শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

রেলক্রসিংগুলো কি অরক্ষিতই থেকে যাবে?

প্রকাশিতঃ ১ অগাস্ট ২০২২ | ১০:২৫ পূর্বাহ্ন


শরীফুল রুকন : রেলের লেভেল ক্রসিংয়ের গেটকিপারকে বলা হয় ‘গেট পাহারাদার’। কিন্তু বেশিরভাগ লেভেল ক্রসিংয়ে এই গেট পাহারাদার নেই। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। এসব ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। আরও আছে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সড়কে। আবার বৈধ ৬৩২টি রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই।

সব মিলিয়ে দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত। যার কারণে এক প্রকার ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে ক্রসিংগুলো। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা; হতাহতের ঘটনা। রেলের হিসাবে, ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ২২১ জন (রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যুর হিসাব ছাড়া)। এর মধ্যে ১৮৭ জনই প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে। অর্থাৎ রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানি ৮৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

গত শুক্রবার চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের অদূরে খৈয়াছড়া ঝরনা লেভেল ক্রসিংয়ের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যুর পর রেলক্রসিংয়ের মরণফাঁদের বিষয়টি আবার সামনে এলো। যদিও বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের কাছের এই রেলক্রসিং একটি প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি উন্নয়ন করা হয়েছে। পাহারাদারের বেতন দেওয়া হচ্ছে প্রকল্প থেকেই। পাহারাদার ও প্রতিবন্ধক থাকার পরও দুর্ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খোদ রেলকর্মকর্তাদের মধ্যেও। এ ঘটনার পর পাহারাদার সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

জানা যায়, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেনটি দুপুর দেড়টার দিকে ওই লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় মাইক্রোবাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে। ট্রেনটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিলে তা ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। ওই অবস্থায় প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে থামে ট্রেনটি। ঘটনার সময় লেভেল ক্রসিংয়ের বাঁশ (বার) নামানো ছিল কি না, দায়িত্বরত গেটম্যান সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না-এসব নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। মাইক্রোবাসের চালক কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে এ ঘটনার তদন্তে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

যে কোনো দুর্ঘটনায় একজন মানুষের হতাহত হওয়ার সঙ্গে বহু মানুষের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। প্রশ্ন হলো, আর কত মানুষ হতাহত হলে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে? লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো একটি দুর্ঘটনার পরই কর্তৃপক্ষ অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।

রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সাল থেকে রেলক্রসিংকে নিরাপদ করতে ১৯৬ কোটি টাকা খরচ করেছে রেলওয়ে। দুটি প্রকল্পের আওতায় রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ৭০২টি রেলক্রসিং উন্নয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৩২ জন। রেলক্রসিং উন্নয়নের মধ্যে প্রতিবন্ধক বসানো ও পাহারাদারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এরপরও রেলক্রসিং নিরাপদ হয়নি।

গত ২৪ জুলাই গাজীপুরে একটি লেভেল ক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ জন নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন অনেকে। আহতদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, গতিরোধক নামানো না থাকায় বাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে। এর দুদিন আগে ২২ জুলাই গোপালগঞ্জে নির্মাণাধীন ভবনের ঢালাইকাজ শেষে মিক্সচার মেশিন নিয়ে ১৪ জন শ্রমিক রেললাইন পার হচ্ছিলেন। সে সময় রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধাক্কা দিলে ভটভটিটি পাশের খাদে পড়ে যায়। পাঁচ শ্রমিক নিহত হন।

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী থানার ঝাউতলা এলাকায় ডেমু ট্রেনের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্যসহ তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সেই ক্রসিংয়ে গেটম্যান ছিলেন। তবে ট্রেন যাওয়ার আসার সময় তা খোলা ছিল।

এমন অবস্থায় রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান নেই। উল্টো যানবাহনের চালককে দায়ী করে রেল কর্তৃপক্ষ। বড়জোর পাহারাদারের ভুল পেলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু রেলে পাহারাদারের সংকট থাকায় কদিন পরেই আবার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হয়। এছাড়া, প্রতিটি রেল দুর্ঘটনার পর এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়। প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই। তাছাড়া সুপারিশ অনুযায়ী নেওয়া হয় না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ।

অভিযোগ আছে, এ নিয়েও চলে অবৈধ বাণিজ্য। কমিটি যাদের দায়ী করে, তাদের অনেকে ঊর্ধ্বতন অসাধু কর্মকর্তার কাছে ছুটে গিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে শাস্তি কমিয়ে আনেন। অভিযোগ আছে, রেলের নিজস্ব লোকজন দিয়েই অধিকাংশ সময় গঠন করা হয় কমিটি, যাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাঁধে দায় চাপানো যায়।

রেল আইন অনুযায়ী, নতুন রেললাইন তৈরি হওয়ার পর প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার দিন থেকে ১০ বছরের মধ্যে এর ওপর দিয়ে কোনো সড়ক গেলে তা সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রেলের। এরপর কোনো সড়ক নির্মাণ করা হলে সেই ক্রসিং সুরক্ষিত করার দায়িত্ব সড়ক নির্মাণকারী সংস্থার। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন একং সড়ক ও জনপথ বিভাগ এই সড়ক নির্মাণ করে। শুধু রেলওয়ে নয়, রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর দায় এ সংস্থাগুলোর একটিও নেয় না।

রেলওয়ে গত এক যুগে রেললাইন তৈরি ও কেনাকাটায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সওজ প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে। কিন্তু রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেউ দায়িত্ব নিতে চাইছে না।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পাহারাদারের চাকরি স্থায়ী নয়। প্রকল্পের অধীনে সর্বসাকল্যে ১৪ হাজার টাকার মতো তাঁদের বেতন। ২০১৫ সালের পর দুটি প্রকল্পের অধীনে তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প শেষ হলে বেতন থাকবে না। এ জন্য শুরুতে নিয়োগ পাওয়া অন্তত ৩০০ পাহারাদার চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। অস্থায়ী চাকরি বলে তাদের প্রশিক্ষণেরও খুব একটা ব্যবস্থা নেই। ফলে অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে ক্রসিংগুলো।

রেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ পর্যন্ত রেলে যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে এবং চলমান যে বরাদ্দ আছে, এর ১ শতাংশের কম বিনিয়োগ করলেও রেলপথ নিরাপদ হয়ে যায়। রেলপথ সুরক্ষার লক্ষ্যে এই খাতে বিনিয়োগ জরুরি। কিন্তু রেলের কর্মকর্তাদের এসব প্রকল্পের দিকে মনোযোগ নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সব রেলক্রসিং পর্যায়ক্রমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় আনতে হবে। সব ক্রসিংয়ের দুই পাশে তিনটি করে ছয়টি গতিরোধক বসাতে হবে। প্রতিটি ক্রসিংয়ে ফ্লাশিং লাইট বসাতে হবে, যাতে ট্রেন এলে জ্বলে ওঠে। ক্রসিংয়ে ঘন্টা বসাতে হবে, যা ১০০ ডেসিবেল শব্দ সৃষ্টি করে। এসব না করে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রেখে রেল দুর্ঘটনা কমার আশা করা অর্থহীন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘লেভেল ক্রসিংয়ে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে সেসব ঘটনার তদন্ত করা হয়। তদন্তে কারও অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় শাস্তি নেওয়া হয়। গত শুক্রবারের ঘটনায় তদন্তে কারও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা বন্ধে আমাদের সামনে দুটি উপায় রয়েছে। এর একটি হচ্ছে অবৈধ ও অরক্ষিত ক্রসিং একেবারে বন্ধ করে দেওয়া। আরেকটি হচ্ছে সব ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া। তবে বর্তমানে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে, তা কমিয়ে আনতে হলে গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে গেটম্যান নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হবে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলো।’