বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ঐতিহ্যের সাক্ষী বখশী হামিদ মসজিদ

প্রকাশিতঃ Friday, November 5, 2021, 8:11 pm


মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) : বখশী হামিদ মসজিদ— চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে একটি দীঘির পাড়ে প্রাচীন এই মসজিদটির অবস্থান।

মসজিদে রক্ষিত ফলকে আরবিতে লেখা আছে— ‘বনাল মাসজিদুল মোকারেম ফি আহমিদ-মুলক, ইসনাদুল মিলাত ওয়াদ্দিন সুলতানুল মুয়াজ্জাম সুলাইমান (কররানি) সালামালাহু আনিল ওয়াফাত ওয়াল বলিয়্যাতি মুরেখাত তিসযু রমজান, খামছুন ও সাবয়িনা ওয়া তিসআতু মিআত হিজরি আলাইহিস সালাম।’

অর্থ্যাৎ এই মসজিদ নির্মাণ হয়েছে সেই বাদশাহর যুগে যাকে উপাধি দেয়া হয়েছে দ্বীন এবং মিল্লাতের সুলতানুল মুয়াজ্জম তথা মহান সম্রাট, আর তিনি হলেন সুলাইমান কররানি (আল্লাহ তাকে বিপদাপদ থেকে মুক্ত রাখুন), তারিখ ৯৭৫ হিজরি সালের ৯ রমজান। যার ইংরেজি সাল ১৫৬৮ সালের ৯ মার্চের সঙ্গে মিলে যায়।

শিলালিপির বক্তব্য মতে, এটি সুলাইমান কররানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করার কথা থাকলেও লোকমুখে বখশী হামিদের নির্মিত মসজিদ বলে পরিচিত। বখশী হামিদের পুরো নাম মুহাম্মদ আবদুল হামিদ, বখশী তার উপাধি। বখশী ফার্সি শব্দ। এর অর্থ কালেক্টর বা করগ্রহীতা।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, তৎকালীন সময়ে বখশী হামিদ এই অঞ্চলের কালেক্টর ছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন।

জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন সময়ে এ এলাকায় প্যারাবন ছিল। জনবসতি ছিল না। ইউসুফ ও কুতুব নামে গৌড়ের দু’জন আমির শাহ্ আবদুল করিম নামক জনৈক সুফীর সঙ্গে উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাঁশখালীতে অবতরণ করেন।

তারা উপকরণ নিয়ে বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশার দরগাহ বাড়ির স্থানে পৌঁছলে শাহ্ আবদুল করিম ‘ইল্লাল্লাহ’ শব্দ উচ্চারণ করে তার ছড়ি (লাঠি) পুঁতে রাখেন এবং সেখানে বসবাসের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এ সময় থেকে স্থানটি ইল্লাল্লাহ শাহের স্থান এবং পরে ইলশায় রূপান্তরিত হয়।

বখশী আবদুল হামিদ উক্ত শাহ্ শাহের বংশধর। কেউ কেউ মনে করেন গৌড় থেকে আগত সুফী দরবেশের মধ্যে একজন ছিলেন সুলাইমান। তিনি নেতৃস্থানীয় ও সাধক ছিলেন। জ্ঞানে, গুণে অসাধারণ বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী ছিলেন। সবাই তাকে সুলতান বলে ডাকতেন। তিনি এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেন।

মোঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত এ মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট, মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছোট গম্বুজ দুটি ধনুকের মতো করে ছাদের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে ইট, পাথর ও সুরকি ব্যবহার করে। মসজিদটির নির্মাণ কৌশলের সাথে ঢাকার শায়েস্তা খান মসজিদ এবং নারায়ণগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদের মিল পাওয়া যায়।

মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে প্রাচীন কালের সান বাঁধানো একটি সু–বিশাল পুকুর রয়েছে, পুকুরে মাছ চাষ করা হয় এবং পানি ব্যবহার করে মুসল্লিরা অজু করেন। মসজিদের পশ্চিমে কবরস্থান। পূর্ব-উত্তরে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ ইসলামী কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয় দারুল কোরআন মুহাম্মদিয়া শাহ আব্দুল হামিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা।
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি সমাবেত হয় এই মসজিদে।

গত ১০ অক্টোবর ৪৫০ বছরের পুরনো বখশী হামিদ মসজিদ সস্ত্রীক পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ মেরিন সুহ। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন ফ্রান্সের দ্যা ক্রাইসিস অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের পরিচালক এরিক সেভালিয়াস।

পরিদর্শনের সময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদুত জ্যাঁ মেরিন সুহ বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক বকশি হামিদ মসজিদটি দেখে সত্যিই আমি আনন্দিত। এটা খুব সুন্দর একটি পুরাতন স্থাপনা। আমি এই সুন্দর মসজিদটির মঙ্গল কামনা করছি।’