
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বুনো হাতির জন্য পাতা অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদে জড়িয়ে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হচ্ছে না।
নিহত জাহেদ খানের (২০) পরিবার প্রভাবশালী অভিযুক্তদের সঙ্গে বিষয়টি ‘আপস’ করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ বলছে, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় তারা মামলা নিতে পারছে না।
গত সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের খান বাড়ি পাহাড়ি এলাকায় গরু আনতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জাহেদ। তিনি ওই এলাকার আব্দুল হাফেজের ছেলে।
যে জমিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা হয়েছিল, তার মালিক মুরাদ বিন জাফর প্রকাশ বাবলু বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাহেদের দাফন সম্পন্ন হয়। এরপর তার বাবা আব্দুল হাফেজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, “আমি কার কাছে বিচার চাইব? কিছু বলার নেই আমার। আল্লাহ যা করেন, তাই দেখব।” তার কণ্ঠে ছিল একরাশ হতাশা ও অসহায়ত্ব।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অভিযুক্ত বাবলুরা এলাকার প্রভাবশালী। জাহেদের পরিবার গরিব ও দুর্বল হওয়ায় চাপ প্রয়োগ করে এবং কৌশলে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই তারা আর মুখ খুলছে না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মুরাদ বিন জাফরের ভাই মাসুদ বিন জাফর বলেন, “এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। আমরা তাদের (নিহতের পরিবার) সঙ্গে বসে বিষয়টি মিটমাট করে নিয়েছি।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আনোয়ারা থানার ওসি মনির হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, “খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে আসেনি। এ কারণে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে সুরতহাল প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ না পেলে পুলিশ নিজে থেকে হত্যা মামলা করতে পারে না। তবে আমরা বিষয়টি নজরে রেখেছি।”
এদিকে, আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আকতার জানিয়েছেন, তিনি ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছেন।
তিনি বলেন, “ঘটনার পরই আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বন বিভাগকে জানিয়েছি। বন বিভাগের একটি দল তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা রয়েছে।”
বন বিভাগের বাঁশখালী জলদি রেঞ্জের কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ বলেন, “বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার নামে এ ধরনের বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা ঘটনাটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মানুষ-হাতি সংঘাত: সংকটের গভীরতা
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আনোয়ারার এই ঘটনা চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে চলমান মানুষ-হাতি সংঘাতের একটি ভয়াবহ পরিণতি। বনভূমি উজাড়, হাতির আবাসস্থল ও বিচরণপথ (করিডোর) দখল করে জনবসতি নির্মাণ এবং বনে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় হাতি প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে। আর তখনই ফসল বাঁচাতে স্থানীয়রা অবৈধ বৈদ্যুতিক বেড়াসহ নানা ধরনের প্রাণঘাতী ফাঁদ পাতছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তী বাঁশখালী উপজেলাতেই গত ১০ বছরে দুটি রেঞ্জে অন্তত ১৭টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই মারা গেছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। এছাড়া গুলি, খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং পাহাড় থেকে পড়েও হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন বিভাগ মামলা বা জিডি করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। বিপন্ন এশীয় হাতি রক্ষায় তাদের দৃশ্যমান ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ নেই। হাতি ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে হাতির করিডোরগুলো দখলমুক্ত করা, বনায়ন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার বিকল্প নেই বলে তারা মনে করেন।