শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতকারী কমছে, বাড়ছে খেলাপি ঋণ

| প্রকাশিতঃ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ৮:৫২ পূর্বাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এনবিএফআই) ব্যাংকের তুলনায় বরাবরই আমানতের সুদের হার বেশি থাকে। সুদহার বাজারভিত্তিক হওয়ার পর এই খাতে সুদের হার আরও বেড়েছে, তবুও আমানতকারীদের আকৃষ্ট করতে পারছে না এসব প্রতিষ্ঠান। বরং বিদ্যমান আমানতকারীরাও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের আমানত সরিয়ে নিচ্ছেন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন – এই তিন মাসেই ৪৮ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিগত আমানতকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেছেন। যদিও একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার বেড়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এই তিন মাসে আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার কমেছে। এমনকি গত এক বছরে এই সংখ্যা ৮৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই তথ্য জানা গেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে এক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পিপলস লিজিংসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের অনিয়ম, জালিয়াতি এবং যোগসাজশের মাধ্যমে নামে-বেনামে ঋণ তুলে নেওয়ার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক আগেই কমে গিয়েছিল। এছাড়াও, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের আমানত প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যক্তি গ্রাহকরা তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন, যার ফলে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তবে, একই সময়ে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের আমানত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জমা করছে, যার কারণে সামগ্রিক আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬১টি। চলতি বছরের জুন মাস শেষে এই সংখ্যা কমে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মোট আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৮৮ হাজার ৩২৪টি কমেছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের হিসাব সংখ্যা কমেছে ৬৪ হাজার ৭৩৭টি এবং মহিলা আমানতকারীদের হিসাব কমেছে ২২ হাজার ৫১৫টি। একই সময়ে, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের মধ্যে পুরুষদের হিসাব সংখ্যা ১ হাজার ৭৭৩টি কমেছে, তবে মহিলাদের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব সংখ্যা ৭০১টি বেড়েছে।

প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে, গত মার্চ মাসে এই খাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার ৩৪১ জন। তাই, গত তিন মাসেই আমানতকারী হিসাবের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৬০৪টি কমেছে। এই সময়ের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারী হিসাব কমেছে প্রায় ৪৮ হাজার ৬৬৩টি। এর মধ্যে পুরুষ আমানতকারী ৩৮ হাজার ৩১৫ জন এবং মহিলা আমানতকারী ১০ হাজার ৩৪৮ জন। তবে, এই তিন মাসে পুরুষ ও নারী প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী হিসাব বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৯টি। এর মধ্যে পুরুষ প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী হিসাব ৯৬৯টি এবং মহিলা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী সংখ্যা ৯০টি।

বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি সরকারি মালিকানাধীন, ১২টি দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন এবং বাকি ২০টি দেশীয় ব্যক্তি মালিকানাধীন। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থায় আছে, বাকি প্রায় সবগুলোই আর্থিক সংকটে ভুগছে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতেও অক্ষম হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আমানতের পরিমাণ ২০২৩ সালের জুন মাসে ৪৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা থেকে চলতি বছরের জুনে সামান্য বেড়ে ৪৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এক বছরে আমানত বৃদ্ধি মাত্র ৪৩৩ কোটি টাকা, যা খুবই সামান্য। প্রতিবেদন আরও উল্লেখ করে যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের বেশিরভাগই ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত, যার পরিমাণ ৯২.৫১%। অন্যান্য বিভাগের তুলনায় এটি অনেক বেশি।

গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৭২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল, যা চলতি বছরের জুনে বেড়ে ৭৪ হাজার ৫২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে, আমানত বৃদ্ধির তুলনায় ঋণ বিতরণের এই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

আর্থিক অনিয়মে জর্জরিত এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৩ হাজার ২০৮ কোটি ৭০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ।