চট্টগ্রাম: পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ৭জন, অস্ত্র সরবরাহ করেন একজন। সরাসরি অংশ নেয়াদের মধ্যে নবী ও রাশেদ পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। তবে মূল আসামি মুছা এখনো ‘নিখোঁজ’, যদিওবা তার পরিবারের দাবি গত ২২ জুন মুছাকে পুলিশ আটক করেছে। তবে গ্রেফতার হয়েছেন হত্যায় অংশ নেয়া ওয়াসিম, আনোয়ার ও শাহজাহান। এদিকে এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন মূল আসামি মুছার ভাই সাইদুল শিকদার ওরফে সাকু, অস্ত্র সরবরাহকারী এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা ও ভোলার সহযোগী মনির। পলাতক রয়েছে আসামি কালু। এতসব করার পরও হত্যার রহস্য ও খুনের নির্দেশদাতাকে তা জানাতে পারছে না পুলিশ। কার নির্দেশে মিতু হত্যা- তা নিয়ে পুলিশের কেউই মুখ খুলছে না।
এদিকে মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামি মনিরের তিন দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করা হয়েছে। এরপর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় মনির।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার এসআই মহিম উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম হারুন-অর-রশিদের আদালতে মনিরকে হাজির করা হয়। এরপর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি। জবানবন্দিতে মনির কি বলেছেন- জানতে চাইলে মহিম উদ্দিন বলেন, মিতু হত্যায় ব্যবহার করা অস্ত্রগুলো মনিরকে রাখতে দিয়েছিলেন ভোলা। মনির অস্ত্রগুলো শুধু হেফাজতে রেখেছে- এই তথ্য জানিয়ে সে জবানবন্দি দেয়।
এসআই মহিম উদ্দিন বলেন, মিতু হত্যায় অস্ত্র সরবরাহকারী ভোলাকে বৃহস্পতিবার থেকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে বাকলিয়া থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গত ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে দুই আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার দিয়েছেন দুই ধরনের ‘তথ্য’। গত ২৪ জুন রাতে বাবুল আক্তারকে রাজধানীতে তার শ্বশুরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে টানা ১৫ ঘন্টা ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করে পুলিশ। এ নিয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় কৌতুহল। বর্তমানে মামলার গতি পথ কোন পথে? কে, কেন এ খুনের নির্দেশ দিয়েছিল? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তর মিলছে না পুলিশের দায়িত্বশীল কোন কর্মকর্তার কাছ থেকে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, খুনের কারণ উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না করার আগে পরিপূর্ণভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না কে? কেন মিতুকে খুন করেছে। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সময় লাগবে।
গত ৪ জুলাই দিনগত রাতে মিতু হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া নবী ওরফে নূরুন্নবী এবং মোঃ নূরুল ইসলাম রাশেদ ওরফে ভাগিনা রাশেদ পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ওইদিন রাত তিনটার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগরের একটি ব্রিক ফিল্ডে এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এসময় ডিবির তিন এএসআই আহত হয়েছেন বলে পুলিশের দাবি। কথিত এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর মিতু হত্যা মামলাটির পাশে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মিতু হত্যাকান্ডে অংশ নেয়ারা, ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ ছিলেন। এত সহজে তারা ধরা পড়বেন, এটা ভাবেননি। এমনকি হয়তো ’প্রভাবশালী’ কেউ আশ্বস্ত করেছেন, তাদের কিছু হবে না। জঙ্গি হামলার স্টাইলে হামলা চালালে তারা ধরা পড়বেন না। বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হবে। তবে বাস্তবে পরিকল্পনাকারীদের চিন্তার উল্টোটাই হয়েছে।
এদিকে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ মুছার পরিকল্পনা ও নির্দেশনাতেই খুন হন মিতু। ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। নির্বিঘেœ অপারেশন চালাতে গোপন রাখা হয় মিতুর পরিচয়। খুনিদের কাছে ‘জঙ্গিনেত্রী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মিতুকে। খুনের আগে ভাড়াটে ব্যক্তিদের নিয়ে পরিকল্পনা বৈঠকও করেন মুছা। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫জুন ছেলেকে স্কুলে নেওয়ার পথে মিতুকে খুনে মুছা, ওয়াসিম ও নবী সরাসরি অংশ নেয়। প্রথমে মিতুকে সামনে ও পেছন থেকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন নবী। খুনের সময় ঘটনাস্থলে রেকি করেন আনোয়ার। এ সময় ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন রাশেদ, শাহজাহান ও কালু।
গুলি করার বর্ণনা দিয়ে আনোয়ার আদালতে জানিয়েছেন, মিতুকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে ওয়াসিম। অন্যদিকে ওয়াসিম আদালতে জবানবন্দিতে বলেন, গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন মুছা। এছাড়া কার ছকে বা নির্দেশে মিতুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন মুছা, তা স্পষ্ট হয়নি তাদের জবানবন্দিতে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকান্ডের সমন্বয়কারী মুছাকে পেলে সকল রহস্যের অবসান হবে। সেই মুছার কোন ‘খোঁজ’ নেই। গত ৪ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেন, গত ২২ জুলাই বন্দর এলাকার একটি বাসা থেকে মুছাকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে অংশ নেয়াদের মধ্যে বন্দর থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম এবং পুলিশ পরিদর্শক (ইমিগ্রেশন) নেজাম উদ্দিনকে চিনতে পেরেছেন বলেও জানান মুছার স্ত্রী।
মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান চলছে। তদন্তে অগ্রগতি আছে। সঠিক পথেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি। কিন্তু সবকিছু এখনই বলার মতো সময় আসেনি।