
দেয়াল আর ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, বেরিয়ে এসেছে মরিচা ধরা রড, সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুঁইয়ে পড়ছে পানি—এমন এক ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ডলু রাবারবাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় একশ কোমলমতি শিক্ষার্থী।
১৯৯৪ সালে নির্মিত স্কুলটির মূল ভবনটি ২০২৩ সালেই ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হওয়ায় সেই বিপজ্জনক ভবনের দুটি কক্ষেই চলছে পাঠদান। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিদিন থাকছেন চরম আতঙ্কে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ৩৩ শতক জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ হয়। কিন্তু ৩০ বছরের মাথায় এসে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় ভবনটি দ্রুত জরাজীর্ণ হয়ে যায়।
মূল ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণার পর একটি আধা-পাকা টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হলেও শ্রেণিকক্ষ সংকট কাটেনি। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৬ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। ১০ বছর ধরে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের পদ।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরাফাত ও তৃতীয় শ্রেণির ফারজানা জানায়, “বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। ছাদ থেকে প্রায়ই পলেস্তারা খসে পড়ে। প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে ক্লাস করতে হয়, কখন মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়ে এই আতঙ্কে থাকি।”

বিদ্যালয়ের পাশে বসবাসকারী অভিভাবক রুহুল আমিন বলেন, “ভবনটি এত ঝুঁকিপূর্ণ যে, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়। দীর্ঘদিনেও ভবনটি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সন্তানকে অন্য স্কুলে ভর্তি করানো ছাড়া উপায় থাকবে না।”
এদিকে বিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের পাশে হলেও এর কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের মাঠে খেলাধুলা করতে দেন না শিক্ষকরা। এ ছাড়া, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের কারণে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। আসবাবপত্রেরও রয়েছে তীব্র সংকট। এসব প্রতিকূলতার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে চান না, ফলে শিক্ষার্থী ভর্তির হারও কম।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জুবেদা খানম বলেন, “ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে ক্লাস নিতে হয়। এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। কক্ষ সংকটে একটি কক্ষেই দাপ্তরিক কার্যক্রমও চালাতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে টিনশেডের ঘরটিতেও পানি পড়ে। নতুন ভবনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হাসান মুরাদ চৌধুরী বলেন, “বিদ্যালয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আমরা জরুরি ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠাব।”
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বিদ্যালয়টির ভগ্নদশার বিষয়ে আমরা অবগত আছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হবে।”