
ছাত্রজীবনে স্বপ্ন দেখতেন মানুষের সেবা করার। সেই স্বপ্ন পূরণে নিজের ১৫ বছরের সঞ্চয় দিয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মা-বাবার নামে দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলেছেন ফয়সল মুহাম্মদ ইউনুস নামে এক উদ্যোক্তা।
‘আহমদ সুফিয়া দাতব্য চিকিৎসালয়’ নামের এই প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে একদিন এলাকার গরিব ও দুঃস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীর পার্ক ভিউ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ফয়সলের এই মানবিক উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছেন সাতকানিয়া পৌরসভার মধ্য রূপকানিয়া ও এর আশেপাশের এলাকার শত শত মানুষ।
চলতি বছরের ২৩ মে সাতকানিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য রূপকানিয়া এলাকায় পৈত্রিক জায়গায় নির্মিত একটি ভবনে চিকিৎসালয়টির কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্বোধনের দিন ২৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রায় এক হাজার রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেন। এরপর থেকে প্রতি সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিয়মিত এই সেবা কার্যক্রম চলছে।
সম্প্রতি চিকিৎসালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখছেন। তাকে সহায়তা করছেন একজন নার্স ও দুজন সহকারী। রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ভবনের অন্য একটি কক্ষে এবং বাইরে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন নারী-শিশুসহ বহু মানুষ।
ছেলের চিকিৎসার জন্য আসা রহিমা বেগম বলেন, “চিকিৎসক খুব যত্ন করে আমার ছেলেকে দেখেছেন। কোনো টাকা নেননি, আবার প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে দিয়েছেন।”
প্রায় সাত কিলোমিটার দূর থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৬২ বছর বয়সী মমতাজ বেগম। তিনি বলেন, “অসুস্থতার কারণে আগে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারতাম না। এখানে তিনবার চিকিৎসা নিয়ে এখন আমি অনেক সুস্থ।”
এলাকাবাসী জানান, এই এলাকা থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। কাছাকাছি কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এই চিকিৎসালয়টি হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসার একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা পেয়েছেন তারা।
দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, “প্রতি সোমবার ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী আসেন। জ্বর, সর্দি-কাশিসহ সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনে দামি অ্যান্টিবায়োটিকও বিনামূল্যে দেওয়া হয়।”
এই উদ্যোগের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে ফয়সল মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, “ছাত্রজীবন থেকেই মানুষকে সেবা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। চাকরি ও ব্যবসার ১৫ বছর ধরে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছি। সেই জমানো টাকা দিয়েই মা-বাবার নামে এই চিকিৎসালয়ের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছি।”
ভবিষ্যতে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার অবর্তমানেও যেন এই চিকিৎসালয়ের কার্যক্রম চলমান থাকে, সেই চেষ্টাই করে যাব।”
ফয়সল ইউনুসের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী।
তিনি বলেন, “নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে গরিব-দুঃখীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার এমন নজির খুব কম। সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এভাবে এগিয়ে এলে অসহায় মানুষ আরও বেশি উপকৃত হবে।”