শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

৬৫ লাখ টাকায় পশুর হাট ইজারা দিয়ে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হারাল চসিক!

| প্রকাশিতঃ ৭ জুলাই ২০২২ | ৫:৫০ অপরাহ্ন


আবছার রাফি : চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ‘পছন্দের ব্যক্তিকে’ ৬৫ লাখ টাকায় পশুর হাট ইজারা দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, নগরীর পতেঙ্গা ৪১ নং ওয়ার্ডের অধীনে বাটারফ্লাই পার্কের দক্ষিণে টিকে গ্রুপের খালি মাঠে অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিতে গত ২৩ জুন দরপত্র আহ্বান করে চসিকের রাজস্ব বিভাগ। তখন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন ৫৪ জন। তন্মোধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে আবুল হাসেম রাজাকে পশুর হাটটি ইজারা দেওয়া হয়। ইজারামূল্য ভ্যাটসহ ১ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার টাকা।

তবে ইজারা নেওয়ার পরও টিকে গ্রুপের খালি মাঠ ব্যবহারের অনুমতি পাননি আবুল হাশেম রাজা। তাছাড়া মাঠের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে কাঠ রাখার জন্য ভাড়া দিয়ে রেখেছে টিকে গ্রুপ। অল্প জায়গা বাকি থাকলেও পশুর হাটের জন্য তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে টিকে গ্রুপ।

ফলে আবুল হাসেম রাজা ২৩ জুন টিকে গ্রুপের খালি মাঠ থেকে ২ মিনিট দূরত্বে থাকা তার নিজস্ব জায়গায় পশুর হাট বসাতে চেয়ে চসিকে আবেদন করেন। ৫ দিন পর ২৮ জুন চসিক কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে জানায়, আবুল হাসেম রাজা নিজস্ব মাঠে পশুর হাট বসাতে পারবেন। পাশাপাশি টিকে গ্রুপের খালি মাঠেও বসাতে পারবেন।

এর দুদিন পর ৩০ জুন ঘটলো আরেক ঘটনা। সেদিন ৩৯ ও ৪০ নং ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী খেঁজুরতলা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিডিএর খালি মাঠে অস্থায়ী পশুরহাট বসানোর জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে চসিক। একই দিনে দরপত্র আহ্বান করে, আবার একই দিনে নিলাম দেয় চসিক, যে নিলামে অংশগ্রহণ করেন মাত্র ৩ জন। নজিরবিহীনভাবে একই দিনে ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, একই দিনে অনুমোদন দেওয়া নিয়ে ইজারাদার ও সংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা।

৫ লাখ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই নিলামে অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিরা হলেন- ৪০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল বারেকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মো. সাইফুদ্দীন ও আবুল বশর, ৩৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর হোসেন শান্ত। তন্মোধ্যে কাউন্সিলর বারেকের অনুসারী সাইফুদ্দীন ৬৫ লাখ টাকা ইজারামূল্যে খেঁজুরতলা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিডিএর খালি মাঠটিতে পশুর হাট বসানোর ইজারা পান।

এরপর ৩ জুলাই চসিককে চিঠি দিয়ে আবুল হাশেম রাজা জানিয়ে দেন, টিকে গ্রুপের খালি মাঠের সেই পশুর হাট ইজারা নিতে চান না তিনি। কারণ হিসেবে আবুল হাশেম রাজা লিখেন, খেঁজুরতলা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিডিএ খালি মাঠ ও টিকে গ্রুপের খালি মাঠ পাশাপাশি অবস্থিত। এ কারণে তার ইজারা নেওয়া মাঠে পশু আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হবে। এছাড়া টিকে গ্রুপের মাঠে আমদানি করা বিশাল আকৃতির কাঠ মজুদ রাখার কারণে হাট বসানো যাবে না।

চিঠিতে আর্নেস্ট মানি হিসেবে জমাকৃত ৪৬ লাখ টাকা ফেরত প্রদানেরও আবেদন জানান আবুল হাশেম রাজা।

জানতে চাইলে আবুল হাশেম রাজা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ২৩ জুন যখন আমাকে পশুর হাটটি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে লেখা ছিল কারও যদি নিজস্ব সম্পত্তি থাকে তাহলে ওখানে করতে পারবে। টিকে গ্রুপের মাঠ থেকে ২ মিনিটের পথে আমার একটা বড় জায়গা আছে। টিকে গ্রুপের মাঠে এখন জায়গা নেই। টিকে গ্রুপও মাঠ দিচ্ছে না। ওখানে ওরা কাঠ রাখার জন্য ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। একশ’-দুইশ’ গরু রাখা যাবে এমন অল্প কিছু জায়গা আছে। যেহেতু আমার নিজস্ব জায়গা আছে তাই চিন্তা করেছি, আমরা সেখানে বাজারটি করবো। এজন্য ২৩ জুন আবেদন করার পর ২৮ জুন আমি অনুমতি পেয়েছি। তাও ৫ দিন পর মৌখিক অনুমতি দিয়েছে। তখন আমি বললাম আপনারা লিখিত দেন, দেয়নি। এই অনুমতি দিতে কেন ৫ দিন হলো তা আমার বুঝে আসছে না। কর্পোরেশনের এস্টেট অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরীকেও টিকে গ্রুপের মাঠের সমস্যাগুলো দেখিয়েছি এবং ১০ হাজার টাকাও দিয়েছি তাকে। আবার ৩০ জুন সকালে পত্রিকায় দেখতেছি- সেদিনই বিজ্ঞপ্তি, সেদিনই টেন্ডার, সেদিনেই ৫ লাখ টাকা পে অর্ডার দিতে হবে, পাশের আরেকটা মাঠের জন্য। অল্প পথ দুই হাটের মাঝখানে। ক্রেতা হচ্ছেন তিনজন। মেয়র ওদের একজনকে দিয়ে দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জায়গায় হাটটা করতে পারলে আমার কিছু লাভ হতো। কিন্তু আমাদের মেয়র মহোদয় বারেক সাহেবের সাথে মিশে হাটটা দিয়ে দিয়েছেন। তাই আমি আর করি নাই। আমি চিঠি দিয়ে দিছি, আমি আর করবো না। আমি কেন করবো, একটা থাকলে হতো। তারা তো আরেকটা দিয়ে দিছে। কার সাথে মারামারি করবো? এলাকার লোকজন সবাই একসাথে থাকি, ভাইয়ে ভাইয়ে মারপিট করার কোনো দরকার আছে? মানুষ লাভের আশায় হাট ইজারা নেয়, কিন্তু লাভ না পেলে কেন করবে? নতুন টেন্ডারও যেহেতু ৫ লাখ টাকার সেহেতু সেটাতেও অংশ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বারেক সাহেব অংশ নিতে দেননি। ৩০ জুন সকালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেদিনই টেন্ডার দিয়ে দিয়েছে চসিক।’

আবুল হাশেম রাজা বলেন, সিটি কর্পোরেশন আমার চিঠিটা গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো উত্তর দেয়নি। আমি পশুর হাট ইজারা নিয়েছিলাম ভ্যাটসহ ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা দিয়ে। আর খেঁজুরতলা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিডিএর খালি মাঠের বাজারটা সাইফুদ্দীন নিয়েছে ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে।’

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের সাথে, তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী ৫ জুলাই নগরভবনের অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর ৬ ও ৭ জুলাই বারবার ফোনে কল করা হলেও রিসিভ করেননি চসিকের এ কর্মকর্তা। একইভাবে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এস্টেট শাখার অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরীর সাথে। সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্যও জানা যায়নি। এছাড়া ৭ জুলাই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পরে ফোন করুন। আমি মিটিংয়ে আছি।’ এ কথা বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

জানতে চাইলে সনাক-টিআইবি’র চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, চসিক সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। তাদের কাছে আমরা ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না। টিকে গ্রুপের খালি মাঠটা যদি কাঠ দিয়ে ভরা থাকে তাহলে মাঠটা দেওয়ার আগে ওনারা সেটা যাচাই বাছাই করেননি কেন? এটা প্রথম অপরাধ। আর টিকে গ্রুপের সাথে যদি চুক্তি থাকে তাহলে সেখানে টিকে গ্রুপ অন্য মালামাল রাখবে কেন? ইজারাদার যে জায়গাটা নিয়েছে সেই পরিমাণ জায়গা মাঠে না থাকলে, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান কাউকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারেন না।’

‘একটা গরুর বাজার থেকে আরেকটা গরুর বাজার কত দূরত্বে দেয়া যায় সেটার তো একটা নিয়ম থাকার কথা। আর পাশে যেহেতু আরেকটা মাঠ দিয়েছেন তাহলে সেটা কম টাকায় দিলেন কেন? এই লুটপাটের কাজটা কেন করলেন তারা? আর একই তারিখে টেন্ডারের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন? কেন করলেন হঠাৎ করে? দিলে আগেরটা যে তারিখে হয়েছে সেই তারিখে দেওয়া উচিত ছিল। মাঠটা যদি দেওয়ার মতো আইন-বিধিতে থাকে বা তাদের লিস্টে থাকে তাহলে আগে দেয়নি কেন? এখানে কোন স্বচ্ছতা নেই। জবাবদিহিতা, সুশাসনের ঘাটতির কারণে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে।’

অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘চসিক এই কাজগুলো বারবার করে, কারণ তাদের কিছুই হয় না, এখন লুটপাটের একটা আখড়া হয়ে গেছে এই সেবা প্রতিষ্ঠানটি। আর ইজারাদার যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন আর টাকা রিটার্ন নিতে চান তাহলে সঙ্গত কারণে তার টাকা (আর্নেস্ট মানি) ক্ষতিপূরণসহ রিটার্ন দিতে হবে। কারণ এখানে আইনের গুরুত্বর ব্যতয় ঘটেছে। টেন্ডারবিধির ব্যতয় ঘটিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। এটা সুস্পষ্ট অন্যায়।’