শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

তিন চিকিৎসকের কাঁধে সোয়া লাখ মানুষের সেবা, ওষুধ-পরীক্ষায় ভোগান্তি

ছয় বছরেও শেষ হয়নি দীঘিনালা হাসপাতালের ভবন
জাকির হোসেন | প্রকাশিতঃ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ৭:৫৯ অপরাহ্ন


খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় সোয়া লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিজেই এখন ধুঁকছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, চরম জনবল সংকট এবং নতুন ভবনের কাজ ছয় বছরেও শেষ না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম।

উপজেলার ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২০১৯–২০ অর্থবছরে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদের পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন থেকে সরিয়ে নতুন ভবনের নিচতলায় আংশিকভাবে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ বছর আগে নির্মিত পুরোনো ভবনটির দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভেতরে পড়ে। অন্যদিকে ৫০ শয্যার নতুন ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় রোগীদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবির ট্রেডার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন (কেটি এমসি জেবি)। ২০২১ সালের এপ্রিলে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ হয়েছে মাত্র ৮৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানাও করা হয়েছে। নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে, আশা করা যাচ্ছে দুই মাসের মধ্যে বাকি কাজ শুরু হবে।

এদিকে অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাব। হাসপাতালে সাতজন মেডিকেল অফিসারের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী তাদের সামলাতে হয়। এছাড়া ১৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৭ জন। ৪৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। নেই মেডিসিন, সার্জারি, অ্যানেস্থেসিয়া, চর্মরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞ।

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. কেচিং মারমা বলেন, জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ রোগী দেখতে হচ্ছে। যেখানে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় বেড সংকটের কারণে অনেক সময় পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই রোগীকে ছাড়পত্র দিতে হয়।

সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এক্সরে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো জরুরি পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এক্সরে মেশিন ও ইসিজি থাকলেও টেকনোলজিস্ট, বিদ্যুৎ সংযোগ ও জায়গার অভাবে সেগুলো অচল পড়ে আছে। ফলে বাইরের ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করাতে এবং ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা বেগম বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ পেলেও বাকিটা বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ডাক্তার এক্সরে ও ইসিজি করতে দিলেও টাকার অভাবে তিনি তা করাতে পারছেন না।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগী নবমিত্র চাকমা বলেন, টয়লেটগুলো কেবিনের পাশে হওয়ায় দুর্গন্ধে টেকা দায়। চিকিৎসা পেলেও দুর্গন্ধে অসুস্থতা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তণয় তালুকদার বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও জায়গা না থাকায় মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে অসম্পূর্ণ ভবনের নিচতলায় ১৫টি বেডে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালের কার্যক্রম চললেও ওষুধের বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১০ শয্যার। ফলে সব রোগীকে ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে জরুরি রোগীদের জেলা সদর হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালে চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বদলে আছেন মাত্র একজন। জনবল সংকট ও মানুষের অসচেতনতার কারণে মাঝে মধ্যে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন, দীঘিনালায় স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে জনবল নিয়োগ, ওষুধ সংকট নিরসন ও দ্রুত ভবন নির্মাণের বিষয়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।