মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

বঙ্গলীগের শওকতের খুঁটির জোর কোথায়?

| প্রকাশিতঃ ২৮ অগাস্ট ২০২০ | ৬:১৮ অপরাহ্ন


ঢাকা : ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের (ইউআইটিএস) উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির মামলায় আদালতের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাজির হননি ‘বাংলাদেশ জাতীয় বঙ্গলীগ’র প্রেসিডেন্ট শওকত হাসান মিয়া। উল্টো গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তার আনজীবীরা আদালতের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

চাঁদাবাজির ওই মামলায় ভুয়া ও জাল মেডিক্যাল সনদ দেখিয়ে গত ১২ আগস্ট জামিন পান শওকত। ঘটনা জানাজানি হলে গত ২৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম কোর্টের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমান আসামি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ২৭ আগস্ট (গতকাল বৃহষ্পতিবার) সকাল ১০টায় আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আদালত সূত্র জানায়, গতকাল এজলাসে হাকিমের উপস্থিতি শুনানি চলাকালে শওকতের আইনজীবীরা ঢুকে পড়েন বিচারকের খাসকামরায়। এতে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আসামির আইনজীবীদের অসদাচরণ ও অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে শুনানির আদেশ দিতে বিব্রতবোধ করেন আদালত। বিষয়টি গড়িয়েছে ঢাকার সিএমএম জুলফিকার হায়াত-এর দপ্তর পর্যন্তও। বাদী পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে খাসকামরায় অনাকাঙ্খিত ঘটনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের অধিকতর শুনানির সত্তর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

ইউআইটিএস’র পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া বলেন, ইউআইটিএস’র উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে চলতি বছরের গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় শওকত হাসান মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলাটি দায়ের করেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী মো. মোস্তফা কামাল।

ওই মামলায় গত ৮ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান শওকত হাসান। আদালত তাকে ছয় সপ্তাহের জামিন দিয়েছিলেন। কিন্তু জামিনের মেয়াদ শেষ হলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিম্নআদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। পাঁচ মাস পর গত ২৭ জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতে শওকত হাসান মিয়া গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আত্মসমর্পণপূর্বক জামিনের আবেদন করেন। অসুস্থতার সমর্থনে কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে না পারায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাকী বিল্লাহ জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান।

গত ১২ আগস্ট শওকত হাসানের আইনজীবীর মাধ্যমে ঢাকার পশ্চিম রামপুরার ডেলটা স্পেশালাইজড হসপিটালের প্যাডে দেওয়া একাধিক ‘চিকিৎসা সনদ’ ব্যবহার করে আদালতে জামিন আবেদন করেন। এ জামিন আবেদন করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিষ্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার ও এম.এম. গাফফার চোধুরী ইমন। প্রাপ্তনথি পর্যালোচনা করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শারাফুজ্জামান আনসারীর আদালত সে দিনই শওকত মিয়াকে জামিন দেন।

কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদালতকে যে চিকিৎসা সনদপত্র দেখিয়ে শওকত মিয়া জামিন নিয়েছেন তার পুরোটাই ছিলো জাল ও ভুয়া। বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত সাপেক্ষে ১৮ আগস্ট লিখিতভাবে জানান, আসামি শওকত হাসান মিয়ার পক্ষে আদালতে দাখিলকৃত ম্যাডিক্যাল সার্টিফিকেটটি জাল। পরে ঢাকার সিএমএম আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট সারাফুজ্জামান আনছারী কর্তৃক আসামীর অনুকূলে ১২ আগস্ট প্রদত্ত শওকত হাসান মিয়ার জামিন আদেশটি বাতিল ও জামিন সংশ্লিষ্ট জাল জালিয়াতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য গত ২০ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের কাছে আবেদন করেন।

আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৩ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমান আসামির জামিন কেন বাতিল হবে না এবং আসামীর উপস্থিতি নিশ্চিতকল্পে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। পাশাপাশি লিখিত বক্তব্যসহ আসামির উপস্থিতি সাপেক্ষে ২৭ আগস্ট (গতকাল) সকাল ১০টায় আদালত উপস্থিত থাকার জন্য আসামির আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমএ গাফফার চৌধুরীকে নির্দেশ দেন। একই দিন একই সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকেও হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন আদালত।

অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে সিএমএম কোর্টের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর রহমানের আদালতে বাদী পক্ষের আইনজীবী ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু ও গাজী শাহ্ আলম-এর নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক আইনজীবী আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের উপর শুনানি করেন। আদালত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার শুনানি গ্রহণ করেন। কিন্তু আসামি শওকত হাসান মিয়াকে ছাড়াই তার আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন।

আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে পরে আদেশ দিবেন মর্মে উভয় পক্ষকে জানান। বিচারকের এজলাসে বাদী পক্ষের আইনজীবীগণ আদেশের আপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার ও এমএ গাফফার চৌধুরী ইমন বিচারকের খাস কামরায় অবস্থান করেছেন বলে আদালত জানতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে আদালত বাদীপক্ষের ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবীগণসহ অন্যান্য আইনজীবীর সামনেই খাসকামরা থেকে আদালতের সম্মুখে হাজির হওয়ার জন্য আসামির দুই আইনজীবীকে ডেকে পাঠান। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আসামি পক্ষের আইনজীবীরা বিচারকের খাস কামরা থেকে আদালতের সামনে আসেন এবং মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে হাকিম এই মামলার আদেশ প্রদানে বিব্রতবোধ করেন এবং বাদীপক্ষের আইনজীবীগণকে এই বিষয়ে প্রতিকারের জন্য সিএমএম-এর কাছে স্বাক্ষাত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। এই নির্দেশনা পেয়ে বাদী পক্ষের আইনজীবী ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি গাজী মো. শাহ আলমসহ সিনিয়র আইনজীবীগণ ঢাকার সিএমএম জুলফিকার হায়াত-এর সাথে সাক্ষাত করেন। বাদী পক্ষের আইনজীবীগণের বক্তব্য শুনে আদালত অনাকাঙ্খিত ঘটনার বিষয়টি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আশ্বাস প্রদান করেন এবং আসামির জামিন বাতিলের আবেদনের অধিকতর শুনানির জন্যে সত্তর ব্যবস্থা নিবেন মর্মে আশ্বস্ত করেন।

অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাসুমুর রহমান মজুমদার বলেন, বৃহষ্পতিবার আদালত চলাকালীন সময়ে বিচারকের খাস কামরায় কোনও ধরণের অপ্রিতীকর ঘটনাই ঘটেনি। এটা স্রেফ অপপ্রচার; বরং গতকাল আদালতে তিনি-ই হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।

ইউআইটিএস’র পক্ষে আইনজীবী মান্নান ভূঁইয়া জানান, সেনাবাহিনীর কোর্ট মার্শালের বিচারে চাকরিচ্যুত সিপাহী হয়েও অবসরপ্রাপ্ত মেজর পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন প্রতারণা করে আসছেন বঙ্গলীগের প্রেসিডেন্ট শওকত হাসান মিয়া। যার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি কেবল এই ৬০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি মামলারই আসামি নন। তার বিরুদ্ধে সমাজসেবায় একুশে পদকপ্রাপ্ত ও ইউআইটিএস’র বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এবং পিএইচপি ফ্যামিলি’র চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে ৫৭ কোটি টাকা দাবীর অভিযোগও রয়েছে। ওই জাল-জালিয়াতির মামলায় শওকত হাসানের বিরুদ্ধে গত বুধবার গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

ঢাকার সিএমএম আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. তোফাজ্জল হোসেন ওই মামলার আসামি শওকতের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্ত প্রতিবেদন (অভিযোগ পত্র) আমলে নিয়ে এই পরোয়ানা জারি করেন। এছাড়াও গুলশান থানা পুলিশ গত ২৩ ডিসেম্বর ইউআইটিএস-এর উপাচার্য ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনেককে হত্যার হুমকি দেয়ায় শওকত হাসান মিয়া ও তার সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৫০৬ ধারায় তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন আকারে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি প্রসিকিউশন দাখিল করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। শওকত হাসান মিয়া তার নিজ জেলা জামালপুর ও ঢাকায় বহু অপকর্ম করার কারণে সংক্ষুব্ধদের আবেদনের প্রেক্ষিতে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) তার বরাবর নোটিশ দিয়েছেন বলেও অ্যাডভোকেট মান্নান জানান।