শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এক-এগারো সরকারের সুবিধাভোগীরাই আ.লীগ সরকারের সুবিধাভোগী!

| প্রকাশিতঃ ১৫ জুলাই ২০২২ | ১১:৩৬ অপরাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মান্নান ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বদান্যতায় ২০০২-২০০৩ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদে আসীন হন ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। রাজনীতির দুর্দিন-দুঃসময় কিংবা আওয়ামী লীগ যখন বিরোধীদলে তখন রাজপথের মিছিল-মিটিংয়ে শামিল হওয়ার সময়-সুযোগ কোনোটাই হয়নি তার। এ কারণে আবদুচ ছালামকে বলা হয় চট্টগ্রাম আওয়ামী রাজনীতির ‘অতিথি’।

সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকার যখন দুর্নীতির ঢালাও অভিযোগ তুলে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতাদের এলোপাতাড়ি গ্রেপ্তার করে কারাগারে পুরছে, নির্যাতন চালাচ্ছে; তখনই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম এক এগারো সরকারের করা দুর্নীতিবিরোধী কমিটি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সদস্য সচিব হন। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারকে খুশি করতে চট্টগ্রাম নগরে দুই কিলোমিটারব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী শোভাযাত্রার আয়োজন করেন তিনি। স্লোগান ধরেন ‘দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও’।

ওই শোভাযাত্রায় তার সঙ্গে উপস্থিত থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথিত জিহাদ ঘোষণা করে স্লোগান ও বক্তৃতা দেন হোটেল আগ্রাবাদের মালিকের স্ত্রী মনোয়ারা হাকিম আলী, সিটি করপোরেশনের তৎকালীন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর রেখা আলম চৌধুরীও। বলাবাহুল্য, সেই র‍্যালি এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে সকল রাজনীতিবিদদের ঢালাওভাবে ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে বক্তৃতা প্রদানের মধ্য দিয়ে রেখা আলম তখনই হাতিয়ে নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়রের পদ।

অন্যদিকে, আবদুচ ছালাম এক এগারো সরকার থেকে গ্রহণ করেন ‘সাদামনের মানুষ’ এর স্বীকৃতি ও সম্মাননা। একই সঙ্গে এই সম্মাননা পান তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক-এগারো সরকারের অনুকম্পায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের পদে বসা এম মনজুর আলম, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনবার রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়া এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল ও মনোয়ারা হাকিম আলী।

চট্টগ্রামের সচেতন রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকারের চরম সুবিধাভোগী আবদুচ ছালাম-মনোয়ারা হাকিম আলীরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমান সুবিধাভোগী হয় কী করে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ‘বর্তমান রাজনীতিতে এটাই নির্মম বাস্তবতা। এক-এগারো সরকারের সময় আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন বেশি, শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আদালত আর রাজপথে সক্রিয় ছিলেন যারা; ক্ষেত্রবিশেষে তাদের চেয়েও আওয়ামী লীগ সরকার থেকে বেশি সুবিধা গ্রহণ করেছেন আবদুচ ছালাম। রাজনীতির অতিথি খ্যাত এ ছালামকেই ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম সংসদে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ আংশিক) আসন থেকে মনোনয়ন দিয়ে বিস্ময়ের জন্ম দেয় আওয়ামী লীগ।

যদিও পরবর্তীতে ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ও স্বার্থ বিবেচনায় জাসদ সভাপতি মঈন উদ্দিন খান বাদলের হাতে মনোনয়ন চলে গেলেও বিফল মনোরথে ফিরতে হয়নি ছালামকে। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে রাজনীতির অঙ্গন থেকে প্রথমবারের মতো যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার সিডিএ’র চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসানো হয় ছালামকে। শুধু তা নয়, যুগপৎ বিস্ময়ে ৬ দফা এক্সটেনশনের মধ্য দিয়ে টানা ১০ বছর এই পদে বহাল থাকেন তিনি। এটিও সিডিএ’র ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

এক-এগারো সরকারের সুবিধাভোগী হয়ে ফের আওয়ামী লীগ সরকারেরও সুবিধাভোগী হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবদুচ ছালাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সবাই যখন কারাবন্দী তখন আমিই একমাত্র ছিলাম। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সম্মতি ও নির্দেশনায় আমি দলের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছি। যা করেছি দলের জন্য করেছি। এবং আমার কাজের পুরষ্কার হিসেবে জিল্লুর রহমান সাহেব ২০০৮ সালে দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি (জিল্লুর রহমান) আমার মনোনয়নের বিষয়টি সরাসরি হ্যান্ডেল করেছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলের বিরুদ্ধে কিছু করার প্রশ্নই আসে না। ওই সময় দলের জন্য ঝুঁকি নিয়ে যা করেছি তার সাক্ষী হিসেবে আফছারুল আমিন সাহেব, ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল আছেন। আর সবকিছু সেনাবাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে করেছি। তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এসব করেছি। যেহেতু দলের কেউ তখন মাঠে ছিলেন না, তাই প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য দলের হয়ে আমি কাজ করেছি।’

এদিকে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকারের আরেক সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত মনোয়ারা হাকিম আলী আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৩ বছরের ক্ষমতায় সরকারের নানান সুযোগ সুবিধা গ্রহণে ছিলেন অগ্রগামী। এক-এগারো সরকারের আমলে বাটারফ্লাই পার্ক করার জন্য বিমানবন্দর সংলগ্ন প্রায় শত কোটি টাকার মূল্যবান জমি হাতিয়ে নেওয়া মনোয়ারা হাকিম আলী সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অন্তত নয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের গভর্নিং বডির সদস্য মনোয়ারা হাকিম আলী। এছাড়াও সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) এর পরিচালক, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের রিভিউ প্যানেল-৪-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মনোয়ারা হাকিম আলী।

২০১৭ সাল পর্যন্ত পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সাধারণ পর্যদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশে সফরসঙ্গী হন মনোয়ারা হাকিম আলী।

এক-এগারো সরকারের সুবিধাভোগী হয়ে ফের আওয়ামী লীগ সরকারেরও সুবিধাভোগী হওয়া প্রসঙ্গে জানতে মনোয়ারা হাকিম আলীর মুঠোফোনে সংযোগ স্থাপন করতে শুক্রবার দিনভর চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি।

এদিকে, দলীয় নেতার এমন সুবিধাভোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।