংস্কৃত বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মো. মুজাহিদুল, সমাজতত্ত্ব বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের আকতার হোসেন বিজয়, শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটের একই শিক্ষাবর্ষের সাখাওয়াত চৌধুরী, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শহিদুল ইসলাম, একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের জামিল হাসান, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ফরহাদ, একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এজাজ আহমেদ নিশান, লোক প্রশাসন বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের মেহেদী হাসান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সাহেল মিয়া, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ফাহিম হোসেনের নাম জানা গেছে। আহতদের মধ্যে অন্তত ৩৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। আরো ১৫ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শুভাশিষ চৌধুরী শুভ জানান, আহতদের মধ্যে অনেকের হাতে-পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। অনেকের হাত, পা, কোমড় ভেঙে গেছে। সবাইকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে তাদের এখানেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যারা খুব সংকটাপন্ন, তাদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
জানা যায়, এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন মামলা করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিবে তার ভিত্তিতে প্রশাসন জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। অন্যদিকে হলে ভাঙচুর ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরের বিষয়ে উপাচার্য দেখবেন বলে আশ্বাস দেন গতকাল রাতের বৈঠকে।