সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২

ডায়াবেটিসের লক্ষণ কী

| প্রকাশিতঃ ১৪ নভেম্বর ২০২০ | ২:০৬ অপরাহ্ন


ডা. শাহজাদা সেলিম : ’ডায়াবেটিস সেবায় পার্থক্য গড়ে দেন নার্সিং’- এ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন এ দিবসটির উদ্যোক্তা। জাতিসংঘ এ দিবসটির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তাই পৃথিবীর সবক’টি দেশ প্রতি বছরে ১৪ নভেম্বর এ দিবসটি পালন করে আসছে। আশা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব দেশের নীতিনির্ধারকমণ্ডলী তাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করবে।

ডায়াবেটিস পৃথিবীতে মহামারি আকারে বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের হিসাব মতে, ২০১৯ সালে প্রতি ১১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন (মোট ৪২৫ মিলিয়ন); ২০৪৫ সালে ৪৮ শতাংশ বেড়ে তা ৬২৯ মিলিয়ন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পৃথিবীর মোট ডায়াবেটিস রোগীর ৮৭ শতাংশই উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে বসবাস করছেন। বাংলাদেশে যেমন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশি, তেমনি ডায়াবেটিস বাড়ার হারও বেশি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ ডায়াবেটিস সংখ্যাধিক্য দেশের মধ্যে দশম। আরও ভয়াবহ হলো ২০৩০ ও ২০৪৫ সালে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে থাকবে।

পৃথিবীতে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা উচ্চহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে। বাংলাদেশসহ সব উন্নয়নশীল দেশে খুব দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, মানুষের দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে আনুপাতিক ও কাঙ্ক্ষিত হারের চেয়ে বেশি। মানুষের দৈহিক শ্রম দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মানসিক চাপ বেড়েছে অনেকগুণ। উন্নত দেশগুলোতে ডায়াবেটিস রোগীর হার কমলেও তবে তা খুব উল্লেখযোগ্য হারে নয়।

অঞ্চলভেদে মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কিছুটা চরিত্রগত ভিন্নতা রয়েছে। এ এলাকায় প্রধানত টাইপ-২ ও অন্যান্য বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় প্রথমবার ডায়াবেটিস ধরা পড়ার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে এ এলাকার দেশগুলোতে। উন্নত দেশে নারীকে বেশি সংখ্যায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগতে দেখা যায়, আর উন্নয়নশীল দেশে পুরুষরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে বেশি সংখ্যায় ভোগেন। বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। আগের তথ্যটি কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশ ঘটায়। যেমন- খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক শ্রম বা ব্যায়াম, আনুপাতিক হারে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ইত্যাদি।

ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো হলো :

>> ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়াষ তেষ্টা পাওয়া

>> নিয়মিত খাওয়ার পরও ঘন ঘন খিদে

>> প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত অনুভব করা ও চোখে ঝাপসা দেখা

>> শরীরের বিভিন্ন অংশের কাটাছেঁড়া সহজে না সারা

>> কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া

>> প্রদাহজনিত রোগে বারবার আক্রান্ত হওয়া

হাতে-পায়ে ব্যথা বা মাঝে মাঝে অবশ হয়ে যাওয়া। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো সবসময় নাও থাকতে পারে। প্রতি ২ জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে ১ জন জানেনই না যে, তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর এটাই হচ্ছে ভয়ানক বিপদের কথা। কারণ ডায়াবেটিসের জটিলতাগুলো রোগের প্রাথমিক ধাপ থেকেই শুরু হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী চোখের জটিলতা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা, পায়ে পচন, খোসপাঁচড়া প্রভৃতি জটিলতা নিয়ে ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় তাই ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও জটিলতা প্রতিরোধের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই জেনে নিন ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ না থাকলেও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত।

>> বয়স ৪৫ বা তার বেশি হলে

>> স্থূল ব্যক্তি

>> রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস থাকলে

>> শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি।ষ প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে

>> মহিলাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা অধিক ওজনের সন্তান প্রসবের পূর্ব ইতিহাস

>> পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম থাকলে

>> উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক হলে

>> রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি এবং এইচডিএলের মাত্রা কম থাকলে

তা ছাড়া গর্ভবতী মহিলাদের সময়মতো ডায়াবেটিস নির্ণয় না হলে বেশি ওজনের শিশু জন্মদান, অকাল গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, প্রসব পরবর্তী শিশুমৃত্যু, জন্মগত ত্রুটি বা প্রসব পরবর্তী মা ও সন্তানের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। তাই প্রথম চেক-আপের সময় অথবা গর্ভধারণের ২৪-২৮ সপ্তাহে প্রত্যেক গর্ভবতী মায়েদের ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ পরীক্ষা করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা