চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে চার মাস আগে নিখোঁজ আওয়ামী লীগ নেতার মেধাবী ছেলে এথন জঙ্গি দলের সদস্য! তার নাম সাব্বিরুল হক কণিক (২২)। তিনি চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকনোমিক অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র। কণিকের বাবা আজিজুল হক চৌধুরী রাশেদ চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুমছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদ্যগত সভাপতি। চাচা প্রয়াত মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাবুলও বরুমছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।
কণিক কোথায়, কোন জঙ্গী দলে আছেন সেটি জানা না গেলেও ফেসবুক আইডি এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথন থেকে তার জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিবারের কেউ কল্পনা করেননি সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি জঙ্গি হয়ে ওঠবে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সাব্বিরুল হক কণিক গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে ২০১০ সালে এসএসসি এবং ২০১২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এইচএসসির পর চট্টগ্রামের চকবাজারে জামায়াত-শিবির পরিচালিত রেটিনায় কোচিং করতে গিয়ে হঠাৎ করে কণিকের কথাবার্তা, চালচলনে পরিবর্তন দেখা দেয়। এরপর চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানাধীন রাহাত্তার পুলে অবস্থিত মাইকবিহীন মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করেন। এখানেই মূলত আমূল পাল্টে যান কণিক। বলতে থাকেন তিনি ছাড়া স্বজন-শুভার্থী কারো ধর্মকর্ম শুদ্ধ নয়। অনৈতিক, অনৈসলামিক বলেও কাছেরজনদের গালমন্দ করতেন থাকেন।
তবলিগের কথা বলে মাঝে মাঝে সপ্তাহ-দশ দিনের জন্য উধাও হয়ে যেতেন। বছর খানেক আগে একবার তিনমাসের জন্য নিরুদ্দেশ থাকার পর বাসায় ফিরে আসেন। সর্বশেষ গত চার মাস আগে রাউজানে এক বিয়েতে যাবার কথা বলে বাবার কাছ থেকে পাঁচশ টাকা নিয়ে বের হন। সেই থেকে নিখোঁজ কণিক। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না থাকায় সন্তানের আশা একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছিলেন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা। সন্তান নিজেই বিপথগামী হয়েছেন বুঝতে পেরে নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরি করারও প্রয়োজন মনে করেন নি তারা।
সম্প্রতি ’আইডি নাম্বার দুই’ নামে ফেসবুকের একটি ফেইক আইডি থেকে তার ছোটভাই অনিক ও চাচাত বোন আনজুমানের ইনবক্সে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছেন, ঠুকঠাক কথা বলছেন কণিক, বলছেন তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্ত কোথায় আছেন, কেমন আছেন কিছুই বলছেন না। অনিক আর আনজুমানের সঙ্গে চ্যাটিংয়ের বিষয়গুলো তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কণিকের এক নিকটাত্মীয় বলেন, তার কথাবার্তায় কেমন জানি পরিবর্তন, আওলাঝাওলা ভাব। তাদের কাছে জানতে চাইছেন, তার প্রয়াত চাচা মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাবুল কেমন আছেন।
ওই আত্মীয় আরো জানান, কণিক ছোটবেলায় ডানপিটে, প্রাণবন্ত স্বভাবের ছিল। ভাইবোন-কাজিনদের প্রত্যেকের তিনি আলাদা আলাদা নামে ডাকতেন। ইনবক্সে আনজুমান তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে কাকে কী নামে ডাকতেন সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে বললে কণিক কিছুই মনে করতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে কথা হয় কণিকের চাচাত ভাই ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বাপ্পার সঙ্গে। একুশে পত্রিকাকে তিনি জানান, কণিক ২০০৮ সালে নাইনে পড়ার সময় ‘আমগো সাব্বির দা’ নামে একটি ফেসবুক আইডি খোলে ব্যবহার শুরু করে। গত দুইবছর ধরে সে সেটি ইনেকটিভ করে রাখে। সম্প্রতি ‘আইডি নাম্বার দুই’ নামের একটি আইডি থেকে ভাইবোনদের সাথে সে কথা বলছে বলে আমিও শুনেছি। তবে এই আইডি কার, কোত্থেকে সে ব্যবহার করছে তা জানা মুশকিল।
এদিকে ফেসবুকে গিয়ে দেখা যায়, ‘আইডি নাম্বার দুই’ কোরআন-হাদিছের আলোকে নানান স্ট্যাটাস ভরে গেছে। সর্বশেষ এটির ব্যবহার হয়েছিল ২০১৪ সালে। এই আইডিতে অস্ত্র তাক করা এক জঙ্গির ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। আছে পোশাকধারী কিছু মানুষের লাশ বহন করা এবং উট দৌড়ের ছবি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে ‘আইডি নাম্বার দুই’ এর পাশে ব্র্যাকেটে আস-সাব্বিরুল হক লেখা আছে উর্দুতে। স্বজনসহ ফেসবুক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আইডি আর কারো নয়, সাব্বিরুল হক কণিকের। তার মূল আইডি ‘আমগো সাব্বির দা’ বন্ধ করার পর দুই বছর আগে এই ফেইক আইডিটা খোলেন কণিক। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময়টাতেই পুরোপুরি জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
এ ব্যাপারে কণিকের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুল হক চৌধুরী রাশেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বিষয়টি সংবাদকর্মীদের কানে কী করে এলো জানতে চান। কণিক কোথায় আছে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, জানি না। জানি সে চারমাস ধরে নিখোঁজ। ভয়, শঙ্কা আর লজ্জায় এ ব্যাপারে এতদিন জিডি করেন নি জানিয়ে আগামী শনিবার থানায় জিডি করবেন বলে জানান তিনি।