মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

বাসায় আটকে দেহব্যবসা, বিচারকের বিচক্ষণতায় পড়ল ধরা

প্রকাশিতঃ শনিবার, জুন ১৫, ২০১৯, ৪:০১ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: দুই নারীকে বাসায় আটকে রেখে যৌনকর্মী হিসেবে কাজে বাধ্য করছিলেন তিনজন। স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে তাদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। কিন্তু অধর্তব্য অপরাধে দুই ভুক্তভোগী ও এক খদ্দেরকে অভিযুক্ত করে তাদের ‘রক্ষার চেষ্টা’ করে পুলিশ। তবে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের বিচক্ষণতায় শেষ রক্ষা হয়নি।

মানবপাচার আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন- মূল অভিযুক্ত শেলী আক্তার (২৮) ও আবু কায়সার জাহাঙ্গীর বাবু (৩২) এবং খদ্দের মো. হৃদয় (১৮)।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার (১৪ জুন) জুমার নামাজের পর বাসায় ফেরার পথে চকবাজারের কাপাসগোলা এলাকার তাহেরা ফেরদৌস ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু মেয়ের চিৎকার-কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পান মুসল্লিরা। এরপর তারা দ্বিতীয় তলার ওই বাসায় প্রবেশ করে দুই নারীকে উদ্ধার করার পাশাপাশি এক নারীসহ তিনজনকে ধরে চকবাজার থানা পুলিশকে খবর দেয়।

চকবাজার থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচজনকেই নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে দুই ভুক্তভোগী নারী ও খদ্দের হৃদয়কে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) অধ্যাদেশের ৭৬ ধারায় অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে অধর্তব্য অপরাধে প্রসিকিউশন দাখিল করে আদালতে পাঠানো হয়। থানা থেকে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠে মূল অপরাধী শেলী আক্তার ও জাহাঙ্গীর বাবুকে। এর ফলে ভুক্তভোগী দুই নারী আইনী সুরক্ষা না পাওয়ার পাশাপাশি মূল অপরাধীরা রক্ষা পেতে যাচ্ছিলেন।

তবে বিচারক আল ইমরান খানের বিচক্ষণতায় সেটি সম্ভব হয়নি। মামলাটি শুনানিতে নিয়ে তিনি ভুক্তভোগী দুই নারী ও খদ্দের হৃদয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনেন।

ভুক্তভোগী দুই নারী আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জানান, শেলী ও জাহাঙ্গীর বাবুসহ তাদের চক্রের অধীনে নগরীর চকবাজার, দুই নাম্বার গেইট ও খুলশী এলাকায় তিনটি বাসা আছে। এসব বাসায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীদের ফুসলিয়ে বা ফাঁদে ফেলে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাদেরকে বন্দী রেখে, মারধর করে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়।

আদালতকে ভুক্তভোগী নারীরা আরো জানান, এসব বাসায় আসা খদ্দেররা প্রথমে ইয়াবা খেয়ে নেশাগ্রস্থ হয়। এরপর তাদের উপর পাশবিক যৌন নির্যাতন চালায়। তারা ইয়াবা সেবনের পর নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক করতে পারে বিধায় এসব চক্রের কাছে খদ্দের বেশী আসে।

পরে খদ্দের হৃদয়কে বিচারক আল ইমরান খান জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন, ভুক্তভোগী দুই নারীর বক্তব্য সঠিক। শেলী ও জাহাঙ্গীর বাবু আদালত প্রাঙ্গণেই আছে। জরিমানার বিনিময়ে দুই ভুক্তভোগী নারী ছাড়া পেলে তাদেরকে আবার দেহব্যবসার জন্য জোর করে নিয়ে যাওয়া হবে।

তাদের বক্তব্য শোনা ও লেখার পর বিচারক আল ইমরান খান পুলিশকে নির্দেশনা দেন, শেলী ও জাহাঙ্গীর বাবুকে পাওয়া গেলে আদালতে হাজির করার জন্য। কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাদের ধরে আদালতে হাজির করে। এরপর বিচারকের জিজ্ঞাসাবাদে তারা দেহব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগ স্বীকার করলেও কৌশলে অনেক বিষয় এড়িয়ে যায়।

সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আদালত জানায়, জোর করে দেহব্যবসায় বাধ্য করিয়ে শেলী আক্তার, আবু কায়সার জাহাঙ্গীর বাবু ও মো. হৃদয় মানবপাচার আইনের ১২ ধারাসহ অন্যান্য অপরাধ করেছেন। এরপর উক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি দুই ভুক্তভোগী নারীকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিতে আদেশ দেন বিচারক আল ইমরান খান। ঘটনার বিষয়ে মানবপাচার আইনে নতুন করে একটি মামলা রেকর্ড করার জন্য চকবাজার থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

এসব বিষয় নিশ্চিত করে আদালতে চকবাজার থানার জিআরও আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, মানবপাচার আইনে মামলা না করে ৭৬ ধারায় চালান দেওয়ার বিষয়টি আদালত সন্তোষজনকভাবে বিবেচনা করেননি। ফলে চকবাজার থানায় নতুন করে রেকর্ড করা মামলাটি তদন্তের জন্য উপযুক্ত কোন সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে সিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।