বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

মামলার ভারে ন্যুব্জ আদালত, মূল সমস্যা কোথায়?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ


শরীফুল রুকন : গত বছর দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ৩২ লাখ। করোনা পরিস্থিতির কারণে মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে কম। বর্তমানে প্রায় ৩৮ লাখ মামলারজটে ভারাক্রান্ত দেশের বিচার বিভাগ। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ মামলা চট্টগ্রামের আদালতগুলোতে ঝুলে আছে। বিচার কার্যক্রম এভাবে ঝুলে থাকায় কারাগারে বন্দি এখন ধারণ ক্ষমতার চারগুণ।

যদিও এ অবস্থা একদিনে বা এক বছরে হয়নি। বহু বছরের সমস্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের নিম্ন আদালতে ১ হাজার ৮০০ জনের মতো বিচারক রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রেষণে আছেন। মামলাজটের জন্য প্রধানত বিচারক সংকটকে দায়ী করা হয়।

চট্টগ্রামেও মামলা জটের প্রধান কারণ বিচারকগণের অপ্রতুলতা। চট্টগ্রামে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে বিচারকের পদ রয়েছে ৮টি। এর মধ্যে তিনটি আদালতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারক নেই। তিন আদালতে বিচারক না থাকার ফলে বর্তমানে আটটি আদালতে থাকা ৫০ হাজার মামলার দায়িত্ব পড়েছে মাত্র ৫ জন মুখ্য মহানগর হাকিমের উপর। সে হিসেবে প্রতি একজনের দায়িত্বে ১০ হাজার মামলা।

চট্টগ্রামের জজশিপের ১৪টি আদালতে দীর্ঘদিন বিচারকের পদ শূন্য। চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত দীর্ঘ ৩২ মাস ধরে বিচারক শূন্য। এ কারণে থেমে আছে বিচারাধীন এক হাজারের বেশি মামলার কার্যক্রম। বৃহত্তর চট্টগ্রামের দুর্নীতি সংক্রান্ত সব মামলার বিচারিক কার্যক্রম হয় এই আদালতে। দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর উপপরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন বলেন, ‘দুর্নীতির অনেক ঘটনা উদঘাটন করে আমরা মামলা করছি। কিন্তু বিচারক না থাকায় মামলার কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে।’

এদিকে চট্টগ্রামে মামলাজটের কারণ অনুসন্ধানে নেমে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা গেছে। দেওয়ানি আদালতগুলোতে দেখা গেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিলম্বিত হচ্ছে মামলার সমন ও নোটিশ জারিতে অস্বাভাবিক সময় ব্যয়ের জন্য। কিছু ক্ষেত্রে শুধু এই কারণেই কয়েক বছরের দীর্ঘসূত্রিতার সূত্রপাত ঘটে। তাছাড়া কিছু ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ সমনে বিবাদীর ভুল নাম কিংবা ভুল ঠিকানা প্রদান করে, ফলে ক্রটিপূর্ণ ওই সমন জারি সম্ভব হয় না। যার ফলে মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। দ্রুত সমন জারির জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলও নেই।

সমন বা নোটিশ জারিতে অস্বাভাবিক বিলম্বের স্বাভাবিক প্রবণতার পাশাপাশি ভিন্ন জেলার সমন ও নোটিশ জারিতে অপেক্ষাকৃত আরও বিলম্ব হয়। দেখা যাচ্ছে, বিবাদী ভিন্ন জেলার বাসিন্দা হলে ভিন্ন জেলায় বসবাসরত বিবাদীর ঠিকানায় সমন বা নোটিশ জারি করতে কিছু ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যায়।

সমন বা নোটিশ জারিতে অস্বাভাবিক বিলম্বের পরেই মামলার পরবর্তী পর্যায় বা জবাব দাখিলে বিবাদীর বিলম্বের বিষয়টি উঠে আসে। অনেক সময়ই মামলার বিবাদী লিখিত জবাব দাখিলের জন্য বারবার সময় নেয়ার মাধ্যমে মামলার দীর্ঘসূত্রিতায় ভূমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে বিবাদীপক্ষের সময়ের আবেদন অগ্রাহ্য করে মামলা একতরফা বিচারের জন্য ধার্য্য করলে ছানি মামলার কারণে মামলা আরো বেশি বিলম্বিত হয়।

মামলা দায়েরের পরে বাদীপক্ষ কর্তৃক বারবার আরজি সংশোধন মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। অনেক সময়েই বাদীপক্ষ মামলার প্রয়োজনীয় সকল দলিলাদি ছাড়া মামলা দায়ের করে। অনেক সময় তাড়াহুড়া বা জরুরি প্রয়োজনেও মামলা দাখিল করতে হয়। ফলে বাদীপক্ষকে পরবর্তীতে আরজি সংশোধনের দরখাস্ত দিতে হয়। আবার এ ধরনের দরখাস্ত বারবার দাখিল ও মঞ্জুর হলে অনেকক্ষেত্রে বিবাদীপক্ষকে অতিরিক্ত জবাব দাখিলের সুযোগ দিতে হয় আদালতকে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে থাকে। এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে যখন মামলার বাদীপক্ষ বিচার স্তরে (কখনো কখনো সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে) এ ধরণের দরখাস্ত করলে।

এছাড়া মামলা চলাকালীন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন দেয়া আদেশ অনেক ক্ষেত্রেই মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন আদালতে মামলার বিচার চলাকালে ‘ডিসকভারি, ইন্সপেকশন, ইনজাংশন’ এর দরখাস্ত করা, এডভোকেট কমিশনের নিয়োগে বিলম্ব, বারবার কমিশনের দরখাস্ত করা ও কমিশনার নিয়োগ, কমিশন রিপোর্ট দাখিলে অস্বাভাবিক বিলম্ব এবং প্রায়ই রিপোর্টের উপর আপত্তিপ্রদান করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এ ধরণের দরখাস্তগুলোর উপর আদেশ প্রদান করা হলে তার বিরুদ্ধে রিভিশন দাখিল করা হয় এবং ক্ষেত্র বিশেষ উক্ত রিভিশনগুলো নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর পার হয়, ফলে সামগ্রিকভাবে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়।

চট্টগ্রামের দেওয়ানি আদালতগুলোর মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা বাদীপক্ষের আইনজীবীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা বা অহেতুক সময়ক্ষেপনের কারণে বিলম্বিত হয়। তাছাড়া বন্টন প্রার্থনায় করা মামলায় বিবাদীপক্ষের মৃত্য্যুজনিত কারণে ওয়ারিশদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহ ও প্রসেস জারি করার ব্যাপারে বাদীপক্ষ কর্তৃক অহেতুক সময় নেয়ার কারণে উক্ত মামলাসমূহের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।

অন্যদিকে অনেক নাবালকের কোর্ট গার্ডিয়ান নিয়োগে দেরি হওয়ার কারণে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। কোন কোন মামলায় দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মামলাসমূহে কোর্ট গার্ডিয়ান নিয়োগে ক্ষেত্রবিশেষ তিন বছর সময় পার হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন শ্রেণীর দেওয়ানি মামলা কিংবা দেওয়ানি আপীল উভয় মামলার ক্ষেত্রেই নানা প্রয়োজনে অনেক সময় উচ্চ আদালত কর্তৃক মামলার নথি তলব হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও নথিগুলো নিয়মিত আদালতে ফেরত আসে না। এভাবে যথাসময়ে মামলার নথি বিচারিক আদালতে ফেরত না আসার কারণে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়।

বিভিন্ন আদালতের দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই নিম্ন আদালতের কোন আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিভিশন দাখিল করা হলে এবং উক্ত রিভিশন মামলায় মূল মামলার বিপরীতে কোন স্থাগিতাদেশ প্রদান না করার পরও রিভিশন মামলার সিদ্ধান্ত মূল মামলার গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবান্বিত করতে পারে- এরূপ আশংকায় অনেকক্ষেত্রেই নিম্ন আদালতের বিচারকগণ সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারকার্য সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন।

একইভাবে রিভিশন মামলায় উচ্চ আদালত কর্তৃক মূল মামলার বিচারকার্যে স্থগিতাদেশ প্রদানের মাধ্যমেও অনেক সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। বিষয়টি বিভিন্ন মামলার বিবরণীতে উঠে আসে। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বিচারক নিয়োজিত থাকায় মামলাসমূহের নিষ্পত্তিতে অধিকতর সময় প্রয়োজন হয়। তাছাড়া দেওয়ানি আদাতলগুলো বিধি মোতাবেক একই দিনে পাঁচটির বেশী মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য রাখতে পারে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে থমকে থাকছে।

একটি দেওয়ানি মামলা দায়েরের পর থেকেই উক্ত মামলার দীর্ঘসূত্রিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক সময় একতরফা কিংবা আংশিক দোতরফা সূত্রে একটি মামলা নিষ্পত্তি হলে অনেকক্ষেত্রেই উক্ত মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ছানি মোকদ্দমা দায়ের হয় এবং এতে মূল মামলা দীর্ঘসূত্রিতার নতুন মাত্রা পায়। ফলে প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি হবার পরেও একটি মামলা বছরের পর বছর ছানি মামলা আকারে আদালতে বিচারাধীন থাকে এবং উক্ত ছানি মঞ্জুর হলে মূল মামলাটি নতুন করে আরম্ভ হয়। অনেকক্ষেত্রেই সামগ্রিক প্রক্রিয়া কোন একটি মামলাকে কয়েক বছরের অন্য থমকে দেয়। আবার বিবাদীপক্ষও একজন একজন করে ছানি মামলা করে ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা দীর্ঘায়িত করে। এ ধরণের অসংখ্য মামলা হচ্ছে।

দেওয়ানী কার্যবিধিতে পুনঃবিচারের জন্য প্রেরণের মাধ্যমে আপীল নিষ্পত্তির কিছু পূর্বশর্ত উল্লেখ করা রয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যে, আপীল আদালতগুলোর পক্ষে কোন একটি আপীল নিষ্পত্তি করা সম্ভব হওয়ার পরও উপযুক্ত কারণ ছাড়া উক্ত মামলা নিম্ন আদালতে পুনরায় বিচারের জন্য প্রেরণ করা হয়। এ কারণে দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ঘটে। আবার কখনো দেখা যায়, পুনরায় বিচারের জন্য মামলা প্রেরণ করার পরে অনেকসময়ই মামলার পক্ষসমূহ সংশ্লিষ্ট আদেশের নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অহেতুক সময়ক্ষেপন করে, যার ফলে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়।

আদালতে বিচারাধীন পারিবারিক মামলাগুলোতে আপোষের অজুহাতে বারবার সময় নেয়ার কারণে অনেকক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। এছাড়া পারিবারিক জারি মামলাতে লেভী ওয়ারেন্ট ঠিকমত জারি না হওয়ার কারণে পারিবারিক জারি মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার জন্য আইনজীবী কর্তৃক সাক্ষ্য উপস্থাপনে অনীহার বিষয়টি দেখা গেছে।

দেওয়ানী কার্যবিধি অনুসারে অনেক সময় মামলার যে কোন পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত অপর কোন আদালতের নথি কিংবা রেজিষ্ট্রি অফিসের ভলিউম তলব করে থাকে। এক্ষেত্রে প্রায়শই তলবকৃত নথি কিংবা ভলিউম আদালতে পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটে, এতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়। দেওয়ানি মামলাগুলোর বেশিরভাগ দায়ের হয়ে থাকে সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে। এসব আদালতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্টেনোটাইপিস্ট ও কম্পিউটার না থাকায় বিচারকগণের দক্ষতা হ্রাস পায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়েরের সময় সংশ্লিষ্ট বিচারকগণ বাদীপক্ষের আর্জি পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে উক্ত আর্জির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করলে অথবা শুনানি করে প্রয়োজনীয় আদেশ দিলে দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব।

এদিকে ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে নেমে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই মামলার তদন্তে অত্যাধিক সময়ক্ষেপণ, দুর্বল তদন্ত, বিচারস্তরে মামলা প্রমাণে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে প্রায়শই পুলিশের ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ফৌজদারি মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র বিলম্বিত হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই আসামি খালাস পায়। তাছাড়া, যে সকল মামলায় আসামি দোষী সাব্যস্ত হয়, সেরকম অনেক ক্ষেত্রেও দুর্বল সাক্ষ্যের কারণে আপীল আদালতে তারা খালাস পায়।

চট্টগ্রামের দায়রা আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে ফৌজদারী মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। দেখা গেছে, বিভিন্ন আইন নির্দিষ্ট মেয়াদে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলাগুলোর তদন্তের জন্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেকক্ষেত্রেই তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে মামলার তদন্তে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক সময়ই এই অতিরিক্ত সময়ক্ষেপনে মামলার সাক্ষ্য, তথ্য-উপাত্ত বিনষ্ট হয়। ফলে অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও দুর্বল সাক্ষ্য প্রমাণের কারণে আসামি খালাস পায়, ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং সার্বিকভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বারবার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়, ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতার মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং এই সুযোগ আসামিপক্ষ গ্রহণ করে খালাস পায়।

এছাড়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে অনেকসময়ই অভিযোগকারীর পক্ষে নারাজী দরখাস্ত করা হয়। কিন্তু উক্ত দরখাস্ত শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে উদাসীনতার কারণে দীর্ঘসময় ধরে উক্ত দরখাস্ত অনিষ্পত্তিকৃত অবস্থায় পড়ে থাকে এবং এতে সামগ্রিকভাবে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যথাযথ সাক্ষী উপস্থাপন ও সাক্ষ্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আদালতগুলোতে ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার প্রধান কারণ সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা। এর মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তার অনুপস্থিতির হার সর্বাধিক। এর পরেই রয়েছে ফৌজদারি মামলায় জব্দকৃত আলামত প্রদর্শন করার জন্য অত্যাবশ্যক জব্দ তালিকার সাক্ষীদের অনুপস্থিতি ও মেডিকেল অফিসারের অনুপস্থিতি। তাছাড়া কখনো কখনো অভিযোগের সমর্থনে অভিযোগকারীর সাক্ষ্য প্রদান করতে না আসার কারণেও ফৌজদারি মামলাসমূহ বিলম্বিত হয়। বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে যত সময়ক্ষেপণ হতে থাকে, সাক্ষীর উপস্থিতি আরও কমতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আদালত প্রাঙ্গণে হাজির থাকলেও তাদের পক্ষ থেকে হাজিরা দেয়া হয় না, আসামিপক্ষ তাদেরকে ভয়-ভীতি দেখায়। তাছাড়া সাক্ষীর আসা যাওয়ার খরচ ও একটি কর্মদিন বৃথা যাওয়ার কারণেও তারা আদালতে আসতে চায় না। আবার অনেকক্ষেত্রেই সাক্ষী উপস্থাপনে দীর্ঘ বিলম্বের মধ্যবর্তী সময়ে কখনো কখনো মামলার গুরুত্বপূর্ণ অনেক সাক্ষী মৃত্যুবরণ করে। ফলে অনেকক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগও উপযুক্ত সাক্ষ্যের অভাবে আদালতে অপ্রমাণিত থেকে যায়।

আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে আদালত হতে ইস্যুকৃত ওয়ারেন্ট যথাযথভাবে তামিল না হলে কিংবা তামিল করা অসম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট থানা হতে সে সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন প্রায়ই ওয়ারেন্টে উল্লেখকৃত তারিখের আগে আদালতে প্রেরণ করা হয় না। যার ফলে একই সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একাধিক ওয়ারেন্ট অকার্যকর অবস্থায় থানায় জমে থাকে, অথচ ঐ ওয়ারেন্ট কিংবা যে সাক্ষীর প্রতি ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে তার উপস্থিতির সম্ভাব্যতার বিষয়ে আদালত অবগত থাকেন না। এ অবস্থায় মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায় এবং আদালতের পক্ষে ঐ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে মামলার কার্যক্রম অগ্রসর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

২০০৭ সালে দেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রেক্ষিতে নব প্রতিষ্ঠিত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে ফৌজদারি মামলাগুলোর নথি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দফতর থেকে প্রেরণ করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, প্রেরিত অনেক পুরোনো মামলার নথিতে এজাহার, চার্জশীটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজ অনুপস্থিত। ফল ওই সকল মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় এক প্রকারের স্থবিরতা তৈরি হয়। আবার একই বিচারকের উপরে একাধিক আদালতের দায়িত্বভার আরোপিত থাকার কারণে অনেকসময়ই কোন একটি আদালতের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বা শুনানি শুরু হলে অপর আদালতে মামলা পরিচালনা করা বিচারকের পক্ষে সম্ভব হয় না।

অনেক সময় উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ এর কারণে নিম্ন আদালতের মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়ে থাকে। প্রায় সকল আদালতেই কিছু সংখ্যক মামলা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। এটা শুধু একটি চট্টগ্রামের চিত্র নয়, সারা দেশে এ ধরনের সংকট রয়েছে।

নিম্ন আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিভিশন দাখিল করা হলে অনেকক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি নিম্ন আদালত হতে তলব করা হয়। কখনো কখনো উক্ত রিভিশন মামলার শুনানি বিলম্বিত হওয়ায় কিংবা রিভিশন শুনানি শেষে নথি মূল আদালতে ফেরত আসতে দেরি হওয়ায় অধঃস্তন আদালতে সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়। যথাযথ কারণ ছাড়াও দেওয়ানি মামলার মত ফৌজদারি মামলাতেও আইনজীবীদের অতিরিক্ত সময় প্রার্থনার প্রবণতার কারণে অনেকসময় মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পায়।

এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘হত্যা, ধর্ষণ, অস্ত্রবাজি, মাদক ও চোরাচালানের অনেক মামলা বিচারাধীন। মামলা জট কমাতে হলে বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে সৎ যোগ্য ও দক্ষ বিচারক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ ও সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনে জরুরি পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপতি বরাবর সমিতির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের জেলা, মহানগর, নারী ও শিশু এবং কয়েকটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালসহ ৯০টি আদালতে এখন দুই লাখের বেশি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বিচারক সংকটের পাশাপাশি করোনার কারণে বিচারাধীন মামলার কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মামলার জট বাড়ছে।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সনাক-টিআইবির সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘মামলাজট কমানোর জন্য যে যে ব্যবস্থাগুলো নেয়া দরকার সেটা তো কেউ করবে না। মামলাজট কমাতে হলে প্রথমত শনিবারও আদালত খোলা রাখা দরকার। শনিবার যখন আদালত খোলা ছিল, তখন একটি ধার্য্য তারিখ এক মাসের মাথায় পড়তো, এখন সেটা তিন মাসে চলে গেছে। আরেকটি হচ্ছে মামলাজট কমাতে গেলে প্রয়োজনীয় আদালত ও বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতেই হবে। বর্তমানে আদালত খুবই অপ্রতুল। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার, ইন্টারনেট সরঞ্জামাদি, স্টেনো টাইপিষ্ট, প্রসেস সার্ভার নিয়োগ করতে হবে।’

‘অনেক মামলায় অহেতুক সময় নেয়া হয়। কিছু আইনজীবী সঠিক আইনি পরামর্শ দেন না। কিছু কিছু পাবলিক প্রসিকিউটর ও আইনজীবী মনে করেন, মামলা রেখে দিতে পারলে তাদের জন্য ভালো, পয়সা আসবে। মামলা নিষ্পত্তির জন্য পাবলিক প্রসিকিউটর ও আইনজীবীদেরকেও আন্তরিক হতে হবে। সামাজিক দায়বোধ থেকে আন্তরিক হওয়া উচিত।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘কিছু কিছু আদালত আছে, যেমন যুগ্ম জেলা জজ আদালতে এত বেশি চাপ- কল্পনায় করা যাবে না। অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকের মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয় না। এখানে ব্যাংকারদের টেকনিকও আছে। যখন বাংলাদেশে ১৩টি ব্যাংক ছিল, তখন ব্যাংকের মামলা করার জন্য চট্টগ্রামে তিনটি বাণিজ্যিক আদালত ছিল। অর্থঋণ আদালত আইন করার পর ৫৭টি ব্যাংক, অথচ চট্টগ্রামে একটি আদালত। সুতরাং মামলা নিষ্পত্তি হকে কীভাবে? ব্যাংক কর্মকর্তারাও চান না, মামলা নিষ্পত্তি হোক। কারণ এক ব্যাংকের যিনি চেয়ারম্যান বা পরিচালক, তিনি আবার অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণী। সুতরাং চাপ দিলে তো আবার ঘুরেফিরে নিজে বিপদে পড়বে।’

‘বিভিন্ন মিটিংয়ে ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি জানতে চান মামলা নিষ্পত্তি কেন হয় না। আমি তখন বলি, নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, আপনারা কী চান? একটি অর্থঋণ আদালত কেন? দশটি দরকার চট্টগ্রামে। না পারলে পাঁচটি অর্থঋণ আদালত দেওয়া হোক চট্টগ্রামের মতো জায়গায়। কিছু বিচারক মাঝে মাঝে সাড়ে ১১টায় বসেন, সাড়ে ১২টায় নেমে যান। কিছু আদালতে কোন কাজই নেই। এগুলো নিয়ে কারও মাথাব্যাথাও নেই।’ বলেন অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।