শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জাল পাসপোর্ট যখন হুন্ডি ব্যবসার হাতিয়ার

| প্রকাশিতঃ ২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১০:৪২ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ রফিক : নাছির উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন। দুইজনই সহোদর ও দুবাই প্রবাসী। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া গ্রামে তাদের বাড়ি। বাবার নাম মৃত এজাহার মিয়া। প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার না হওয়া এ দুই সহোদর এখন বিপুল সম্পদের মালিক। আছে জমিজমা, ফ্ল্যাট-বাড়ি, মার্কেটসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই ভাইয়ের এত সম্পদ অর্জনের পেছনে কারণ- অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা। এই হন্ডি ব্যবসা নির্বিঘ্ন করতে পাসপোর্ট নিতে জালিয়াতির আশ্রয়ও নিয়েছেন এক ভাই, নাছির উদ্দিন। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে গত ২৭ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন মহিউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। এছাড়া একই বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ বিভাগও অনুসন্ধান করছে।

পুলিশ ও দুদক সূত্র জানায়, নাছির উদ্দিন বড়ভাই জসিমের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। একটি পাসপোর্ট পেতে একজন আবেদনকারীকে যেখানে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সেখানে নাছির যেন একাই একশ। নিজের ছবি দিয়ে নতুন নাম আর ভিন্ন ঠিকানায় একটি বা দুটি নয়, চারটি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন নাছির উদ্দিন। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে আরব আমিরাত যান তিনি। এর বছর দুয়েক আগে দুবাই যান তার বড়ভাই জসিম উদ্দিন। নাছির উদ্দিন বর্তমানে ‘রিপন’ নামে একটি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। জাল এই পাসপোর্ট দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত করেছেন নাছির।

পুলিশ সূত্র জানায়, দুজনের হুন্ডির টাকা লেনদেনের ৩৫টি ‘বই’ এসেছে পুলিশের হাতে। এতে ২০০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ ও দুদক। নাছির উদ্দিন ২০১০ সালে অক্টোবর মাসে ২৭ দিনেই হুন্ডির ৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করেছেন। এর আগে ২০০৮ সালের জুন মাসে তার বড়ভাই লেনদেন করেছেন ৩ কোটি টাকার বেশি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মাসুম হাসান বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তার কার্যালয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এক ব্যক্তির নামে হাতে লেখা একাধিক পাসপোর্ট থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে নাম-ঠিকানা অভিন্ন থাকতে হবে। নাছির উদ্দিন এখন ‘রিপন’ নামে এমআরপি পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের একজন কর্মকর্তা জানান, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) বা যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্টও জাল হচ্ছে। এক নামে একাধিক পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে। এসব জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে নানা অপরাধ, ইয়াবা ও হুন্ডির ব্যবসা চলছে। কিছুদিন আগে পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এ ধরনের ঘটনা ধরাও পড়েছে। আঙ্গুলের ছাপ নকল করে এসব পাসপোর্ট জাল করা হচ্ছে।

এদিকে একই ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন নাম-ঠিকানায় একাধিক পাসপোর্ট সংগ্রহ করা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক আবু সৈয়দ বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আবেদন ফরমে পূর্বের কোন পাসপোর্ট ছিল কিনা, তা উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু তা উল্লেখ না করে আবেদনকারীর একাধিক পাসপোর্ট সংগ্রহ করা অপরাধ। আর নাছির উদ্দিন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রিপন নাম দিয়ে এমআরপি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এ সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, একই ছবি ব্যবহার করে ভিন্ন ঠিকানা, জন্মতারিখ এবং মা-বাবার নাম পাল্টে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চারটি পাসপোর্ট বানিয়েছেন নাছির উদ্দিন। জানা গেছে, তার নামে প্রথম পাসপোর্ট ইস্যু হয় ১৯৯৯ সালের ২২ এপ্রিল। সেটি ইস্যু করেন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সোহরাব উদ্দিন খান। ওই পাসপোর্টের নম্বর-ও-০৪৪৯১২৯। এতে বাবার নাম লেখা আছে মৃত এজাহার মিয়া। জন্ম তারিখ ১৯৭৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। পেশা-প্রাইভেট সর্ভিস। ঠিকানা- গ্রাম ও ডাকঘর- হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া। থানা-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। এ পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৪ সালের ২১ এপ্রিল।

তথ্য অনুয়ায়ী, ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে ড্রাইভিং কাজের রেসিডেন্ট ভিসা (নম্বর-৬০১/২০০০/২০০৫৬৭৬) নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমা শহরে যান নাছির উদ্দিন। দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস থেকে এ পাসপোর্ট নবায়ন হয় (৯৩৩৫/০৫) তারিখ-২০০৫ সালের ৩০ জুলাই। পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত। এতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভাইস কনসাল জেনারেল মো. তারিকুল ইসলাম।

কিন্তু এই পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হতে না হতে নাছির উদ্দিন দেশে ফিরে ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে নতুন করে আরেকটি পাসপোর্ট (নম্বর-বি-১৭১১৮২৭) বানিয়ে নেন। বাবার নাম ঠিক রেখে পাসপোর্ট ইস্যু করান ‘মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন’ নামে। মায়ের নাম লিখেছেন- জোহরা খাতুন। আগের পাসপোর্টে (নম্বর-ও-০৪৪৯১২৯) নিজের জন্ম তারিখ ১৯৭৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ করলেও দ্বিতীয় পাসপোর্টে তার জন্ম তারিখ ৫ জানুয়ারি, ১৯৭৯। এ পাসপোর্টের (দ্বিতীয়টি) মেয়াদ শেষ হয় ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল। পেশা-প্রাইভেট সার্ভিস। ঠিকানা- ডাকঘর ও গ্রাম-নাঙ্গলমোড়া, থানা-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

এবার দ্বিতীয় পাসপোর্ট হাতে রেখেই ২০০৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে তৃতীয় দফায় আরেকটি পাসপোর্ট (নম্বর-সি-১৫২৩৩৭৬) বানিয়ে নেন নাছির উদ্দিন। এ পাসপোর্ট ইস্যু করেন তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক মো. আনসার আলী মোল্লা। তবে এবারের পাসপোর্টে বাবা, মায়ের নাম, জন্ম তারিখ ও ঠিকানা পাল্টে ফেলেন নাছির। পাসপোর্ট বাহকের নাম লেখেছেন- মোহাম্মদ সোহেল। বাবা-আবুল কালাম। মাতা-হোনারা বেগম। জন্ম তারিখ দিয়েছেন ১৯৮১ সালের ৩ মে। এ পাসপোর্টের (তৃতীয়টি) মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ঠিকানা দিয়েছেন হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দ্দন ইউনিয়নের।

তবে বর্তমানে এই তিনটি পাসপোর্টের কোনটিই এখন ব্যবহার করেন না নাছির। এখন ‘রিপন’ নামে আরেকটি পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন তিনি। আর এ পাসপোর্ট ব্যবহার করেই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন নাছির উদ্দিন। এদিকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (১৫১৩৭৭৭১৭৮৭১১) অনুয়ায়ী তার নাম মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। বাবা-মৃত এজাহার মিয়া। মাতা-জোহরা খাতুন, আমান গোমতার বাড়ি, নাঙ্গলমোড়া, হাটহাজারী।

এদিকে হুন্ডির মাধ্যমে দুই ভাইয়ের লেনদেনের প্রায় ৩৫টি হিসাবের ‘বই’ পুলিশের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে। পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে দুই ভাইয়ের হুন্ডি ব্যবসার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুল ইসলাম। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে এখন কিছু বলা সমীচীন হবে না।’

নাছির উদ্দিনের হুন্ডির লেনদেনের ‘বই’ নম্বর ১ এর প্রথমাংশ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১০ সালের অক্টোবরের ৩ তারিখ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৫ টাকা। যার মধ্যে ৩ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত লেনদেন করা হয় ৯৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৬৫ টাকা, ১১ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা, ২১ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১ কোটি ২১ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকা।

জসিম উদ্দিনের হিসাবে দেখা যায়, ২০০৮ সালের জুন মাসেই ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকার অবৈধ লেনদেন করেছেন। ১ জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন করেছেন ৯৫ লাখ ৬২ হাজার ৯০০ টাকা। ১১ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন করেছেন ১ কোটি ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা। একইভাবে ২১ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬০০ টাকা।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে নাছির উদ্দিনের ব্যক্তিগত মোবাইলে কল করলে রিমা নামে এক নারী রিসিভ করেন। সাংবাদিক পরিচয় দিলে প্রথমে তিনি বলেন, ‘তিনি (নাছির) তো বাসায় নেই।’ এরপর বলেন, ‘আপনি ভুল নম্বরে কল করেছেন।’