মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

উচ্চ আদালতের রায় অমান্যের অভিযোগ রেলওয়ে কর্মকর্তা কামরুনের বিরুদ্ধে

| প্রকাশিতঃ ১৭ মার্চ ২০২২ | ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন


মোহাম্মদ রফিক : রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সরকারের ৬০ কোটি টাকা অপচয়ের আশংকা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ জুনিয়র অডিটর পদের কর্মচারীদের।

জানা গেছে, ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট (পিটিশন নং ৬০৩৮/২০১২) দায়ের করেন ফাউন্ডেশন কোর্স পাশ করা রেলওয়ে হিসাব বিভাগের জুনিয়র অডিটর পদের কর্মচারীরা। ২০১৬ সালে তাদের পক্ষে রায় দেয় উচ্চ আদালত। ওই রায়ে জুনিয়র অডিটর থেকে ভূতাপেক্ষিক অডিটর হিসাবে ফাউন্ডেশন কোর্স পাশ করার তারিখ থেকে তাদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।

রায়টি কার্যকরের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে উচ্চ পর্যায়ের চার সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ)। ওই কমিটির প্রধান করা হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা এবং প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহারকে। ওই কমিটি উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন।

নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রায় বাস্তবায়ন না করায় কামরুন নাহারসহ কমিটির চার সদস্যের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন রায় প্রদানকারী উচ্চ আদালতের ওই বেঞ্চ। পরে আদালতে উপস্থিত হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা কামরুন নাহার।

বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে ফাউন্ডেশন কোর্স পাশ করা রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে কর্মরত দুই শতাধিক কর্মচারী উচ্চ আদালতে সাতটি রিট করেন। সর্বশেষ রিট (৯৬৬৫/২০১৭) দায়েরকারী হলেন আবদুল হাই। এ মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে জুনিয়র অডিটর থেকে অডিটর পদে ফাউন্ডেশন কোর্স পাশ করা কর্মচারীদের যাবতীয় আর্থিক সুযোগ সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।

অভিযোগ আছে, উক্ত রায় সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেননি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহার।

উক্ত রায়ে বলা হয়েছে, ‘৯ এম এল আর (এডি) ২৫১ এর মধ্যে এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছিল যে, “আদালতের সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রদত্ত সুবিধা একই অবস্থানে থাকা অন্যদেরকেও দেওয়া হবে। যাহাদেরকে মামলায় পক্ষভুক্ত করা হয়নি।” এই মর্মে রুল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়।

এদিকে রায় বাস্তবায়নের জন্য ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন রেলের উপপরিচালক (অর্থ) ওয়াহিদুজ্জামান। কিন্তু গেল প্রায় আড়াই বছরেও ওই রায় বাস্তবায়ন করেননি অর্থ উপদেষ্টা (পূর্ব) কামরুন নাহার।

ভুক্তভোগী একজন রেল কর্মচারী বলেন, ‘হাইকোর্টে ২৩ কর্মচারীর দায়ের করা রিট পিটিশনের (৮৪৮০/২০১৭) আলোকে রায় বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন রেলের হিসাব বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ)। উচ্চ আদালত রিট পিটিশন দায়েরকারীদের জুনিয়র অডিটর থেকে অডিটর পদে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দিয়ে তাদের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা দেয়ার জন্য রায় প্রদান করেন। কিন্তু রেল পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহার রায় বাস্তবায়ন না করে নিজের ইচ্ছা মাফিক ১১ জন টিটিই-কে (ট্রেন টিকিট কালেক্টর) মূল বেতন ও ৭৫ শতাংশ মাইলেজ যোগ করে ফাউন্ডেশেন কোর্সেও তারিখ থেকে যাবতীয় সুবিধা দিয়েছেন। ফলে অতিরিক্ত প্রায় কোটি টাকার বিল পাশ করেছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে টিটিইদের খাতে অদূর ভবিষ্যতে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা রেলের গচ্ছা যাবে।’

ভুক্তভোগী অডিটর অধীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘টিটিই’রা যদি মাইলেজ পেতে পারে তাহলে দপ্তারাদেশ (২৪ তাং-১৫/০৩/২০২০) অনুযায়ী অবশিষ্ট ১২ অডিটরকে একই সুবিধা দিতে হবে। নতুবা ওই দপ্তর আদেশ বাতিল করে আদালতের নির্দেশ অনুয়ায়ী ১০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে গণহারে দপ্তর আদেশ জারি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আলোচ্য দপ্তরাদেশ বাতিল করা হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত শুদ্ধ হবে না।’

দপ্তরাদেশে (২৪ তাং ১৫/৩/২১) বলা হয়, “মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এর হাইকোর্ট বিভাগের দায়েরকৃত রিট পিটিশন (নং ৮৪৮০/২০১৭) এর রায়ের আলোকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) রেলভবন/ঢাকা কার্যালয়ের পত্রাদেশ নং-অম/অর্থ/প্রশা:/বিভাগীয় মামলা ৫৬৪/২০১৭ তারিখ ১.১২.১৮ এবং বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ এর আলোকে উক্ত রিট পিটিশনারদের নিম্নবর্ণিত শর্ত সাপেক্ষে জুনিয়র অডিটর হতে অডিটর পদে ভূতাপেক্ষভাবে তাদের নামের পাশের ৭ নং কলামে উল্লেখিত তারিখে সকল প্রকার আর্থিক সুবিধাসহ পদোন্নতি কার্যকর করা হল।”

ভুক্তভোগী একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, ২০১২ সালে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত জুনিয়র অডিটর কাম টাইপিস্টদেরকে তিনবছর পর অডিটর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রেল পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহারের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তাদেরকে পদোন্নতি দেননি। রায় বাস্তবায়ন না হলে রেল পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে তারা আবার উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী একজন কর্মচারী।

অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কামরুন নাহারের মুঠোফানে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে একই প্রসঙ্গে রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) মো. আনিসুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহারকে বলা হয়েছে। তিনি কেন রায় বাস্তবায়ন করছেন না সেটি তাকেই জিজ্ঞাসা করুন।’

*** উপরোক্ত সংবাদ প্রকাশের ৫৩ দিন পর ৯ মে রেলওয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অডিটর অধীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী একুশে পত্রিকার কাছে দাবি করেন, “উক্ত প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়েছে সেটি তার দেওয়া বক্তব্য নয়। তিনি ১২ অডিটরকে সুবিধা দেওয়া সংক্রান্ত বক্তব্য কখনো একুশে পত্রিকাকে দেননি।”

একুশে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে ও ভয়েস রেকর্ড যাচাই করে জানতে পারে, নিউজের তথ্যদাতা ব্যক্তি নিজের নাম গোপন করতে নিজেকে ‘অধীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন; যার কারণে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য একুশে পত্রিকা দুঃখ প্রকাশ করছে।