
ভূগৌলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ সময়চক্রের ভেতর প্রবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব এলাকায় গভীর ভূচ্যুতি বা ‘ফল্টলাইন’ থাকে, সেখানে সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ বছর পরপর মাঝারি কিংবা বড় আকারের ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের কম্পন ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকা এবং রাজধানী ঢাকার প্রস্তুতিহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত এক যুগে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তন এবং ঘনঘন কম্পন সেই বার্তাই দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ৪৮৫ বছরের তথ্যে দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা ও আশপাশে মাত্র ছয়টি ভূমিকম্প হলেও গত ১২ বছরে এই সংখ্যা দশে দাঁড়িয়েছে। আগে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকেন্দ্রিক থাকলেও সম্প্রতি তা মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দোহার ও নরসিংদীর দিকে সরে এসেছে।
বার্মা প্লেটের চাপ ও চট্টগ্রামের ঝুঁকি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর দেশের ১৩টি অঞ্চলকে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক কম্পনগুলো ঢাকার আশপাশে অনুভূত হচ্ছে, তবু ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চল অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এ বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণে জানান, এ অঞ্চলের ভূগর্ভে বার্মা প্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে আছে। সেখানে বিপুল শক্তি জমা হচ্ছে। এই শক্তি বা চাপ কখন কীভাবে মুক্ত হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে তাঁর মতে, হিসাব-নিকাশ বলছে ঝুঁকির মাত্রা সামনের দিকে ক্রমশ বাড়ছে এবং তা কমার কোনো লক্ষণ নেই। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকা এই প্লেট সীমানার কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের কম্পন ঢাকাকেও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
দীর্ঘ নীরবতা ও বড় আঘাতের শঙ্কা
ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সাল—এই ৬১ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৭-এর ওপরে পাঁচটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বড় কম্পন হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এই দীর্ঘ নীরবতাকে ‘বিপজ্জনক লক্ষণ’ হিসেবে দেখছেন। যেন ভূগর্ভে বড় একটি চাপ জমে আছে এবং তা বের হওয়ার পথ খুঁজছে। ২০২৪ সালে রেকর্ড হওয়া ৬০টি ভূমিকম্পের মধ্যে ৩১টি ছিল ৩ থেকে ৪ মাত্রার মধ্যে, যা পুরো অঞ্চলের অস্থির ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী অতীতের পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ১৮৬৯ সালে কাছাড়, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গল এবং ১৯২৩ সালে দুর্গাপুরে বড় ভূমিকম্পের পর ফাটল তৈরি হয়েছিল। সেই ফাটলগুলো এখন সুপ্ত অবস্থায় আছে এবং ভেতরে শক্তি জমা হয়েছে। ছোট ছোট কম্পনগুলো সেই সুপ্ত অংশগুলোকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ৭ মাত্রার কাছাকাছি ভূমিকম্প ১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ফিরে আসা একটি স্বাভাবিক চক্র। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই চক্রের গভীরেই অবস্থান করছে। ঢাকার ২৫ শতাংশ ভবন এমনিতেই ভূমিকম্প সহনশীল নয় বলে তিনি সতর্ক করেন।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নীতিমালার অভাব
ভূমিকম্পের ঝুঁকির পাশাপাশি উদ্ধারকাজ ও প্রস্তুতির বিষয়টিও অত্যন্ত নড়বড়ে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, দেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় আসলে কোনো সমন্বিত জাতীয় নীতিই নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কাজ চললেও একটি স্পষ্ট নীতিপত্র ছাড়া ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে নগর পরিকল্পনার কোনো কিছুই কাঙ্ক্ষিত পথে এগোচ্ছে না।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে ৩ হাজার ২০০টি ভবন চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তী সময়ে আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ঢাকার ছয় লাখ ভবনের দুই-তৃতীয়াংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানে না। এমনকি নতুন ভবনের ক্ষেত্রেও একই অনিয়ম দেখা যায়। উদ্ধারকাজের জন্য ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ২০১৫ সালে অনুমোদন পেলেও জনবল ও অনুশীলনের অভাবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
ঢাকার খোলা জায়গার সংকট
জনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে বড় দুর্যোগের সময় আশ্রয় নেওয়ার মতো জায়গার চরম অভাব রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুক্রবারের মতো বড় ভূমিকম্প বা দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে জনসাধারণের আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও খোলা জায়গার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আতঙ্কিত মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হন, তখন অধিকাংশ এলাকায় দাঁড়ানোর মতো ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নগর পরিকল্পনার মৌলিক ব্যাকরণ অনুযায়ী প্রতিটি এলাকায় হাঁটার দূরত্বের মধ্যে খেলার মাঠ বা খোলা জায়গা থাকা বাঞ্ছনীয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ৫০০ থেকে ৮০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে একটি গ্রিন স্পেস বা পার্ক থাকার কথা। অথচ ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় আগে যেসব খোলা জায়গা ছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে বেদখল বা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য চিত্র
‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’-এর তথ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। ১৮৮৫ সালে মধুপুর ফল্টে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছিল, গত ১৩৯ বছরে সেখানে বড় কোনো কম্পন হয়নি। যদি ওই রেখায় এখন ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও হয়, তবে ঢাকায় অন্তত ৮ লাখ ৬৪ হাজার ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দিনের বেলায় এমন দুর্যোগ ঘটলে মৃত্যু হতে পারে দুই লাখের বেশি মানুষের, আর রাতে ঘটলে সেই সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।