সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

সিঙ্গাপুরে বসেই ‘নির্দোষ’ আজিজ খান

শুনানিতে অনুপস্থিত, ঘোষণা ৩০০ কোটি ডলার নতুন বিনিয়োগের
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৯ মে ২০২৬ | ৩:৩৮ অপরাহ্ন


দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলব ছিল ১, ২, ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি। সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান হাজির হননি। হওয়ার কথাও ছিল না- কারণ তিনি এখন সিঙ্গাপুরের নাগরিক, সিঙ্গাপুরেই থাকেন, এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তিনি ইতিমধ্যে ত্যাগ করেছেন।

দুদকের নোটিশে স্পষ্ট লেখা ছিল— নির্ধারিত সময়ে হাজির না হলে ধরে নেওয়া হবে, অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই। আজিজ খান, তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খান, কন্যা আয়েশা আজিজ খানসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে ডাকা হয়েছিল অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বক্তব্য দিতে।

গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত তিন পর্বের অনুসন্ধান-সিরিজের সবচেয়ে কেন্দ্রীয় উপসংহার ছিল একটি বাক্যে: রাষ্ট্রের আইনি হাত সিঙ্গাপুরের কর্পোরেট দেয়ালে গিয়ে থামে। ফেব্রুয়ারির এই অনুপস্থিতি সেই উপসংহারেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

যেখানে রাষ্ট্রের হাত পৌঁছায়, যেখানে পৌঁছায় না

দেশের ভেতরে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ থেমে নেই। ২০২৫ সালের ৩ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আজিজ খান ও তাঁর পরিবারের লুক্সেমবার্গে বিনিয়োগ করা ৪১ লাখ ১৫ হাজার ৪১২ ইউরো (প্রায় ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার) জব্দের নির্দেশ দেন; প্রতিটি শেয়ারের দাম ৯১ ইউরো। আদালত একই সঙ্গে লুক্সেমবার্গের রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয়ে আদেশের কপি পাঠানোর নির্দেশ দেন, যাতে পাচারকৃত অর্থ জব্দ করে বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষিত হয়। এর আগে ৯ মার্চ ১৯১টি ব্যাংক হিসাব (৪১.৭৪ কোটি টাকা) এবং ১১ মার্চ ৩৮,৮০০ বর্গফুট জমি জব্দ হয়।

কিন্তু এই সবই বাংলাদেশের সীমানার ভেতরের, অথবা ইউরোপীয় বিচারিক সহযোগিতার ভেতরের সম্পদ। আজিজ খানের সম্পদের সিংহভাগ যেখানে- সিঙ্গাপুর, সেখানে বাংলাদেশের আদালতের সরাসরি এখতিয়ার নেই। দুদকের ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে চিহ্নিত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭১১ কোটি টাকা; ফোর্বসের ২০২৫ তালিকা অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদ প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার (১৩,৫০০ কোটি টাকা)। অর্থাৎ রাষ্ট্র এ পর্যন্ত তাঁর ঘোষিত সম্পদের আনুমানিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ চিহ্নিত করতে পেরেছে।

‘গোলাপের সুবাস নিয়ে বেরিয়ে আসব’

সিঙ্গাপুরে বসে আজিজ খান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি এবং তিনি তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা সরকারের যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করছি… কারণ আমরা জানি, আমরা গোলাপের সুবাস নিয়েই বেরিয়ে আসব।” তিনি দাবি করেন, তাঁর কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর- উভয় দেশের আইন মেনেই চলে।

এক ধাপ এগিয়ে, ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে, সিঙ্গাপুরে নিজের কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আজিজ খান ঘোষণা করেন, তিনি বাংলাদেশে আগামী বছরগুলোতে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবছেন। যদিও একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, চলমান তদন্ত তাঁর ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ-পরিকল্পনায় বিলম্ব ঘটিয়েছে।

এই দুই বক্তব্যের ভেতরেই সিরিজের তোলা মূল প্রশ্নটি আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। যিনি অভিযোগের জবাব দিতে দুদকের সামনে হাজির হন না, তিনিই সিঙ্গাপুরে বসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। তৃতীয় পর্বে আমরা দেখিয়েছিলাম, সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের এমডি ও সিইও আয়েশা আজিজ খান স্বীকার করেছিলেন, সিঙ্গাপুর-কাঠামোটি গড়া হয়েছিল ‘সিঙ্গাপুরের সুশাসন, আইন ও আর্থিক বাজার’-এ প্রবেশের জন্য। চার মাস পর সেই কাঠামোই দেখিয়ে দিল— তা শুধু পুঁজির প্রবেশপথ নয়, জবাবদিহি থেকে দূরত্ব বজায় রাখারও কার্যকর প্রাচীর।

যা এখনো ঝুলে আছে

বাংলাদেশের একটি ভিন্ন সমস্যাও এই প্রসঙ্গে সামনে আসে। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে আদালত দুদককে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের আবেদন জানানোর নির্দেশ দিয়েছিল; সামিটের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদক্ষেপ প্রতিবেদন প্রস্তুতির সময় পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

জাতীয় চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন (২৫ জানুয়ারি) সামিটকে “আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় আবির্ভূত ‘বিদ্যুৎ দানব'” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুদকের অনুসন্ধান এখনো চলমান। কিন্তু একটি বাস্তবতা স্পষ্ট: যত দিন আজিজ খান সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে সিঙ্গাপুরে থাকবেন, তত দিন বাংলাদেশের তলব একটি কাগজই থেকে যাবে- যার জবাব দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ তাঁর ইচ্ছাধীন।

চট্টগ্রামের শাহনাজ বেগম এখনো মাঝে মাঝে ভোরে মোমবাতি দিয়ে চুলার গ্যাস-চাপ পরীক্ষা করেন। দূরত্ব এখনো ১২০ কিলোমিটার। আর জবাবদিহির দূরত্ব- ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর।