
একুশে প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই মাসের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দমনে চড়াও হয় প্রশাসন। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সশস্ত্র হয়ে হামলা চালায় শিক্ষার্থীদের উপর। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এই শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদের বদলে উল্টো বিরোধিতায় নামেন। শিক্ষকদের নানামুখী চাপে অসহায় হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তাদের এ দু:সময়ে ত্রাতারূপে আবির্ভূত হন গুটি কয়েক শিক্ষক। তারা প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের ‘সুরক্ষা ঢাল’ হিসেবে।
এই শিক্ষকদের উপর তখন নেমে আসে হুমকি, নির্যাতন। এই শিক্ষকদের কয়েকজনের বাসায় বোমা হামলাও চালায় ছাত্রলীগ। আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাদের বিরুদ্ধে চলে হুমকি, অপবাদ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এই শিক্ষকদের উপর মানসিক চাপ তৈরি করতে থাকে। শুধু তাই নয়, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এই শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করার জন্যও দাবি তোলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোটা সংস্কার এবং ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে গত ১ জুলাই বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে চার দফা দাবি পেশ করেন তারা। এটি ছিল চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের প্রথম কর্মসূচি। এই কর্মসূচি চলাকালীন শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে ছাত্রলীগ হুমকি প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও উপাচার্যকে এ ঘটনায় অভিযোগ জানানো হলেও তারা কোনো সহযোগিতা করেননি। বরং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না করার ‘পরামর্শ’ দেন প্রক্টর অহিদুল আলম। প্রক্টর অফিস থেকে অহিদুল আলম শিক্ষার্থীদের বলেন, আন্দোলনে যদি কোনো হামলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে তার দায় শিক্ষার্থীদেরই নিতে হবে। প্রশাসন কোনো দায় নিবে না।
এ ঘটনার পরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তারা গঠন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্য নামে একটি প্লাটফর্ম। প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক হন অধ্যাপক ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত বর্তমান সিন্ডিকেট সদস্য ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান। তার সাথে এই প্লাটফর্মে যুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন, অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম, ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ, দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোজাম্মেল হক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহিদুল হক।
এই সাত শিক্ষক আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে পরদিন থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে থাকেন। তারা শিক্ষার্থীদের সমাবেশে অংশ নিয়ে বক্তব্যও রাখেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি দাবি জানাতে থাকে। এই শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলন থেকে সরে আসার আহ্বান জানায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর শিক্ষকদের কল দিয়ে জানান, যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য শিক্ষকদের দায়ী থাকতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রক্টর ও পুলিশ প্রশাসনের এই চাপের মুখেও এই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিতে থাকেন।
১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের আইন সম্পাদক খালিদ হোসেনের নেতৃত্বে এ হামলায় অংশ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মচারীও। ক্যাম্পাসে প্রক্টরের অফিসের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে পিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমানকে গুরুতর জখম করে।
এই হামলার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক শামীম উদ্দিন খানের নেতৃত্ব শিক্ষকরা শহরের আন্দোলনেও সহযোগিতা শুরু করেন। তারা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানান৷
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তীব্রতার মধ্যে ৩০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ ক্যাম্পাস এলাকায় এই শিক্ষকদের অন্যতম প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান ও দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোজাম্মেল হকের বাসায় বোমা হামলা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শৈবাল ইসলাম মাসুদ, আবু বকর তোহা ও ছাত্রলীগ নেতা আবির ইকবালের নেতৃত্বে রাত আনুমানিক ২টার দিকে এ হামলা চালানো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এ হামলায় ১০-১৫টি মোটরসাইকেল যোগে ওই এলাকায় যায় হামলাকারীরা।
ওই হামলার পরদিন ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও এই শিক্ষকরা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার নির্দেশে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান আন্দোলন উজ্জীবিত করতে কবিতাও রচনা করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী শেয়ার করেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফের বক্তৃতা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনমুখী রাখতে অনুপ্রাণিত করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের নেতৃত্বে শিক্ষকরা আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ছিলেন। তাদের উপর নানা নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। বাসায় বোমা হামলা চালালেও শিক্ষকেরা ভীত না হয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হাজারো শিক্ষকের মাঝে এই শিক্ষকরা ছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে ত্রাতা স্বরুপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. রফিক বলেন, অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খানের নেতৃত্বে এই শিক্ষকেরা যদি শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়াতেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতো ছাত্রলীগ ও প্রশাসন৷ এই শিক্ষকদের সাহসী ভূমিকাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের কালো থাবা থেকে রক্ষা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এই শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞ।