সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

এনবিআর সার্ভারে সাইবার অপরাধীদের হানা, শুল্ক হারাচ্ছে সরকার

প্রকাশিতঃ সোমবার, নভেম্বর ২২, ২০২১, ১২:২৭ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা, আমদানিকারক এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিএন্ডএফ এজেন্টদের সংঘবদ্ধ একটি চক্র এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সিআইআইডি সূত্রে জানা গেছে, এনবিআর’র অতি সংবেদনশীল সার্ভারে ঢুকে সংঘবদ্ধ চক্রটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সম্প্রতি ৯টি চালান খালাস করে নিয়েছে। এ ঘটনায় ‘প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল’ নামে চট্টগ্রামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত থাকার অভিযোগ কাস্টমস কর্তৃপক্ষের। এ ৯টি চালানে প্রায় ১৭ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে। এ ৯টি চালানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। চলতি বছরের জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে এ জালিয়াতির ঘটনাগুলো ঘটে।

ঘোষণা অনুযায়ী ৯টি আমদানিকারকের মধ্যে ৬টি ঢাকার ইপিজেডভিত্তিক এবং বাকি ৩টি ঈশ্বরদী ইপিজেডভিত্তিক। প্রতারণার এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল ইসলাম।

গত শুক্রবার পণ্যবাহী দুটি কনটেইনার খোলার পর বিষয়টি নজরে এলে ‘প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল’র আরও দুটি চালান আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

কাস্টমস সূত্র জানায়, কনটেইনার দুটি খুলে ২৩৮টি প্যাকেটের মধ্যে ৭৫ রকমের সামগ্রী ছিল। এরমধ্যে ছিল ৪৮৩টি জায়নামাজ, ১ হাজার ৫৫১টি কম্বল, ১২০ কেজি প্রসাধনী, ২০০ কেজি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীসহ ৭ হাজার ৫৭০ কেজি পণ্য। আটক চালানটি আমদানি হয় পাবনা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমজিএল কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের নামে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাসসহ পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল নগরের আগ্রাবাদ এলাকার সিএন্ডএফ এজেন্ট ‘প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল’।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার মো. শরফুদ্দীন মিঞা জানান, প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালের ৯টি চালানে সুতা, ওভেন ফ্যাব্রিক এবং পলিয়েস্টার ফ্যাব্রিক ছিল। আমার মনে হয় ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য ছিল না। অবৈধ পণ্য ছিল বলেই তারা জাল আইপি ও কর্মকর্তাদের আইডি ব্যবহার করা হয়েছে।’ সিআইআইডি’র কর্মকর্তারা জানান, সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করার সময় চক্রটি যে ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) অ্যাড্রেস ব্যবহার করেছে সেগুলো শুল্ক বিভাগের নয়। এসব জালিয়াতিতে জড়িত ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনালসহ ৭টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

সূত্রটি জানায়, এর আগে ২০১৯ সালে ২০১৬ থেকে ২০১৮ এর মধ্যে সার্ভারে অনুপ্রবেশের বেশ কিছু ঘটনা উদঘাটন করে সিআইআইডি’র কর্মকর্তারা। এসময়ও সাইবার অপরাধীরা দুজন শুল্ক কর্মকর্তার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে শুল্ক ছাড়া ৩ হাজার ৩৩৭টি চালান মুক্ত করে দেয়। এসব পণ্যের মূল্যমান ছিল ৮৫০ কোটি টাকা।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের উপপরিচালক লুৎফুল কবীর চন্দন বলেন, ‘এনবিআর’র সার্ভারে ঢুকে পণ্য খালাস কাজে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক ছাড়াও চক্রটির সঙ্গে শুল্ক কর্মকর্তারাও জড়িত।’ এ ঘটনা নিয়ে দুদক একটি মামলা দায়ের করেছে বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, চক্রটি যে দুই শুল্ক কর্মকর্তার পাসওয়াড ব্যবহার করেছে তারা হলেন-কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আমির হোসেন এবং রাজস্ব কর্মকর্তা জয়নব বেগম। তবে এ দুই কর্মকর্তার কেউ এ সিস্টেম ব্যবহার করার অনুমোদন ছিল না। দুই কর্মকর্তার একজনকে গত মার্চ মাসে অন্যএ বদলি করা হয়েছিল। আরেকজনকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এদিকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এনবিআর’র সার্ভারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, একবার ‘অটোমেটেড সিস্টেম ফর কাস্টমস ডাটা ওয়ার্ল্ড’ নামে এনবিআর’র অতি সংবেদনশীল সার্ভারে অনুপ্রবেশ করতে পারলে ‘সাইবার অপরাধীরা’ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এর আগে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অনুপ্রবেশের ঘটনার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষ সার্ভারের কিছু ত্রুটি সারিয়ে নেন। পাশাপাশি কঠোর লগইন তথ্য নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করে।

এনবিআর’র সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট (আইটি) কাজী মুহাম্মদ জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইডির মালিকের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কেউ আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে পারার কথা না। এমন কী এনবিআরের আইটি বিভাগও এ পাসওয়ার্ড জানতে পারে না। তবে আইডি এবং পাসওয়ার্ড পেলে দেশের যেকোনো অংশ থেকে যে কেউ এনবিআরের সার্ভারে প্রবেশ করতে পারবেন।’

জানা গেছে, ‘প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল’ শুল্ক না দিয়ে ৯টি চালানকে মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নাম সম্বলিত ভুয়া ইমপোর্ট পারমিশন (আইপি) ব্যবহার করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সাইবার অপরাধীদের এটা বের করার চেষ্টা করছি। সাইবার অপরাধীদের পুরো চক্রকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কিছু সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব প্রতারণায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।’

৯টি চালান ছাড়ানোর জন্য নিজের ইউজার আইডি ব্যবহার প্রসঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তা আমির হোসেনের বলেন, ‘আমাকে তো অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল বদলির পর আমার আইডি বাতিল করা। এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।’

একইভাবে জয়নব বেগম বলেন, ‘আমার আইডির অপব্যবহারের ব্যাপারে আমি অবগত নই। এ জালিয়াতি সম্পর্কে আমার কোনো ধারনা নেই এবং আমি জানি না কীভাবে আমার আইডি ব্যবহার করা হয়েছে।’