শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি: বান্দরবান জনস্বাস্থ্যে ‘মুজিব-সনদ সিন্ডিকেট’র দাপট!

রিজভী রাহাত | প্রকাশিতঃ ৩০ অগাস্ট ২০২৫ | ১১:০১ পূর্বাহ্ন


সরকারি চাকরিজীবী হয়েও এক দশক ধরে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। দফতরের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান এবং থানচি উপজেলা চেয়ারম্যানের সচিব সনদ কান্তি দাশ এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ সাধারণ ঠিকাদারদের।

তারা বলছেন, চাকরিরত এবং অবসরোত্তর ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই দুজন কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিচ্ছেন। সিন্ডিকেটের পছন্দের কাজ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল অন্য ঠিকাদাররা কাজের সুযোগ পান।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১০ বছর ধরে মুজিবুর ও সনদ এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। তাদের দাপটে লাইসেন্সধারী সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র কিনেও কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

একসময় জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য সনদ কান্তি দাশ তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর বাহাদুরের সুপারিশে থানচি উপজেলা চেয়ারম্যানের সচিব পদে নিয়োগ পান। যোগদানের পর থেকেই তিনি সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মিলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন বলে অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, থানচির বিভিন্ন পাড়ায় নলকূপ স্থাপন, পাহাড়ে জিএফএস পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং রিং ওয়েল খননসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ সনদ দাশ নামে-বেনামে পরিচালনা করতেন। প্রকৌশলী মুজিবুর অংশীদার হওয়ায় কাজের তদারকি ছাড়াই বিল উত্তোলনের সুযোগ ছিল বলে অভিযোগ তাদের। বিষয়টি জেলা ও উপজেলা অফিসের কর্মকর্তারা জানলেও সিন্ডিকেটের লাভের ভাগ পাওয়ায় সবাই চুপ থাকতেন। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে সনদ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দিতেন।

এভাবে গত দশ বছরে থানচি উপজেলায় প্রায় শত কোটি টাকার কাজ এই চক্রটি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, থানচিতে দায়িত্ব থাকলেও সনদ কান্তি দাশ বেশিরভাগ সময় জেলা শহরে অংশীদার মুজিবের সঙ্গে ঠিকাদারি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তার বিরুদ্ধে প্রায়ই অফিসে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

চলতি বছরের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় সনদকে আন্দোলন বিরোধী অবস্থানে প্রকাশ্যে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর নলকূপ স্থাপনের নামে স্থানীয়দের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সালিশও হয়, যা তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ধামাচাপা দেন বলে অভিযোগকারীরা জানান। এরপর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও তার ঠিকাদারি কার্যক্রম থেমে নেই।

এদিকে, মুজিবুর রহমান চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এই সিন্ডিকেটের প্রভাব আরও বেড়েছে। তিনি বর্তমানে বান্দরবান পৌর পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, যা নিয়ে খোদ অফিসের কর্মচারীদের মধ্যেই বিস্ময় তৈরি হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-কে ম্যানেজ করে তিনি এই পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ।

একজন ঠিকাদার জসিম বলেন, “জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশের বেশি কাজ মুজিব-সনদ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় এবং কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য আগাম টাকা দেওয়ায় ভালো কাজগুলো আগে তাদেরকেই দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, এই একচেটিয়া ব্যবসার মাধ্যমে তারা বান্দরবান শহরে একাধিক জমি, ফ্ল্যাট, বাগানবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সনদ কান্তি দাশের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একসময় ঠিকাদারি করার কথা স্বীকার করে বলেন, “আমি একসময় কাজ করতাম, এখন কোনো কাজ করি না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, তবে তিনি কোনো কাজ দেন না। বিভিন্ন প্রোগ্রামে তার সঙ্গে দেখা হয়।”

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে মুজিবুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “পরে কথা বলব।”

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।