চট্টগ্রাম: ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। শনিবার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক মতবিনিময় সভায় এ অভিযোগ তোলা হয়।
ঈদ উপলক্ষে জেলা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে সকাল ১১টায় এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনার অনুপস্থিতিতে সভার সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) হাবিবুর রহমান।
সভায় আন্তঃজেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মনির আহমদ বলেন, চাঁদাবাজির উপর প্রশাসনের কড়া সিদ্ধান্ত থাকার পরও, তা চলছে। সরকারী দলের নাম ভাঙিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজি চলছে। জোর করে গরুর হাট-বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেই দলের সাথেই চাঁদাবাজরা জড়িত থাকুক না কেন, ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা চাঁদাবাজ মুক্ত মহাসড়ক চাই।
উত্তর চট্টগ্রাম ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, গরু পরিবহন করতে গিয়ে প্রত্যেক ট্রাককে চাঁদা দিতে হচ্ছে। তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় গরু প্রতি অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা দাম বাড়বে। কিছুদিন আগেও চাঁদা না পেয়ে আমাদের এক শ্রমিককে মেরে গাড়ি ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলে আমরা গরু পরিবহন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবো। বিভিন্ন পয়েন্টে ডকুমেন্ট চেক করার নামে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। প্রতিবারই পুলিশ এক হাজার টাকা করে আদায় করছে। না দিলে ৫-৬ হাজার টাকার একটা মামলা দিয়ে দিচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে আপাতত এটা বন্ধ রাখার দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে ঘরমুখী যাত্রীদের নির্বিঘœ যাতায়াতের জন্য ঈদের আগের তিন দিন ও পরের তিন দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি ও পচনশীল পণ্যবাহী গাড়ি এর আওতামুক্ত থাকবে। সভায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) হাবিবুর রহমান সরকারি এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চট্টগ্রাম অংশে পুলিশ সতর্ক থাকবে। হাইওয়ে পুলিশও একই সঙ্গে কাজ করবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে গাড়ির কাগজপত্র তল্লাশি বন্ধ থাকবে। পুলিশের কেউ নির্দেশনা না মেনে চাঁদাবাজি করলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হবে। কোন সংগঠন বা বাহিনীর নামে কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেব না। অনুমোদনহীন গরুর হাটের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা, পশুর হাটের নিরাপত্তা, পশুর চামড়া পাচার রোধ, ঈদ জামাততের নিরাপত্তা ও পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা বিষয়ে আমরা আলাদাভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। পুরো জেলাজুড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) নেতৃত্বে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হচ্ছে। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে ওই নিয়ন্ত্রণকক্ষে যোগাযোগ করতে পারবেন।
হাবিবুর রহমান বলেন, চার স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা থাকবে। এসব স্তরে ট্রাফিক পুলিশ, ডিবি পুলিশ, সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
ঈদে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় ও হয়রানি বন্ধের জন্য মালিকদের অনুরোধ জানিয়ে হাবিবুর বলেন, মালিকরা যদি আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে পথে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না এবং সড়কে পর্যাপ্ত যানবাহন আছে- তাহলে আমরা বাইরের কোনো গাড়ি চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে দেব না। অন্যথায় আমরা বাইরে থেকে চট্টগ্রামে গাড়ি প্রবেশ করিয়ে দেব।
সভায় চট্টগ্রাম জেলা ট্রাক কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুস ছবুর বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আগে দুই লাইন ছিল। সেসময় ঈদের আগে পরে ৬দিন মহসড়কে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল। এখন মহাসড়ক চার লেইন হয়েছে। এ অবস্থায় ভারী যান চলাচল ৬ দিন বন্ধ না রেখে ৪ দিন রাখা যায়। আমাদের এই প্রস্তাবটা সংশ্লিষ্টরা মানলে, সড়কে কোন সমস্যা হবে না। বরং পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা বাড়তি দুইটা দিন আয়-রোজগারের সুযোগ পাবে।
পরিবহন নেতা খোরশেদ আলম বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ লক্করঝক্কর গাড়িগুলো যাতে মহাসড়কে না আসে- সে ব্যবস্থা পুলিশকে নিতে হবে। সিটিতে চলাচল করা এই গাড়িগুলো দুরপাল্লার জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। পথিমধ্যে এসব গাড়ি বিকল হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) রেজাউল মাসুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মশিউদ্দৌলা রেজা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) একেএম এমরান ভ’ঁইয়া, নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক মীর নজরুল ইসলাম, বিভিন্ন থানার ওসি, পরিদর্শক (তদন্ত) সহ পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।