রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

হাটবাজারে করোনার ভয়, ঝুঁকি এড়াতে অনলাইন!

প্রকাশিতঃ রবিবার, জুলাই ১৮, ২০২১, ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম নগরে জমে উঠেছে অনলাইনে কোরবানির পশুবিক্রি। বাজারে গেলে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, করোনা সংক্রমণের ভয়ে অনেক ক্রেতা গরুর হাটে যেতে চাচ্ছেন না। অনলাইনে পছন্দের পশু কিনে নিচ্ছেন। সরকারিভাবেও অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়ে ক্রেতাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। খামারিরাও নিজের ফেসবুকে গরু বিক্রির কথা প্রচার করছেন।

তবে করোনার কারণে এবার কোরবানির বাজারে পর্যাপ্ত গরু পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে ক্রেতার মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

খবর নিয়ে জানা গেছে, ক্রেতার মাঝে করোনা সংক্রমণের ভয় সৃষ্টি হওয়ায় অনলাইন বা ডিজিটাল হাটে বেড়েছে কোরবানির জন্য গরু, ছাগল বিক্রি। ভিডিওতে গরুর ওজন, কয়টা দাঁত, মাংস কতটুকু পাওয়া যাবে, ক্রেতাদের এ ধরনের জটিল সব প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন বিক্রেতারা। লাইভে এসে গরু নিয়ে কথাও বলছেন তারা। উদ্যোক্তাদের ফেসবুক পোস্টে ভরে যাচ্ছে গরু-ছাগলের ছবিতে।

গত বছরের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনেক মানুষ চাকরি হারিযেছেন। অনেকের আয় কমে গেছে। তাই অনেকে পশু কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তবু হাল ছাড়েননি চট্টগ্রামের পশু বিক্রেতারা।

চকবাজার এলাকার খামারি ফরিদ হোসেন বলেন, “ঈদ-উল-আযহাকে টার্গেট করে চট্টগ্রাম শহরের অনেক উদ্যোক্তা খামারে গরু লালন পালন করলেও করোনাকালে বাজার কেমন হবে তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এবার বাজার মন্দা হবে বলেও আশংকা আছে।”

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রিয়াজুল হক বলেন, “করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে এবার অনলাইনে কোরবানির গরু-ছাগল বেচাকেনায় বেশ সাড়া পড়েছে। বাজারে কোরবানির পশুর সংকটও নেই।”
সংস্থাটির আরেক কর্মকর্তা জানান, “গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামে অনলাইনে অন্তত ৬ হাজার কোরবানির গরু-ছাগল বিক্রি হয়েছে। খামারিরাও ফেসবুকে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।”

এদিকে অনলাইনে পশু বেচাকেনা নিয়ে প্রতারণার ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে নজরদারি করছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, “গত বছর অনলাইনে পশু বেচাকেনার ক্ষেত্রে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে বলে জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে এবার পুলিশ সতর্ক আছে।”

সিএমপির আরেক কর্মকর্তা বলেন, “গত বছর ক্রেতার কাছ থেকে অনলাইনে পশুবিক্রির টাকা বিকাশে নিয়ে পরে বিক্রেতা হাওয়া হয়ে যাবার ঘটনাও ঘটেছে। কোনো কোনো বিক্রেতা অনলাইনে দেখিয়েছেন বড় গরু, কিন্তু সরবরাহ করেছেন ছোট গরু। এ নিয়ে এবার পুলিশের নজরদারি আছে।”

একাধিক খামারি জানান, গত ২/৩ দিন ধরে চট্টগ্রাম শহরে অনলাইনে পশু বেচাকেনা বেড়েছে। ক্রেতারাও খবরাখবর নিচ্ছেন। বিক্রেতারা ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

সিডিএ মার্কেট এলাকার খামারি আফজাল হোসেন বলেন, ‘বাজারে আসার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না ক্রেতারা। তাই এবার অনলাইনে সাড়া পাচ্ছি। আমার খামারে (করিম এগ্রো লিমিটেড) ৩৫টি কোরবানির পশুর মধ্যে ইতিমধ্যেই ২০টি বিক্রি হয়ে গেছে। গরুর দাম পড়েছে ১ থেকে আড়াই লাখ টাকা। আমার আশা, বাকিগুলোও বিক্রি হয়ে যাবে।”

অনলাইনে পশুবিক্রি নিয়ে প্রতারণার কথাও জানান বিবিরহাট হামজারবাগ এলাকার খামারি তাপস। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, “গত বছর বিকাশে টাকা লেনদেন নিয়ে প্রতারণা হয়েছে। তবে এবার প্রতারণা ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলো তৎপর আছে।”

বিক্রেতারা জানান, প্রতিবছর এই সময়ে বাজারে পশু বেচাকেনা জমজমাট হয়ে ওঠে। ভারত থেকে অবৈধ পথে গরু আসা কমে যাবার পর গত কয়েক বছরে দেশে অনেক খামার গড়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলেও অনেক পরিবার কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য গরু-ছাগল লালন পালন করেছে। কিন্তু করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এবার গরু-ছাগল বেচাকেনা নিয়ে সংকটও হতে পারে।

নগরের দক্ষিণ কাট্টলি এলাকায় একটি খামার পরিচালনা করেন বেলাল চৌধুরী। প্রতিবছর ঈদ-উল-আযহার সময় তিনি ৪০/৫০টি গরু বিক্রি করেন। এবার ঈদে বিক্রির জন্য তিনি খামারে কোনও গরু রাখেননি। “করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে এবার কোরবানির পশুর বাজার মন্দা হতে পারে। তাই পশু রাখিনি।’’- বলেন বেলাল চৌধুরী।
বহদ্দারহাট এলাকায় পশুর খামার আছে বাদশা খানের। তার খামারের নাম ‘খান এগ্রো ফার্ম’। তিন বছর ধরে কোরবানির পশুর ব্যবসা করছেন তিনি। এবারই প্রথম অনলাইনে পশুবিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

বাদশা খান শনিবার (১৭ জুলাই) একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একসময় গরুর হাট মানেই ক্রেতা-বিক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। এখন করোনাকাল। বড় গরুর চাহিদা খুব একটা নেই। খামারে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু আছে ৫০টি। ছিল ৯০টি। দাম ৫০ থেকে এক লাখ টাকা। অনলাইনে ক্রেতাদের সব তথ্য দিচ্ছি। ভিডিওতে গরু নিয়ে কথা বলছি। গত এক সপ্তাহে ৪০টি গরু বিক্রি করেছি।’

বায়েজিদ চন্দ্রনগর এলাকার বাসিন্দা ব্যাংকার এমদাদ হোসেন বলেন, “করোনার এই সময়ে হাটে গিয়ে গরু কেনার পরিস্থিতি নেই। গতকাল শুক্রবার অনলাইনে একটা গরুর ছবি দেখেই কিনে ফেলেছি। দাম পড়েছে ৮০ হাজার টাকা। মাংস হবে প্রায় আড়াই মণ।”

একাধিক বিক্রেতা জানান, ফেসবুকে গরু বা ছাগলের ছবি দিয়ে ওজনসহ বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন তারা। ক্রেতারা ছবি দেখে পছন্দ হলে তাদের সঙ্গে মেসেঞ্জার বা মোবাইল ফোনে কথা বলে দরদাম ঠিক করছেন।
আগ্রাবাদ এলাকার খামারি ইকবাল হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহে গরু-ছাগল বিক্রি করেছি ২২ লাখ টাকার বেশি। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, “করোনার কারণে অনলাইনে পশু বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। এবারের উদ্যোগটা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। কোরবানির গরু-ছাগল সারা দেশে ডেলিভারি দিচ্ছি।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাশ করা আরাফাত সানি বলেন, “আমি কোনও খামারি না। ৬ মাস আগে রাজশাহী থেকে ৫০টি গরু এনেছি। এ যাবত অনলাইনে ১২টি গরু বিক্রি করেছি। অনলাইনে আর সব গরু বিক্রি হবে না। আরও তিন দিন সময় আছে পরিস্থিতি বুঝে বাজারে গরু তুলবো।’’

হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান অনলাইনে এবারই প্রথম গরুর বিক্রি করছেন। বিক্রির জন্য টাকা পরিশোধ করতে ভরসা পান না।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের কর্ণফুলী গরু বাজার, বিবিরহাট, সল্টগোলা রেলক্রসিং এলাকা, স্টিল মিলসহ নগরে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে ছয়টি কোরবানির পশুর হাটের অনুমোদন দিয়েছে প্রশাসন। করোনার কারণে এসব হাটে পশু বিক্রি নিয়ে শর্ত জুড়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বাংলাদেশের প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর কোরবানির জন্য দেশে এক কোটি ১৭ লক্ষ পশু ছিল। এর মধ্যে গরু ৪৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ৭১ লাখ।