শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

পার্কভিউ হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বাকে ‘ভুল চিকিৎসা’, উল্টো দুর্ব্যবহার!

প্রকাশিতঃ ৩১ জুলাই ২০২২ | ২:৫১ অপরাহ্ন


আবছার রাফি : চট্টগ্রাম নগরীর নিমতলা বিশ্বরোড এলাকার এক অন্তঃসত্ত্বাকে ‘ভুল চিকিৎসা’ দেওয়ার পর উল্টো চরম দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তৌফিকুল নাহার মোনার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী সাতমা সাইবা আলম স্বর্ণার স্বামী নাজিম উদ্দিন একুশে পত্রিকার কাছে এ অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় অভিযোগ করার এক মাস পরও পার্কভিউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

নাজিম উদ্দিন জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তার স্ত্রী নয় মাস ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন পার্কভিউ হাসপাতালের গাইনোকোলজিস্ট ডা. তৌফিকুর নাহার মোনার কাছে। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে ডাক্তার ১৭ মে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। ভর্তি করার পরদিন ১৮ মে বাচ্চা হয়।

নাজিম বলেন, ‘আমাদের বাচ্চা যখন দুনিয়ায় আসছিল তখন ডাক্তার মোনা উপস্থিত ছিলেন না। ডাক্তার আসতে দেরি হচ্ছিল বিধায় বাচ্চার মাথা জরায়ুর দিকের ঠেলে রেখে ডাক্তার না আসা পর্যন্ত ওনার সহযোগিরা অপেক্ষা করছিলেন। এদিকে আমার স্ত্রী তাৎক্ষণিক বাচ্চা বের করতে বললে তারা অপারগতা জানান। অবশেষে ডাক্তার মোনা এসে বাচ্চা বের করে নাভী কেটে আলাদা করে তিনি চলে যান। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, পরবর্তী চিকিৎসার জন্য ১০ দিন পর ডাক্তারের সাথে দেখা করতে।’

‘কয়েকদিন পর আমার স্ত্রীর অবস্থা অবনতি হতে শুরু করে। বাচ্চা হওয়ার ১০ দিন পার হয়ে ১১ দিনের সময়ও অনেকবার চেষ্টা করে ডা. মোনার সিরিয়াল নিতে পারিনি। বিষয়টি ওনাকে ফোনে জানানো হলে তিনি সিরিয়াল ছাড়া রোগী দেখবেন না বলে ফোন কেটে দেন। পরদিন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন আমার স্ত্রী। তখন আমাদের বাসার পাশ্ববর্তী মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর অবস্থা জটিল বলে আমাদেরকে অতি দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল বা মা ও শিশু হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন।’

নাজিম আরও বলেন, ‘তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আমার স্ত্রীকে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে আমাদের জানানো হয়- পার্কভিউ হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির পর জরায়ুতে গর্ভফুলের কিছু অংশ থেকে গেছে; তাৎক্ষণিক গাইনি এবং অবস্ বিভাগ অপারেশন করে পরিস্কার করার পরামর্শ দেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হিমোগ্লোবিন টেস্টে রক্তের পরিমাণ ৭ পয়েন্ট পাওয়া গেলে ৬ দিনে পর্যায়ক্রমে ৫ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। ৬ দিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হয়।’

পার্কভিউ হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পর জরায়ুতে গর্ভফুলের কিছু অংশ থেকে গেছে অভিযোগ করে নাজিম বলেন, ‘পার্কভিউ হাসপাতালে আমার স্ত্রী ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন। সেখানকার ডা. মোনার কর্মকাণ্ডে আমার স্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারতো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গর্ভবতী রোগীর মৃত্যু হয় বলে মা ও শিশু হাসপাতালের গাইনী ও অবস্ বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আমাদেরকে জানান ‘

‘এরপর সিরিয়াল পেয়ে মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার কাগজপত্র ও আমার শাশুড়িকে নিয়ে এ ঘটনা সম্পর্কে জানাতে ডা. তৈাফিকুর নাহার মোনার চেম্বার যাই। চেম্বারে ঢুকার পর তিনি বলেন- মরে তো যায়নি, যান যান এসব বিষয়ে কথা বলার সময় এখন আমার নেই। এ কথা বলে ওনার চেম্বার থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। ডাক্তারের এমন খারাপ ব্যবহার ও ভুল চিকিৎসা সম্পর্কে পার্কভিউ হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) তালুকদার জিয়াউর রহমানকে জানাই এবং মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার কাগজপত্রের এক কপি তাকে দিই। তিনি আমাদেরকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও উক্ত ঘটনায় এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পার্কভিউ হাসপাতালের গাইনোকোলজিস্ট ডা. তৌফিকুল নাহার মোনা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রোগীকে তো আমি ডেলিভারি করছি। রোগী অন্য হাসপাতালে কেন গেল? রোগীর রক্তক্ষরণ হলে আমরা আল্ট্রা করি। গর্ভফুলের অংশ অনেক সময় থাকতে পারে। রোগী অনেক সময় কো-অপারেট করে না, হাত দিয়ে দেখতে দেয় না তখন এটা একটু রয়ে যায়। প্রথম এটা যদি খুব বেশি খারাপ হতো তাহলে ২৪ ঘন্টার ভেতর রক্তক্ষরণ হতো। এমনকি নয় দিনের ভেতরও হয়নি। দশম দিনে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন আমার সিরিয়াল পাইছে সেদিন রোগী আনেনি। রোগীর মা রোগীর যে রক্তক্ষরণ হয়েছে এটা ছবি নিয়ে এসে বলেছে, দেখেন এইরকম রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখন আমি রোগীর মাকে কী বলবো? এরমধ্যে ওরা বিভিন্ন সময় অমাকে ফোন করে আপা এখানে ভর্তি হইছি, ওখানে এই হইছি। আমি বলছি, যাই হোক চিকিৎসা হচ্ছে তো। চিকিৎসা হইলেই হলো। কারণ মা ও শিশু হাসপাতালে বিল কম। পার্কভিউতে বিল বেশি। হয়তো সেকেন্ড টাইম এখানে তারা পারবে না বিধায় ওখানে গেছে।’

‘ছবি নিয়ে আসার পর রোগীর মাকে আমি বলেছি, আল্লাহ দিলে বেঁচে তো আছে, রোগী তো আর মারা যায়নি। আমি এই কথাটা বলছি। দুর্ব্যবহারের যে কথা বলা হচ্ছে তা আমি এতটা রূঢ়ভাবে বলিনি। আর ওই রোগীর গর্ভফুল অবশিষ্ট ছিল না, আমি বলতে পারি। যেহেতু ২৪ ঘন্টার ভেতর রক্তক্ষরণ হয়নি তাহলে ফুল যে আছে ওটা আমি বলতে পারবো না।’ বলেন ডা. মোনা।

তাহলে অন্য হাসপাতালের ডাক্তার কীভাবে গর্ভফুলের কিছু অংশ পেলেন (মা ও শিশু হাসপাতালে রোগীর ছাড়পত্রের ফাইন্ডিংসে উল্লেখ আছে), জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার নিজে থেকে বলেনি। আলট্রাসনোগ্রাফিতে বলছে এজন্য ডাক্তাররা বলেছে। আলট্রাসনোগ্রাফিতে সাধারণ ভেতরে রক্ত জমা থাকলেও ওটাকে বলে যে গর্ভফুল রয়ে গেছে। ফুল বা ফুলের কোনো অংশ থাকলে তো অবশ্যই ২৪ ঘন্টার মধ্যে রক্তপাত হবে।’

জানতে চাইলে পার্কভিউ হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) তালুকদার জিয়াউর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টা আসলে কী তা রোগী ও ডা. তৌফিকুর নাহার মোনা ম্যাডামের সাথে কথা বললে জানা যাবে। কিন্তু কিছুদিন আগে তারা আমাকে ফোন করে টাকা দাবি করে। তারা বলেছে এ ঘটনার কারণে তাদের অনেক টাকা-পয়সা খরচ হয়েছে। আমি বললাম, খরচ হয়ে থাকলে আমার থেকে বা প্রতিষ্ঠান থেকে কেন টাকা নেবে? টাকা দাবি কেন? এটা তো ক্ষতিপূরণের কিছু না। টাকা দাবি করা মানে তো চাঁদা দাবি করা। ডেলিভারির পরে যে-কোনো জটিলতার কারণে এটা হতে পারে। হলে তখন ডাক্তারের সাথে কথা বলে সবকিছু স্যাটেল করে নিলেই তো হয়। ম্যাডাম ওনাদের কী বলেছেন, তাই রাগ করে অন্য জায়গায় চলে গেছেন; এটা ম্যাডামের কাছে আসলেই তো সমাধান হয়ে যেত। ম্যাডাম তো অনেকগুলো রোগী দেখেন। সবার সাথে তো আর হাসিখুশিতে কথা বলতে পারেন না। তাই ওনারা ম্যাডামের ওপর মনক্ষুন্ন হয়েছেন।’

টাকা দাবির বিষয়ে ভুক্তভোগীর স্বামী নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘ওনাদের ভুল চিকিৎসার কারণে আমাদের একমাস দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভীষণ কষ্ট পেয়েছে আমার স্ত্রী। দুই-তিনগুণ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। মা ও শিশু হাসপাতালে ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এসব তো তাদের ভুলের কারণে করতে হয়েছে, তাই আমরা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলাম। আমরা কী ক্ষতিপূরণ চাইতে পারি না? আর মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার কাগজপত্র তো তালুকদার জিয়াউর রহমানকে এক কপি দিয়েছি। এবং ডা. মোনা ম্যাডামকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তো দেখলেন না। বরং খারাপ আচরণ করে চেম্বার থেকে বের করে দিয়েছেন।’

চিকিৎসার কাগজপত্র দেখিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের একজন বিশেষজ্ঞ একুশে পত্রিকাকে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটু বিট অব প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) রয়ে গেছে। ওটা থেকে জটিলতা হয়েছে। এক্সপার্ট হ্যান্ডে যদি এটি ঠিক মতো করে সাধারণত এটা থাকে না। বা থাকলেও এটা নজরে চলে আসে। ডেলিভারি হচ্ছে দুইটা; বাচ্চাকে ডেলিভারির সাথে সাথে প্লাসেন্টারও ডেলিভারি করাতে হয়। যদি ডেলিভারিটা ডাক্তার ভালোমতো করে এবং চেক করে তাহলে নরমালি এ সমস্যা হয় না। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যখন দেখেন যে, একটু ফুল রয়ে যেতে পারে বা কনফিউশন লাগে তখন ওনি রোগীকে ভর্তি রেখে পরবর্তীতে একটা আলট্রাসনোগ্রাফি করে রোগীকে ছাড়বেন। অথবা প্রয়োজন হলে পরে একটু ডিএনসি করে দেবেন, যাতে পরিষ্কার হয়ে যায়। এ রোগীর ডেলিভারির সময় ডাক্তার কতোটা আন্তরিক ছিলেন তা জানি না। তবে এখানে ওনার একটু মনোযোগের ঘাটতি ছিল বা তিনি তাড়াহুড়া করেছেন এমন হতে পারে। যার কারণে ফুল থেকে গেছে। অথবা এমন হতে পারে যে, চেক করার বিষয়টা নার্সের হাতে দিয়ে চলে গেছে। এই জায়গায় ওনার গাফিলতি থাকতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন কনসালটেন্টের কাছে আমরা যাচ্ছি কেন? যাতে এ সমস্যাটা না হয়। এখানে জেনারেল প্র্যাকটিশনারের (জিপি) কাছে তো যাওয়া হয়নি। নরমাল এমবিবিএস ডাক্তারের কাছেও তো না। একজন ডিগ্রি করা এক্সপেরিয়েন্স কনসালটেন্টের কাছে গেছেন। ওনার কাছ থেকে তো এরকম কাণ্ড আশা করা যায় না। আর উনি ফলোআপও দিয়েছেন দেরি করে। এতেই বুঝা যায়, ফুল যে থেকে গেছে এটা ওনি জানেন না। বুঝেও নাই। যাই হোক, আমরা ধরে নিলাম যে- তিনি কনফিউশনে ছিলেন বা কোনো কারণে এটা মিসিং হয়ে গেছে। এটা নরমাল কমপ্লিকেশনের মধ্যে পড়ে। কিন্তু পরে রোগী যখন আবার যোগাযোগ করছে তখন তিনি রোগীকে গুরত্ব দেয়নি, এটা হচ্ছে ভুল। রোগী যখন বলেছে তার সমস্যা হচ্ছে তখন রোগীর প্রতি ওনার সিমপ্যাথি দেখানোর দরকার ছিল। ওনার সিরিয়াল নিতে পারেনি, অন্য হাসপাতালে গেছে, অনেক কষ্ট পাইছে, একটা মিস ম্যানেজমেন্ট হয়েছে, এটার জন্য রোগীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে সিমপ্যাথি দেখানোর দরকার ছিল। আমাদের এখানে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টা তো এখনো ভালোভাবে তৈরি হয়নি। কিন্তু রোগীকে সিমপ্যাথি তো দেখানো যেতে পারে।’

অন্যদিকে এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে। ঘটনার বিবরণ লিখে একাধিক গ্রুপে পোস্ট দেন ভুক্তভোগীর স্বামী নাজিম উদ্দিন। তাতে মন্তব্যের ঘরে শত শত ভুক্তভোগীর অভিযোগ এ ডাক্তারের বিরুদ্ধে। সেখানে ডা. তৌফিকুর নাহার মোনার সাথে ঘটে যাওয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন অনেক ভুক্তভোগী। কেউ কেউ বলছেন, অল্প সময়ে পরিচিতি বাড়ার কারণে এ ডাক্তার রোগীর সাথে দুর্ব্যবহার করছেন।

ফারজানা আরা সৌরভী নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ওনার মুখের যে ব্যবহার, সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয় যাবে।’ রবিউল হোসাইন নামের একজন লিখেছেন, ‘শতকরা ৯৫ শতাংশ রোগী এই তথাকথিত মোনার কাছে দ্বিতীয়বার যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দেয়। কারণ মোনার ব্যবহার এবং অহংকার।’ আল সিয়াম নামে একজন লিখেছেন, ‘ডাক্তারের এই ভুলের কারণে আমার ছোট ভাইয়ের বউ মারা গেছে। তিন ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের বয়স ছিল মাত্র একমাস।’ রাজীব কুমার দে নামের একজন লিখেছেন, ‘দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও জরুরি প্রয়োজনে সিরিয়াল ছাড়া পরামর্শ না পাওয়াটা দুঃখজনক!’