রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

চবি ছাত্রলীগের কমিটি: দুইজন মিলে পার করে দিলেন দুই বছর

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুলাই ১৪, ২০২১, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রলীগের এক বছরের জন্য অনুমোদিত কমিটি পার করলো দুই বছর। ২০১৯ সালের আজকের এই দিনে (১৪ জুলাই) রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে এই কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু দুইজন মিলে দুই বছর পার করে দিলেও চবি ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীকে তারা দিতে পারেনি সাংগঠনিক পরিচয়।

এর মধ্যে নারী নিয়ে হোটেলে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়ে সমালোচিত হয়েছেন সভাপতি রেজাউল হক রুবেল। ২০০৭ সালে ক্যাম্পাসে ছাত্র হিসেবে প্রবেশ করে ২০২১ সালেও তিনি ছাত্র রাজনীতি করছেন। অথচ তার সেশনে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করেছে নিয়ম অনুযায়ী ২০১১ সালে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর প্রশাসনে দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রক্টর লিটন মিত্র রেজাউল হক রুবেলকে ২০১৮ সালে উপাচার্যের ক্ষমতায় বিশেষ পরীক্ষা দিতে অনুমতি নিয়ে দেন। শুধুমাত্র ছাত্রলীগের সভাপতি হতে তৎকালীন উপাচার্য ও সহকারী প্রক্টর লিটন মিত্রের অনুকম্পায় অতিরিক্ত প্রায় ১০ বছর ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখে রুবেল।

ক্যাম্পাসে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অনেকের ভাষায় ‘আদু ভাই’ খ্যাতি নিয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দিতে পারেননি।

গত বছরের ২১ নভেম্বর চবি ছাত্রলীগের ২৯১ জন নেতাকর্মী রেজাউল হক রুবেলের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, মাদক ব্যবসা ও ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের উত্যক্ত করার অভিযোগ তুলে বিবৃতি প্রদান করে। এ সময় বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, সাবেক অর্থ সম্পাদক এস এম জাহেদুল আওয়াল, সাবেক শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক আমির সোহেল, উপ-সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ইমাম উদ্দীন ফয়সাল পারভেজ, ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয়, এইচ এম ইশতিয়াক, মোরশেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ পারভেজ, মাহফুজুর রহমানসহ ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ‘রেজাউল হক রুবেলের নারী নিয়ে হোটেলে গিয়ে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তবুও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি এখন ব্যক্তিগত কার নিয়ে চলাফেরা করেন। অথচ ছাত্রলীগ সভাপতি পদ পাওয়ার আগে তার গাড়ি ছিল না। এই পদ বিক্রি করে তিনি নিজের ভাগ্যের উন্নতি করেছেন।’

তারা আরও বলেন, ‘এক বছরের কমিটি দুই বছর পার করলেও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ রুবেল-টিপুকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে নির্দেশ দিচ্ছে না। রুবেল-টিপু ক্যাম্পাসে বলে বেড়ান, তারা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে ম্যানেজ রেখেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তাদের কথার বাইরে যাবে না।’

চবি ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিজয় গ্রুপের নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘তারা করোনার অজুহাতে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে না। অথচ সারাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে, জেলা-উপজেলায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে৷ আমাদের নেতাকর্মীরা এই করোনাকালীন সময়ে জীবন বাজি রেখে অসহায়দের জন্য কাজ করছে। আমি নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়েছি লকডাউনে মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে। ক্যাম্পাসে আমরা বৃক্ষরোপন, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ছাত্রদের আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’

ইলিয়াস আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে তারা কমিটি নিয়ে বসতে না পারুক সমস্যা নেই। আমাদের শত শত কর্মী ছাত্রলীগ করছে। তাদের সঙ্গে বসে তারা কমিটি দিতে পারতো। এক বছরের কমিটি যেহেতু দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ করেনি সেহেতু তারা আর করতে পারবে না। তাই আমরা শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভাই ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের হস্তক্ষেপ চাইছি৷ এভাবে শত শত নেতাকর্মী বছরের পর বছর সাংগঠনিক পরিচয় ছাড়া থাকতে পারে না।’

ছাত্রলীগের ভিএক্স গ্রুপের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দূর্জয় বলেন, ‘করোনার অজুহাতে সভাপতি-সাধারণ কমিটি দেয় না। তারা এক বছরের জন্য দায়িত্ব পাওয়ার পর করোনার আগে নয় মাস সময় পেয়েছিল। তখন তারা নানা অজুহাতে কমিটি করেনি। নানা জেলা-উপজেলা, ক্যাম্পাসে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে। চবি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা করোনায় অসহায়দের পাশে নানাভাবে দাঁড়াচ্ছে। অথচ তাদের পদবিহীন করে রেখেছে দুইজন মিলে। তাদের কাছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যেন জিম্মি।’

জানতে চাইলে চবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, হল ও ফ্যাকাল্টির কমিটি গঠন করার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সেটা সম্পন্ন করতে পারিনি। করোনাকাল শুরুর পর ছাত্রলীগের কোন ইউনিটে কমিটি হয়নি। লকডাউনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় এখন বন্ধ। ক্যাম্পাস খোলা হলে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’

অন্যদিকে চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। ছাত্রদের নিয়ে আমি কমিটি করবো, সেই ছাত্ররা তো ক্যাম্পাসে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলে সাথে সাথে আমরা কমিটি গঠন করবো। কমিটিতে হত্যা মামলার আসামি, চাঁদাবাজদের স্থান হবে না।’

‘হল কমিটি, ফ্যাকাল্টি কমিটিও করে দেবো। যাতে যোগ্য সবাই পদ পায়। এতদিনেও কমিটি না হওয়ায় আমিও হতাশ। কিন্তু ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় আমার কিছু করার নেই। এখন করোনা পরিস্থিতি। সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে।’

রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘ছাত্রলীগ একটি বড় সংগঠন। এছাড়া এখানে অনেক অনুপ্রবেশকারী থাকে। চাইলেই একদিনে কমিটি গঠন করা যায় না, অনেক যাচাই-বাছাই করতে হয়।’

সভাপতি হওয়ার পর ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারেরর অভিযোগ প্রসঙ্গে রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘করোনার মধ্যে আমি ঘরে ঘরে ত্রাণ দিয়ে এসেছি। লকডাউনে তো গাড়ি নেই। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে খুবই কম দামে নিম্নমানের একটি গাড়ি.. ওদের অনেকগুলো গাড়ি সেটা ব্যবহার করতো না। সেজন্য আমাকে কিছুদিনের জন্য দিয়েছিল। এখন তো গাড়ি নেই আর। কিছুদিনের জন্য ছিল। ওই গাড়ির মালিক আমি না।’

২০০৭ সালে চবিতে ছাত্র হিসেবে প্রবেশ করে এখনো ক্যাম্পাসে রাজনীতি করা প্রসঙ্গে রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার জন্য যা প্রয়োজন সব আমার আছে। আমি অনার্স সম্পন্ন করেছি। তবে কিছু বিষয়ে ইমপ্রুভমেন্ট আছে।’