
চট্টগ্রাম নগরের খলিফাপট্টিতে মাস্ক তৈরির ‘কারখানা’। ছবিটি কাউন্সিলর প্রার্থী চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনীর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া।
চট্টগ্রাম : করোনাভাইরাসের প্রভাবে মাস্কের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকহারে। ওষুধের দোকানে মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না। দামও অনেক বেড়ে গেছে। আগে যেই মাস্ক ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করা হত, সেটা এখন কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে ১০০ টাকায়।
এছাড়া ফুটপাথে আরও নিম্নমানের মাস্ক বিক্রি হচ্ছে, ৪০-৫০ টাকায়। এ ধরনের মাস্ক তৈরি করার একটি স্বল্প পরিসরের ‘কারখানা’ আছে নগরের কোতোয়ালী থানাধীন খলিফাপট্টিতে।
সেখানে গতকাল শুক্রবার রাতে গিয়েছিলেন কাউন্সিলর পদপ্রার্থী চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী। মাস্ক তৈরির ‘কারখানা’ পরিদর্শনের ৬টি ছবি তিনি ফেসবুকে শেয়ার করেন। তাতে দেখা যায়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মাস্ক তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ তৈরি করা মাস্কের উপর খালি পায়ে হাঁটছেন, আবার কেউ জুতা-স্যান্ডেল নিয়েও মাস্কের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অপরিষ্কার মাস্কে জীবাণু থাকতে পারে। যা ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে সার্জিক্যাল মাস্কের পাশাপাশি গেঞ্জি বা সুতি কাপড়ের তৈরি এক ধরনের মাস দোকানে বা ফেরি করে বিক্রি হয়, যা মানুষ একটানা কয়েকবার এবং ধুয়ে ধুয়ে বেশ কিছুদিন ব্যবহার করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো মাস্ক টানা কয়েকদিন ব্যবহার করলে তা উল্টো আরও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অপরিষ্কার ওই মাস্কই হয়ে উঠতে পারে জীবাণুর বাসা।
এদিকে করোনা আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে হাসপাতালের ব্যবহৃত মাস্ক শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে আবার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এ ধরনের এসব খোলা মাস্ক ফুটপাতে ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ বলেন, আক্রান্ত না হলে মাস্ক ব্যবহারের যেমন প্রয়োজন নেই। যাদের দরকার নেই, তারা অযথা মাস্ক ব্যবহার করবেন না।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, মাস্ক কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যদি কারও কাছে মাস্ক না থাকে তিন লেয়ারের কাপড় দিয়ে মাস্ক তৈরি করে ব্যবহার করতে পারবেন।

খবর নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে মাস্কের বাজার অনেকটাই চীননির্ভর। কিন্তু কিছুদিন আগে চীনারাই বাংলাদেশ থেকে মাস্ক আমদানি করে নিয়ে গেছে। এখন চাহিদা মেটানোর জন্য দেশীয় উৎপাদনের উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় মাস্ক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বিশ্বব্যাপী মাস্কের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের গেটওয়েল ব্র্যান্ডের মাস্ক উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।আগে যেখানে দৈনিক ১৫ হাজার পিস তৈরি হত, সেখানে এখন শিফট বাড়িয়ে দৈনিক ৫০ হাজার পিস করা হয়েছে। কারখানা থেকে এখন ৫০ পিসের প্যাকেট আড়াইশ টাকা দরে বাজারে যাচ্ছে।
এসব মাস্ক বাতাসে ভেসে বেড়ানো নভেল করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে?
যেখানে ভাইরাস ছড়িয়েছে, সেখানে বাইরে বের হওয়ার সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার করা ভালো, কারণ তাতে হাত থেকে মুখে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে। আবার যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদেরও মাস্ক ব্যবহার করা উচিৎ, যাতে তাদের হাঁচি-কাশি থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।
তবে ওই মাস্ক বাতাসে ভেসে বেড়ানো করোনাভাইরাস আটকে দিতে পারবে, এমন ভরসা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন না।
নিউ সাউথ ওয়েলসে ২০১৬ সালে চালানো এক গবেষণার বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ প্রতি ঘণ্টায় নানা কারণে অন্তত ২৩ বার নিজের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে। এটা মানুষের সাধারণ অভ্যাস। এরা এই অভ্যাস থেকেই করোনাভাইরাসের মত রোগজীবাণুর সংক্রমণ ঝুকি থাকে বেশি, যেগুলো মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে।
বেলফাস্টের কুইনস ইউনিভার্সিটির এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন বিষয়ের গবেষক ড. কোনোর বামফোর্ড বিবিসিকে বলেন, সাধারণ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে এ ধরনের ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
যেমন হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে ফেলতে হবে, তারপর সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে হাত। সাবান ও গরম পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধুলে জীবাণু থাকার ঝুঁকি কমবে। আর না ধোয়া হাত যেন কোনোভাবেই মুখ, চোখ বা নাকের সংস্পর্শে না যায়। পাশাপাশি সুস্থ জীবনযাপনের সাধারণ নিয়মগুলোও মানতে হবে।
সবকিছুর পরও যদি কারও মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়, আতঙ্কিত না হয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।