
আবছার রাফি : কেউ হাতে বানানো নকশিকাঁথা, কেউ হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্র, কেউ খাঁটি মধু, কেউ ঘরোয়াভাবে তৈরি বাহারি পদের মুখরোচক খাবার, কেউ আবার নতুন কাপড়-চোপড়- এমনই শতাধিক পণ্য বিক্রি করে প্রায় চার শতাধিক নারী উদ্যোক্তা এখন সামাজিক-আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ নামে কক্সবাজারের একটি উদ্যোক্তা সংগঠনের মাধ্যমে। যেখানে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলছেন আট হাজারের বেশি নারী। সবারই আকাক্সক্ষা- আর্থিক অস্বচ্ছলতা দূর করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া, পিছিয়ে পড়া থেকে এগিয়ে দেওয়া-নেওয়ার দৃঢ়-প্রত্যয়।
যেখানে এমন কর্মদক্ষ-পরিশ্রমী নারীদের দেখাদেখি বেড়ে চলছে স্বাবলম্বী হওয়ার অভিপ্রায়, আছে এমন আত্মপ্রত্যয়ী-উদ্যমশীল নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা, বাড়ছে সংগঠনেরও বিস্তৃতি।
আজ থেকে প্রায় দুইবছর আগে নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির নিরন্তর প্রচেষ্টায় সংগঠনটি দাঁড় করান কক্সবাজারের বধূ শাহরিন জাহান ইফতা। ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত ২০ থেকে ৩০ জন নারী উদ্যোক্তার সমন্বয়ে পূজামেলা (১ থেকে ২০ অক্টোবর), নারীমেলা (১ থেকে ৮ মার্চ), বিজয়মেলা (২০ থেকে ২৯ ডিসেম্বর), ঈদুল ফিতর (১৪ এপ্রিল থেকে ১৩ মে), ঈদুল আজহা (২ থেকে ২০ জুলাই) মেলাসহ চার চারটি অনলাইন মেলার আয়োজনও করেন এই উদ্যোক্তা।
ভার্চুয়্যাল এই মেলায় ক্রেতা-বিক্রেতার সাড়াও ছিলো চোখে পড়ার মতো। চারটি মেলা মিলে প্রায় অর্ধকোটি টাকার পণ্যও বিক্রি হয়েছে এসব নারী উদ্যোক্তাদের। এছাড়া অফলাইনেও ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ ও ডিভা অর্গানাইজেশন’-এর যৌথ উদ্যোগে ২১ জন নারী উদ্যোক্তা নিয়ে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে তিন দিনব্যাপী বড় পরিসরে মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে ২১ জন উদ্যোক্তার ২১টি স্টলের প্রতিটি স্টলে ক্রেতা-বিক্রেতার সাড়া ও পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয় বিপুল।
শুধু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, নারীউন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গড়ে তুলেছেন ১০১ সদস্য বিশিষ্ট ‘রসনাবিলাস চ্যারিটি ফান্ড’। এই চ্যারিটি ফান্ডের সরকারি অনুমোদন নিতে হলে প্রয়োজন হয় ফান্ডের অধীনে স্থাবর সম্পত্তি দেখানোর; তাই নিজের স্বামীর দেওয়া দেন-মোহরানা বাবদ পাওয়া দুই গন্ডা (প্রায় চার শতক) জায়গাও দান করেন ফান্ডের নামে। যথারীতি পেয়ে যান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জয়েন স্টক থেকে সরকারি নিবন্ধনও। স্বপ্ন দেখেন, এই চ্যারিটি ফান্ডের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর।
কেস স্টাডি ১
বান্দরবানের মেয়ে উম্মে তাসমিয়া। সন্তানসন্ততি আর স্বামীকে নিয়ে আর্থিক টানাপোড়েনে কাটছিল তার সংসারজীবন। দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির ফলে আর্থিক টানাপোড়েনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। এমন এক মনস্তাপ-পীড়িত সময়ের মধ্যে একদিন রাত সাড়ে ১২টায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোন করেন শাহরিন জাহান ইফতার মুঠোফোনে। বলেন- আপু, আমার স্বামী তো কিছু করে না। আমার ঘরে ছোট ছোট চার সন্তান। তার ওপর ছোটবোন থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত, প্রতি মাসে নিয়মিত রক্ত দিতে হয় তাকে। যাপিত জীবনে আর্থিক টানাপোড়েনের লাগাম টানতে উম্মে তাসমিয়া পরামর্শ-সদুপদেশ চান শাহরিনের। বলেন, কিছু করতে চান তিনি। তবে কীভাবে কী করা যায়, কোন পথে এগোলে তার সংসারে কিছুটা হলেও মিলবে আর্থিক-মানসিক স্বস্তি।
উম্মে তাসমিয়া কোন কাজে পারদর্শী? উত্তরটা জেনে নেওয়ার পর- শাহরিন পরামর্শ দিলেন, খাঁটি মধু ও নকশিকাঁথা বুনতে। এই কাজে যে কোনো সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন শাহরিন। ব্যস, এতটুকুই। সেদিন রাত ১২টা পেরিয়ে সকাল হতে না হতেই শাহরিন জাহান ইফতা’র মুঠোফোনে চলে এলো ছোট বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা দু’দুটি নকশিকাঁথার আলোকোজ্জ্বল ছবি। নির্ঘুম রাতে একটানা শারীরিক খাটুনিতে নকশিকাঁথা দুটি তৈরি করেছিলেন উম্মে তাসমিয়া। উম্মে তাসমিয়ার এমন কর্মস্পৃহা-করিৎকর্মা মনোভাব দেখে মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েন শাহরিন। সেই উম্মে তাসমিয়া এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাটি পা পা করে ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’- সংগঠনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে করেছেন সমৃদ্ধ-স্বাবলম্বী। হয়ে উঠেছেন পরিবারের সদস্যদের মুখে আহার জোগানোর প্রধান ভরসাস্থল।
শাহরিনের সরাসরি সহযোগিতা-পরামর্শ-সহমর্মিতায় ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটানো উম্মে তাসমিয়া একদিন জানান দেন শাহরিনের প্রতি তার অতল-অগণন অনুরাগের কথা। সে অনুরাগবশত ‘রসনাবিলাস’ রেসিপি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে শাহরিন জাহান ইফতা’র জন্য নিয়ে আসেন ‘মাদার অব রসনাবিলাস’ কারুকার্যখচিত বড়সড় এক নকশিকাঁথা, যাকে বলে ‘টোকেন অব লাভ’।
এভাবে শাহরিন ও তার সংগঠনের যুথবদ্ধ সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া অনেক নারীর আর্থিক মন্দা দূর করে স্বাবলম্বিতা অর্জনের বহু গল্প আছে ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ সংগঠনের প্রাপ্তির ঝুলিতে। যা ওই সংগঠনের কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া নারীদের সফলতা-কর্মদক্ষতার মাঝেই ভেসে উঠে নানা সময়ে, নানা কার্যক্রমে।
কেস স্টাডি ২
কক্সবাজার সদরের মেয়ে রওনক আরা। কক্সবাজার রামু উপজেলার ‘এম ইসলাম জসিম উদ্দীন হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে’ চাকরি করতেন এ নারী। এই চাকরি ছেড়ে তিনি শাহরিন ও তার সংগঠনের অনুপ্রেরণা-পরামর্শে দীক্ষিত হন। সেই তিনিই এখন অন্যতম নারী উদ্যোক্তা। গত ৬ মাসে তিনি ২০ লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অন্যান্য নারী উদ্যোক্তাদের। সংগঠনটিতে এরকম অনেকেই আছেন যারা চাকরি পেয়ে নয়, বরং চাকরি ছেড়ে দিয়েই আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিজেদের আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলেছেন। ছুটে চলছেন নিত্যনতুন-সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে দিয়ে নিজেদের এগিয়ে নিতে।
কেস স্টাডি ৩
কক্সবাজারের আরেক নারী উদ্যোক্তা হেমা বড়ুয়া। ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ সংগঠনের যত মেলা; সব মেলাতেই বিক্রিবাট্টায় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা। সংগঠনের হয়ে যারা সরাসরি পণ্যবিক্রি বা অন্য কিছু নিয়ে কাজ করতে চান তাদের প্রতিজনকে সংগঠনের পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়। এবং সেই রেজিস্ট্রেশনের অনুকূলে প্রদান করা ‘রেজিস্ট্রেশন কোড’, যা ব্যবহার করে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন।
কেবল উম্মে তাসমিয়া, রওনক আরা কিংবা হেমা বড়–য়াই নন; কক্সবাজার সদরের ইয়ামিন আক্তার, চট্টগ্রাম শহরের নাসরিন সুলতানা অ্যানিসহ ৪৪৫ জন নারী উদ্যোক্তা অহর্নিশ কাজ করে জীবিকানির্বাহ করে চলছেন শাহরিনের এই উদ্যোক্তা সংগঠনের মাধ্যমে। শুধু শহুরে নারীরা নয়, প্রান্তিক পর্যায়ের নারীরাও যুক্ত হয়েছেন এই উদ্যোক্তা সংগঠনে; করছেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস বাজারজাত। যাদের দেখাদেখি প্রসারিত হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের কর্মজগৎ, বাড়ছে তাদের কর্ম-ইচ্ছা।
‘রসনাবিলাস চ্যারিটি ফান্ড’ গঠনের নেপথ্যের গল্প বলতে গিয়ে নারী উদ্যোক্তা শাহরিন জাহান ইফতা বলেন, ‘২০১৯ সালে দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন কক্সবাজারে বাসিন্দা মো. সায়ান চৌধুরী (১০)। টাকার অভাবে অল্পবয়সী সায়ান চৌধুরীর চিকিৎসা থেমে গেছে দেখে তার জন্য কিছু করতে মন চাইলো। তাই নিজে উদ্যোগ নিয়ে ফেসবুকে ‘রসনাবিলাস’ প্রাইভেট গ্রুপের লাইভে সায়ান চৌধুরীর চিকিৎসার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। তাৎক্ষণিক সাড়া মেলে গ্রুপ সদস্যদের। একে একে সবার সহযোগিতায় মাত্র ৪ দিনে আড়াই লক্ষ টাকা জমা করি। তারপর সায়ানের বাবা-মায়ের হাতে এই টাকা তুলে দিই।’
‘সায়ানের বাবা-মায়ের হাতে টাকা তুলে দিতে পেরে জীবনে এই প্রথম এক অন্যরকম পুলক অনুভব করলাম, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। সেই অর্থ এবং কক্সবাজারের অন্যান্য সহৃদয়বান মানুষের অর্থ-সহায়তার মধ্য দিয়ে সায়ানের ‘বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট’ সফলভাবে সম্পন্ন হলেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সেই সায়ান চৌধুরীকে শেষমেশ আর বাঁচানো যায়নি। তারপর ভেবেছি, মানুষ যখন আমার উপর আস্থা-বিশ্বাস রাখছে তাহলে সবার সহযোগিতায় একটা চ্যারিটি ফান্ড করা যায় কিনা, যেটা দিয়ে সমাজের জন্য কিছু করা যাবে। সায়ানের এই ঘটনার পর থেকেই মূলত আমি ‘রসনাবিলাস চ্যারিটি ফান্ড’ গঠনে উদ্যোগী হই।’- বলেন শাহরিন জাহান ইফতা।
ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের মা শাহরিন জাহান ইফতার স্বামী প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সেভ দ্যা ন্যাচারের’ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আ. ন. ম. মোয়াজ্জেম হোসেন। দম্পতির তিন সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান মেহরাব হোসেন আহিল। মাত্র ৩৮ দিন বয়সী মেহেরাবের অকালমৃত্যুতে বিমর্ষতায় ভরে যায় তাদের দাম্পত্যজীবন। দিনের পর দিন মা শাহরিনের মর্মভেদী কান্নায় ভারী হয়ে উঠে আশপাশের পরিবেশ। ঘরে-বাইরে ছেলের অকালমৃত্যুর ধকল কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন মা শাহরিন জাহান ইফতা। স্ত্রীর এমন হৃদয়ভেদ্য দৃশ্য অবলোকনের পর স্বামী আ. ন. ম. মোয়াজ্জেম হোসেনের অনুশাসন- তুমি এমন কিছু করো, যাতে সংস্রবশূন্যতা, বিষাদগ্রস্থতা কাটিয়ে উঠা যায়।
তখন শাহরিন ভাবলেন, তার রান্না-বান্না করার হাতটা নিতান্তই খারাপ না। সুতরাং ঘরকেন্দ্রিক মানসম্মত রান্না বানিয়ে অনলাইন-অফলাইনে কাজ করা যায়। নিজেকে ভালো রাখার জন্য এক পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন সোশ্যাল ওয়ার্ক (সমাজসেবা) করার। মূলত স্বামী মোয়াজ্জেম রিয়াদের উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়েই অনলাইনে কিছু করার স্বপ্নে বিভোর হন তিনি।
শুরুটা হয় ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই ‘রসনাবিলাস’ ফেসবুক প্রাইভেট গ্রুপ তৈরি করার মধ্যে দিয়ে। গ্রুপ তৈরির পর শাহরিন লক্ষ্য করলেন, শুধু কক্সবাজারের না, কক্সবাজারের বাইরের অনেক নারীর সমর্থন-প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। গ্রুপ কার্যক্রম ভালো লেগে যায় কক্সবাজারে থাকা অন্যান্য নারীদেরও। দেখাদেখি সাহস করে এগিয়ে আসেন অনেকে নারী। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে গ্রুপের পরিসর, বেচাকেনা বা নানাজনকে নানা পরামর্শ দিয়ে শাহরিন জাহান ইফতা হয়ে ওঠেন গ্রুপ সসদ্যদের আস্থা-নির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। শাহরিন জাহান ইফতার এই কার্যক্রমে অভিভূত-অনুপ্রাণিত হয়ে সেই গ্রুপে বর্তমানে যুক্ত আছেন ৮ হাজারেরও বেশি নারী।
একদিকে রাঁধুনিদের রন্ধনশিল্পের প্রতি উৎসাহ প্রদানের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে উদ্যোক্তা হতে ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’- এর মতো কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ; উভয়ের যুগপৎ যাত্রায় নারী উাদ্যোক্তা বৃদ্ধিতে বড় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন বলে বিশ্বাস উদ্যোক্তা শাহরিন জাহান ইফতার। যারা ‘রসনাবিলাস’ গ্রুপে কাজ করে তাদের অধিকাংশই এখন ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ এ যুক্ত হয়ে নিজের এবং অপরাপর নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ মসৃণ-সুগম করে তুলছেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে কাজের মধ্য দিয়ে।
এরইমধ্যে ‘রসনাবিলাস ও ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ প্লাটফর্মে শাহরিন জাহান ইফতার এসব কর্মকা- বাংলাদেশ পেরিয়ে ভারতেও জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেছে। ক্রমান্বয়ে কোলকাতা, হায়দারাবাদ, বোম্বে মহারাষ্ট্রসহ একাধিক শহরের রন্ধনশিল্পী-ভোজনরসিকদের প্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন শাহরিন জাহান ইফতা। এভাবে মেধা আর সৎ-সাহসকে পুঁজি করে দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশিদের কাছে পৌঁছে যাওয়া এই নারী উদ্যোক্তার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে উল্লিখিত শহরের জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পীদের সাথে।
চলছে করোনাভাইরাসের উপর্যুপরি সংক্রমণ। করোনামুক্ত সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের বদলে মানুষ হয়ে উঠেছে নিরাসক্ত-একাকিত্ব জীবনের দাস। তাই ঘরে বসে থাকার নিরাসক্ত-একাকিত্ব গোছাতে স্বামীর পরামর্শে উদ্যোগ নিলেন সম্ভাবনাময় রন্ধনশিল্পের জগতে বর্তমান-ভবিষৎ প্রজন্মের হাতেখড়ি হওয়ার মতো একগুচ্ছ রেসিপি সম্বলিত তথ্যসমৃদ্ধ রেসিপি বই প্রকাশনার। তারপর এপার-ওপার দুই বাংলার রাঁধুনিদের নিয়ে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘রসনাবিলাস’ নামক সমৃদ্ধ গ্রন্থ। যে গ্রন্থে ঠাঁই হয়েছে দুই দেশেরই দারুণ দারুণ সব রান্নার রেসিপি। অর্থাৎ অর্ধেক এপারের রেসিপি, বাকি অর্ধেক রেসিপি ওপারের।
এরই মধ্যে গত ১৯ ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার হোটেল শৈবালে বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ‘রসনাবিলাসের’ পক্ষ হতে ইসমত আরাকে ‘বর্ষসেরা রাঁধুনি-২০২০’ ও ‘গ্লোরিয়ার্স উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অব বাংলাদেশ’ এর পক্ষ হতে হেমা বড়ুয়া এবং রওনক আরাকে ‘বর্ষসেরা নারী উদ্যোক্তা-২০২০’ ঘোষণা করে তাদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন অনুষ্ঠানে আগত প্রধান অতিথি কক্সবাজার-৮ সংরক্ষিত আসনের সাংসদ কানিজ ফাতেমা আহমেদ ও বিশিষ্ট রন্ধনবিদ শাহনাজ ইসলাম ও জনপ্রিয় পেস্ট্রি শেফ সুলতানা কবীর।
বইতে আধুনিক দুনিয়ার রন্ধনশিল্পের গুরুত্ব-চাহিদা নিয়ে সময়োপযোগী, মূল্যবান লেখা পাঠিয়েছেন কোলকাতা বালিগঞ্জ থেকে জি বাংলার জনপ্রিয় ‘রান্নাঘর’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা সুদীপা চ্যাটার্জী, কোলকাতা কুকরকুক ক্লাউড কিচেনের কর্ণধার উজ্জয়িনী ঘোষ, কোলকাতা ‘ফুড প্রোডাকশন ফ্যাকাল্টি ইন সুভাষ বোস ইনস্টিটিউড অব হোটেল ম্যানেজমেন্ট’-এর শেফ রাপ্তি চ্যাটার্জি, গুজরাটের ‘দ্য ফার্ন সাউভা রিসোটের’ জনপ্রিয় শেফ দীপঙ্কর দাস, কোলকাতার ফুড প্রোডাকশন ইন ফ্যাকাল্টি ইন ডলফিন স্কুল অ্যান্ড হোটেল এবং ওনার অব কিচেন আর্ট ফুড ডিজাইন কোম্পানির শেফ শুভেন্দু।
এছাড়া দেশের সুপরিচিত রন্ধনবিদ-রন্ধনশিল্পীদের মধ্য থেকে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব মাস্টার শেফের সদস্য-কাউলিনারি কিউরেটর শাহেদা ইয়াসমিন, এসিই হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের ট্রেইনার ও রন্ধনবিদ শাহনাজ ইসলাম, দেশের অন্যতম পেস্ট্রি শেফ ও উদ্যোক্তা এবং রেসিপি প্রোভাইডার সুলতানা কবীর ও রসনাবিলাস ট্রাস্টি বোর্ডের ফাউন্ডার ও ভাইস চেয়ারম্যান, প্রবীণ রন্ধনশিল্পী হুরাইন জান্নাতসহ দেশের রন্ধনশিল্পে নামকুড়ানো একঝাঁক বিশিষ্ট রন্ধনশিল্পী-রন্ধনবিদ।
‘রসনাবিলাস’ বইটির সম্পাদনা-প্রকাশকে জীবনের অন্যতম সাফল্য উল্লেখ করে এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘বইটি প্রকাশনায় অনেকে সহযোগিতা করেছেন। সহযোগিতা করেছেন রসনাবিলাস গ্রুপের অন্যান্য নারী উদ্যোক্তারাও। ওপার বাংলা কলকাতা থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন রসনাবিলাসের কোলকাতা প্রতিনিধি মধুশ্রী মিত্র। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বিশেষভাবে রসনাবিলাসের ট্রাস্টি বোর্ডের ফাউন্ডার ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীণ রন্ধনশিল্পী হুরাইন জান্নাতের সহযোগিতা-ভালোবাসাটাই ছিল অন্যতম। বই প্রকাশের পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই রেসিপি বই বিক্রি বাবদ যত লভ্যাংশ পাওয়া যাবে তার সবই ‘রসনাবিলাস’ চ্যারিটি ফান্ডে জমা করবো। এবং সেই অর্থ দিয়ে নারী উন্নয়নে-জাগরণে কাজ করে যাব।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে গত দুই মাস আগে শুরু হওয়া শাহরিন জাহান ইফতার ‘শাহরিন কুইজিন অ্যান্ড বেইক’ নামে অনলাইনে ‘হোম মেইড’ খাবার বিক্রির ব্যবসাটি। মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা ও বিশ্বস্থতায় ‘শাহরিন কুইজিন অ্যান্ড বেইক’ হয়ে উঠেছে নেটদুনিয়ায় আয়-উপার্জনে শাহরিনের অনন্য প্লাটফর্ম। যেখানে শাহরিনের নিজ হাতে তৈরি মানসম্মত-হাইজেনিক সুস্বাদু খাবারের স্বাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছেন না এমন কারও রিভিউ-পর্যবেক্ষণ সচরাচর চোখে পড়ছে না। শুধু কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশেই শাহরিনের এই খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে। প্রতিদিন বিক্রিও হচ্ছে সমানতালে। গ্রাহক সন্তুষ্টি আর আস্থায় ‘শাহরিন কুইজিন অ্যান্ড বেইক’ হয়ে উঠেছে ভোজনরসিক-ভোজনবিলাসী মানুষের অনত্যম পছন্দের ঠিকানা।
খাবার সম্পর্কিত কী নেই শাহরিনের এই ‘শাহরিন কুইজিন অ্যান্ড বেইকে’?- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার। শাহরিনের হাতযশের এই সৃষ্টিতে যেমন রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা পদের খাবার, তেমনি আছে বিদেশি খাবারের আয়োজন। আছে একেবারে শাহরিনের চিন্তাপ্রসূত উদ্ভাবিত নানা পদের খাবার-দাবার।
কক্সবাজারের বধূ শাহরিন জাহান ইফতা চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নের ধোরালা গ্রামের প্রয়াত মোহাম্মদ শাহজাহানের মেয়ে। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা অকালেই প্রাণ হারান। তখন শাহরিনের বয়স ৯ কি ১০। এরপর পরিবার ও সন্তানদের হাল ধরতে উদ্যোক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মা শিরিন জাহান।
জানতে চাইলে নারী উদ্যোক্তা শাহরিন জাহান ইফতা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেন আমার মা। কাজেই মায়ের যে সংগ্রামী জীবনাদর্শ তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। মায়ের সেই ত্যাগ-সংগ্রামই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেঁথে যায় আমার মনে-প্রাণে। মনে মনে বলি, আমার মা যদি এত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করতে পারে তাহলে আমি কেন পারবো না। স্বামী ও শ্বশুর মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক এস এম নুরুন্নবীসহ পুরো শ্বশুরবাড়ির লোকজন থেকে পাওয়া সাহস-অনুপ্রেরণা আমাকে আজকের এই অবস্থানে আসতে সাহায্য করেছে। আমার যে কোনো কাজে সর্বপ্রথম আমার স্বামীর সহযোগিতাই অতুলনীয়-অকল্পনীয়। তিনি না হলে আমার এতদূর আসা একেবারে অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার।’
সংগঠনের মধ্য দিয়ে কারও অভাব দূর হচ্ছে, কেউ আবার অতীতের তুলনায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখে আছেন। বিশেষত করোনাকালীন যখন পুরুষরা কর্মহীন হয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়ছেন ঠিক সেই সময়ে নারীরা হয়ে উঠছেন স্বাবলম্বী। পরিণত হচ্ছেন পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তিতে।’- এমন সব খবরে রীতিমতো এক অদৃশ্য সুখ-তৃপ্তিতে মন ভরে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকবো, অসহায়, গরীব-দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। ভালো কাজের মাঝেই আমার সুখ, আমার স্বপ্ন।’