
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের বেশি সময় পরও সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তাঁরা বলেছেন, তাদের ভূমিকা প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ‘সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশ’ আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের মতামতকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
সোমবারের ওই সংলাপে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে। সংস্কারের আশায় যারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন, তারা এখন হতাশ, কারণ প্রতিবেদন লেখার বাইরে কিছুই এগোয়নি।”
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, “সরকার ৮৪টি সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়—এই কথার মানে হলো, কেউ আপনাদেরকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেবে না।” তিনি বলেন, প্রকৃত সংস্কারের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগের মাধ্যমে যারা পরিবর্তন সম্ভব করেছে, তারাই আজ বাদ। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “গত ৫৪ বছরে ‘সংস্কার’ শব্দটি এতবার শুনিনি। কিন্তু ফল কী হয়েছে? বৈষম্য বেড়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে এবং সহিংসতা বেড়েছে। সরকারের অবস্থান এক অদ্ভুত উদাসীনতার।”
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বয়ে যাওয়া ঝড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার কি পথ হারিয়েছে? সংস্কার কমিটিগুলোর প্রস্তাবনা যেন মাঝপথ থেকে এগোতে পারছে না। এর পেছনে কি আকাঙ্ক্ষার অভাব, সক্ষমতার অভাব, নাকি বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত লুকিয়ে আছে?”
নারী অধিকার কর্মীরা সংলাপে সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, “আমরা সংবাদ সম্মেলন করেছি, বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কেউ কি আমাদের কথা শুনছে? প্রধান উপদেষ্টা যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসেন, তখন একজন নারীও উপস্থিত থাকেন না। তাহলে আমরা কি তথাকথিত নারীবান্ধব পুরুষদের ওপরই কেবল নির্ভর করব?”
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অনেক মতবিরোধ থাকলেও একটি বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য ছিল—নারীরা পাঁচ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত মনোনয়ন পাবেন না। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।”
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমাদের এখন অবশ্যই এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। নির্বাচনী সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে।”
অনুষ্ঠানে “বাংলাদেশ রিফর্ম ওয়াচ” নামে একটি নতুন উদ্যোগের সূচনা করা হয়, যা সংস্কার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে।