শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

ধর্ষণের আসামীকে রাতভর বাদিনীর পাহারা, থানায় থানায় দৌড়ঝাঁপ!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২১, ১১:৩৩ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : পুলিশে ধরিয়ে দিতে ধর্ষণ মামলায় পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে রাতভর পাহারা দেন বাদিনী। দফায় দফায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে ফোন করা হয়। কিন্তু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ডিউটি থাকার অজুহাতে আসামীকে গ্রেফতার করতে আসেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

আসামীর অবস্থান ভিন্ন থানা এলাকা হওয়ায় বাদিনী ও তার স্বামী কখনো এ থানা, কখনো ওই থানায় রাতভর ঘোরাঘুরি করেন। তবুও পুলিশের সহযোগিতা মিলেনি। শেষমেষ হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যান কিশোরী কন্যার ধর্ষণ মামলার বাবা-মা।

ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায়।

জানা গেছে, এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে করা মামলায় গতবছর ১৯ জানুয়ারি তিন আসামি আল-আমীন, ফরিদা ইয়াছমিন ও মোহাম্মদ এনামের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

বাদির অভিযোগ, বিগত এক বছরে তিন আসামির একজনকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হাটহাজারী থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ দে।

বৃ্হস্পতিবারের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার কিশোরীর বাবা একুশে পত্রিকাকে জানান, বৃহস্পতিবার রাত দশটার দিকে নগরের আতুরার ডিপো এলাকার শান্তিনগর কলোনিতে মামলার অন্যতম আসামি মো. এনামের অবস্থান তিনি নিশ্চিত হন। এরপর বিষয়টি তিনি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রদীপ দে-কে অবহিত করেন। উত্তরে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি গুরুত্বপূর্ণ ডিউটিতে আছি। তাছাড়া আসামির অবস্থান তো বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায়। আসামি ধরতে ওই থানা এলাকায় যেতে হলে ওসি’র অনুমতি লাগবে।’

আসামি গ্রেফতারে ঘটনাস্থলে যেতে পুলিশকে অনুরোধ জানানোর জন্য পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে প্রতিবেদকের সহযোগিতা চান মামলার বাদি। রাত ১১টার দিকে উপ পরিদর্শক প্রদীপ দে’কে ফোন করেন প্রতিবেদক। তিনি বলেন ‘ভাই আমি নির্বাচনী ডিউটিতে আছি।’

বিষয়টি হাটহাজারী থানার ওসি (তদন্ত) রাজিব শর্মাকে জানালে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন,’বাদিকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেন।’ মামলার বাদি স্ত্রীসহ ২-৩ জন বন্ধুকে কৌশলে আসামিকে পাহারায় রেখে বাদিনীর স্বামী রাত ১২টার দিকে ছুটে যান হাটহাজারী থানায়।

সেখানে যাবার পর ওসি (তদন্ত) রাজিব শর্মা সই করে আসামির গ্রেফতারি পরোয়ানার একটি কপি বাদির স্বামীকে ধরিয়ে দিয়ে বায়েজিদ বোস্তামি থানায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে পরোয়ানার কপিটি ওসি প্রিটন সরকারকে দেন। তিনি বিষয়টি দেখার জন্য ডিউটি অফিসারের কাছে পাঠান। ডিউটি অফিসার পরোয়ানার বাহককে বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রদীপ বাবু না এলে আমাদের পক্ষে আসামি গ্রেফতার করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া ওয়ারেন্টের কপিও ফটোকপি। এটির আসলটা লাগবে।’

বাদির পক্ষ থেকে প্রদীপ দেকে ফোন করে আসামি ধরতে ঘটনাস্থলে আসার জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এবারও তিনি বলেন, ‘আমি ওয়ারেন্টে সই করে দিয়েছি। তারা (বায়েজিদ থানা পুলিশ) চাইলে আসামি ধরতে পারবেন।’

এভাবে রাত হয়ে যায় ঘড়ির কাঁটায় ২টা। এদিকে আতুরার ডিপোর শান্তি কলোনিতে পূর্বপরিচিত একজনের ঘরে অবস্থান নিয়ে রাতভর আসামিকে পাহারা দেন মামলার বাদিনী। কিন্তু রাত পেরিয়ে ভোর হয়, আসামিকে গ্রেফতার করতে ঘটনাস্থলেই যাননি হাটহাজারী বা বায়েজিদ বোস্তামি থানার কোনও পুলিশ সদস্য।

জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি প্রিটন সরকার বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামি ধরতে আমাকে বললে আমি ব্যবস্থা করতাম। তাছাড়া তারা তো নিজেরাও ঘটনাস্থলে এসে ওই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারতেন।’ বাদির মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি পাঠানোর পরও আসামিকে গ্রেফতার করা যায়নি কেন-এমন প্রশ্নে ওসি প্রিটন সরকার বলেন, ‘অন্য থানার মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে কিছু নিয়ম আছে। সেটা আমাদের মেনে চলতে হবে।’

হাটহাজারী থানার ওসি (তদন্ত) রাজিব শর্মা শুক্রবার সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গতকাল রাতে আমাদের থানা এলাকায় কিছু ডাকাত ঢোকার তথ্য ছিল। এ কারণে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রদীপ রাতভর ব্যস্ত ছিলেন। তাছাড়া আমি তো ওয়ারেন্টে সই করে বাদিকে বায়েজিদ থানায় পাঠিয়েছি। এখন তারা আসামি গ্রেফতার না করলে আমাদের কী করার আছে।’

প্রসঙ্গত, কিশোরী কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ২০১৯ সালের ৫ মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২ আদালতে মামলা করেন ভিকটিমের মা। আদালত সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।