মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকত

প্রকাশিতঃ সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২০, ৩:২০ অপরাহ্ণ


ঢাকা : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএসের (ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস) উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির মামলায় বাংলাদেশ জাতীয় বঙ্গলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট দাবি করা শওকত হাসান মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ এ আদেশ দিয়েছেন বলে জানান ইউআইটিএসের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান ভুঁইয়া।

এর আগে ৬০ কোটি চাঁদা দাবির ঘটনায় গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকতকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা করেন ইউআইটিএসের উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী মো. মোস্তফা কামাল।

এ মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েই পলাতক হয়ে যান অ্যাসার্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত হাসান মিয়া।

চাঁদাবাজির ওই মামলায় আদালত তাকে ছয় সপ্তাহের জামিন দেন, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি।

এরপর আজ সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন শওকত হাসান মিয়া।

জামিন শুনানিতে শওকতকের পক্ষে ছিলেন ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইকবাল হোসেন। অন্যদিকে ইউআইটিএসের পক্ষে দাঁড়িয়ে আসামি শওকতের জামিনের বিরোধীতা করেন অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান ভুঁইয়া। শুনানি শেষে আদালত শওকতকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর তাকে কারাগারে নিয়ে যায় ‍পুলিশ।

চাঁদা দাবির অভিযোগের ওই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, শওকত হাসানের মালিকানাধীন গুলশানের বারিধারা এলাকায় অবস্থিত ‘জামালপুর টুইন টাওয়ার-২’ ভাড়া নিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে ইউআইটিএস। এরইমধ্যে ভাটারা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ শেষ হলে ২০১৯ সালের মে মাস থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর শুরু হয়। একই সঙ্গে ইউআইটিএস’র উপাচার্যও স্থায়ী ক্যাম্পাসে অফিস শুরু করেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শওকত হাসান ও তার ক্যাডাররা উপাচার্যের কাছে বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা ছাড়াও মালামাল স্থানান্তরে বাধা দেন। এ বিষয়ে ২০ নভেম্বর ২০১৯ ভাটারা থানায় একটি জিডি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ সন্ধ্যায় ৫-৬ জন সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে এসে ইউআইটিএস’র উপাচার্যের গাড়ি আটকে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন শওকত হাসান। চাঁদা না পেয়ে পিস্তল উঁচিয়ে হুমকি ও প্রাণনাশের ভয়ভীতিও দেখান তিনি।

শুধু এই চাঁদাবাজির ঘটনাই নয়, এর আগেও ভাড়াটিয়াকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকত। প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে গত বছরের ২০ নভেম্বর রাজধানীর গুলশান থানায় শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন ইউআইটিএসের রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে গত ১৫ জানুয়ারি গুলশান এলাকা থেকে শওকত হাসানকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে সেদিন বিকালেই ঢাকা মহানগর হাকিম রাজেস চৌধুরীর আদালত ৫০০ টাকা বন্ডে তার জামিন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার সিএমএম আদালতে বিচারাধীন বলে জানান অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া।

চাঁদাবাজির নেপথ্য ঘটনা অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশানের বারিধারা এলাকায় অবস্থিত ‘জামালপুর টুইন টাওয়ার’টি শওকত হাসান মিয়ার। ২০১০ সাল থেকে সুউচ্চ এ ভবনের কয়েকটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ। বাড়ি ভাড়ার চুক্তি অনুযায়ী এককালীন ১০ বছরের ভাড়াসহ যাবতীয় পাওনাও ভবন মালিককে পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতেই বাগড়া বাধায় ভবন কর্তৃপক্ষ। শওকত হাসানের নির্দেশে গত ৩ নভেম্বর ২০১৯ তার ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মালামাল সরানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কাজে শুধু বাধাই দেয়নি, সন্ত্রাসীরা তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।

হামলার কারণ জানতে চেয়ে শওকত হাসান মিয়ার কাছে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রের অনুলিপি চেয়ে চিঠি দেয় ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শওকত হাসান পত্রের উত্তরে মূল বাড়ি ভাড়া চুক্তি গোপন করে সাক্ষীবিহীন এবং ইউআইটিএসের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান সমাজসেবায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে একটি জাল চুক্তি সরবরাহ করে ৫৭ কোটিরও বেশি টাকা দাবি করা হয়। এরপর মালামাল স্থানান্তরে বাধা প্রদান এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকেন। এরপর ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর শওকত হাসান তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ফের একই কাজ করেন। ২০ নভেম্বর শওকত তার স্টাফ আবুল কাশেম, এসএম মাহমুদ হাসান এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য পনির, জুয়েল, সোহেলসহ অচেনা আরও কয়েকজন সরাসরি ও মোবাইল ফোনে ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষের অনেককেই মালামাল স্থানান্তরে বাধা দেওয়াসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সার্বিক বিষয় জানিয়ে ওই দিনই গুলশান থানায় জিডি (নম্বর-১৪৫২) করেন ইউআইটিএসের রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান।

জিডির তদন্ত শেষে গুলশান থানার এসআই কামরুল ইসলাম গত ২৩ ডিসেম্বর আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেন- জামালপুর টুইন টাওয়ারের ভবন মালিক ১০ বছরের জন্য ভবনটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএসের কাছে ভাড়া দেন এবং বাড়ি ভাড়ার চুক্তির শর্তানুযায়ী এককালীন ১০ বছরের পুরো ভাড়ার টাকা গ্রহণ করেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জিডির বাদীর নিজস্ব ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শেষ হলে ভবন মালিক বরাবর নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করে আসবাবপত্র ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু ভবন মালিক মালামাল সরানোর কাজে বাধা দেয়। বিবাদী পক্ষ মো. শওকত হাসান মিয়া, এসএম মাহমুদ, মো. পনির মিয়া, মো. সোহেল মিয়া, মো. জুয়েল ও তাদের ভাড়াটিয়া লোকজনের মাধ্যমে বাদীপক্ষদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং প্রাণনাশেরও হুমকি-ধমকি দেয় বলে তদন্তে উঠে আসে। বিবাদীরা বিভিন্ন বিল বকেয়া আছে জানিয়ে ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষকে তা পরিশোধের জন্য চাপ দিলে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই আদালত শওকত হাসানসহ অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানার ভিত্তিতে গত ১৫ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন শওকত।

জানা গেছে, শওকত হাসান মিয়ার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলাধীন কুলকান্দী ইউনিয়নে। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, পেশী শক্তির বলে নিরীহ অনেকের জমি জবরদখল করাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রশাসনের কয়েকটি দপ্তরে শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অভিযোগ করেছেন।

এদিকে জনৈক এক মেজরের বাসায় কর্মরত গৃহকর্মী শওকত হাসান কিভাবে এক স্বল্প সময়ে এত বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন, তা তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে শওকতের কাছে সম্পত্তির বিবরণাদি প্রদানের নোটিশ প্রদান করেছে দুদক।