
দেশের অন্যতম ক্রাইমজোন হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে আবারও অবৈধ অস্ত্রের আস্ফালন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ের গহীনে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ কারখানায় দিনরাত তৈরি হচ্ছে প্রাণঘাতী সব আগ্নেয়াস্ত্র, যা ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ছাড়িয়ে খোদ রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত। দাগি সন্ত্রাসী ও অস্ত্র কারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এই দ্বীপ। সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসে এবং স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি কালারমারছড়ার ছামিরাঘোনা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী আনছারের একটি ভিডিও কলে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এতে তাকে সহযোগী তারেক ডাকাতের সঙ্গে একাধিক ভারী অস্ত্র নিয়ে ডাকাতি ও সংঘর্ষের পরিকল্পনা করতে দেখা যায়। এই ভিডিও প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
গত ১৯ আগস্ট রাতে কালারমারছড়ার কাউল্ল্যার ব্রিজ এলাকায় পুলিশ সাড়াশি অভিযান চালিয়ে ডাকাত সর্দার উকিল আহমেদকে একটি দেশীয় এলজি বন্দুকসহ আটক করে। তবে অভিযানের খবর পেয়ে মূল হোতা তারেক ডাকাতসহ অন্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর পরদিন, ২০ আগস্ট কোস্টগার্ড ধলঘাটা ইউনিয়নের পানির ছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ফারুকুল ইসলামকে চারটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও আট রাউন্ড কার্তুজসহ গ্রেফতার করে। তবে বারবার অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ায় অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় সূত্র মতে, মহেশখালীর কালারমারছড়ার ফকিরজুম পাড়া, নোনাছড়ি, আঁধার ঘোনা এবং শাপলাপুর ইউনিয়নের জেমঘাটসহ বড় মহেশখালীর বড় ডেইল পাহাড়ে অন্তত পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ অস্ত্র তৈরির কারখানা সক্রিয় রয়েছে। পাহাড়ের গভীরে সুড়ঙ্গ কেটে ওয়ার্কশপের আদলে গড়ে তোলা এসব কারখানায় একনলা-দোনলা বন্দুক থেকে শুরু করে জি-ফোরের মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্রও তৈরি হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা পৌঁছানোর আগেই কারিগর ও সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়, ফলে মূল উৎস অক্ষত থেকে যাচ্ছে।
এই কারখানাগুলোতে তৈরি অস্ত্র স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার হচ্ছে। মহেশখালী-বদরখালী সংযোগ সেতু ব্যবহার করে সড়কপথে অথবা মাছ ধরার ট্রলারের আড়ালে সাগরপথে এসব অস্ত্রের চালান পাচার করা হয়। সম্প্রতি কোস্টগার্ড ও র্যাব যৌথ অভিযান চালিয়ে বদরখালী ফেরিঘাট থেকে পানের বস্তায় লুকানো সাতটি দেশীয় অস্ত্রসহ দুজনকে আটক করে। এর আগে নোয়াখালীতে পাচারের সময় আরও আটটি বন্দুক জব্দ করা হয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, মহেশখালীর অস্ত্র সারা দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে উসকে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় এসব অস্ত্র কারবারি ও সন্ত্রাসীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের সময় অস্ত্রের ব্যবহার এবং প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি এই অঞ্চলে নতুন নয়। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল অভিযান চালিয়ে এই ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব নয়। বারবার আত্মসমর্পণের নাটক সাজানো হলেও পাহাড়ের কারখানাগুলো বন্ধ হয়নি, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মনজুরুল হক জানান, অস্ত্রের কারিগর ও সন্ত্রাসীদের দমনে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। তিনি বলেন, “মূল কারখানাগুলো চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হবে। মহেশখালীকে অস্ত্রের কালো ছায়া থেকে মুক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
তবে প্রশাসনের আশ্বাসেও শঙ্কা কাটছে না সাধারণ মানুষের। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে সমন্বিত ও স্থায়ী পদক্ষেপের মাধ্যমে পাহাড়ের সব গোপন কারখানা ধ্বংস করতে হবে। অন্যথায়, মহেশখালী আবারও খুন, ডাকাতি আর রক্তের খেলায় মেতে ওঠা এক রক্তাক্ত দ্বীপে পরিণত হবে।