মামুনুল হক চৌধুরী : মাদকব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৬ বছরেই শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন মো. ইউছুফ নামের এক যুবক। একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে মাদকসহ ১২ টি মামলা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সম্প্রতি অনুসন্ধানে নামে একুশেপত্রিকাডটকম। উঠে আসে মাদকসম্রমাট ইউছুফের মাদকব্যবসা করে শতকোটি টাকার মালিক হওয়ার বিস্ময়কর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা দাউদকান্দি থানার ইলিয়টগঞ্জের মোবারকপুর (মুন্সীবাড়ি) গ্রামের চারু মিয়া অল্প বয়সে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে এসে কুলির কাজ নেয়। বাবার সহযোগী হিসেবে কুলির কাজ করতে গিয়ে একটা সময় স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ছিঁচকে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন ইউছুফ। ২০১০ সালে মাদকে হাতেখড়ি ইউসুফ এখন মাদকের পাইকার বিক্রেতা। মাত্র ৬ বছরের ব্যবধানে মাদকের সম্রমাট। হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি এলিয়ন ব্রান্ডের ৪৮ লাখ টাকা মুল্যের প্রাইভেট কার (একটি নম্বর চট্টমেট্রো-গ-১২-১৪৪৬), ৬টি কাভার্ড ভ্যান, ৩টি টাটা ট্রাক, কদমতলী পুড়া মসজিদ সংলগ্ন সাত গন্ডা জমির উপর নির্মাণাধীন ১০ তলা বিল্ডিং, কদমতলীতে জাহাঙ্গীরের বাড়ীতে ১টি ফ্ল্যাট, হালিশহর এক্সেস রোডে ৪ গন্ডা জমি, পটিয়া ধলঘাটে সাত কানি ধানি জমি, পটিয়া সদরে ৬ গন্ডা জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা নগদ টাকাসহ প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই ইউসুফ।
নগরীর বহুল আলোচিত মাদক আস্তানা বরিশাল কলোনীসহ নগরী ও জেলার ২৪৮টি মাদক পয়েন্টের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ইউসুফ। ফেনী, কুমিল্লা, টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা এনে পাইকারী দরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাদক বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে।
মাদকব্যবসা পরিচালনায় তার রয়েছে একটি বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে ফারুক ওরফে বাইট্টা ফারুক, বাইট্টা নাছির, সালেহ আহমদ, খালেক, টেক্সি জসিম, ইছাহাক, মতিন, রানা, টিপু, বেলাল ওরফে সোর্স বেলাল, মজিদ, লোকমান ওরফে লেংরা লোকমান, জাহাঙ্গীর, ক্যাশিয়ার মুসলিম, নিরাপত্তা আরএনবি সুনিল, শাকিল, ওয়াসিম, খসরু মিস্ত্রি, মাঈন উদ্দিন, শাহাবউদ্দিন, টুনা, মানিক, নাঈম, আসলাম, জীবন, ইকবাল, কালা লিটন, বিপ্লব, ফ্যাক্স লিটন, জামাই জসিম, পারুলী, গাল কাটা পারুলী, বেগুনী, শিরিন, আরজু।
২০১০ থেকে ২০১৫ এর মধ্যে নগরীর চান্দগাঁও, ডবলমুরিং, কোতোয়ালী থানার ১২টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ডবলমুরিং থানায় ৬টি মাদক মামলাসহ পুলিশের উপর হামলার অভিযোগের ১টি, চান্দগাঁও থানায় অপহরণের অভিযোগে ১টি, চুরি, ছিনতাই, হত্যা চেষ্টার অভিযোগে কোতোয়ালী থানায় ৪টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ২০১০ সালে ১টি, ২০১১ সালে ৩টি, ২০১২ সালে ৩টি, ২০১৩ সালে ৩টি, ২০১৪ সালে ১টি, ২০১৫ সালে ১টি মামলা দায়ের হয় তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি পলাতক।
সচেতন মহলের অভিমত, ইউসুফের বিরুদ্ধে মাদক আইনের দায়ের হওয়া সবকটি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। কিন্তু তার মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদ মাদক আইনের ৩৫ ক ধারায় বাজেয়াপ্ত করার জন্য এবং ৪৬ ও ৪৭ ধারায় সম্পদ জব্দ ও হস্তান্তর স্থগিত করার জন্য প্রতিবেদন দাখিল করেন নি তদন্ত কর্মকর্তারা। ফলে মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে ব্যবসার প্রসার ও অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ছেন ইউসুফ। ওই সব অর্থে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অপরাধ জগত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইউসুফ।
মাদক সা¤্রাজ্যের তালিকাভুক্ত ইউসুফ প্রসঙ্গে সদরঘাট থানার ওসি মর্জিনা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইউসুফ সিএমপির তালিকাভুক্ত পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে সিএমপি সব কটি থানায় গ্রেফতারী পরোয়ানা আছে। আমরা তাকে খুঁজছি।’ তার অবস্থান সম্পর্কে কোন তথ্য থাকলে পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন ওসি মর্জিনা।
চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলী আসলাম ইউসুফকে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখ করে বলেন, তার সম্পদ সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করলে তা জব্দ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।