শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

বাংলাদেশ-কোরিয়ার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং সম্ভাবনার হাতছানি

প্রকাশিতঃ সোমবার, অক্টোবর ৭, ২০১৯, ৫:১৯ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে অন্য অনেক সময়ের তুলনায় বর্তমানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বেশ জোরালো। একটুখানি তথ্য-উপাত্ত ঘাটলেই এর সত্যতা মিলে। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে যেখানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানর পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ছিল ২৫৪ দশমিজক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা উন্নীত হয়ে ৩৭০ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে।

বাংলাদেশের ২০১৮-১৯ সালের রপ্তানির হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান ২১তম। তবে দক্ষিণ কোরিয়াতে বাংলাদেশের রপ্তানি আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়াতে রপ্তানি দ্রব্যের ক্ষেত্রে টেক্সটাইল পণ্যই সিংহ ভাগ জায়গা দখল করে আছে। রপ্তানির প্রায় ৮৫ ভাগই আসছে টেক্সটাইল জাতীয় পণ্য থেকে। তার সাথে রপ্তানি হচ্ছে মাছ, পাট, চামড়াজাত পণ্যসহ প্রায় ৩০০ রকমের পণ্য।

২০১৯ সালে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৮৭ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ৮৩২ দশমিক ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে টেক্সটাইল খাতে। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার টেক্সটাইল খাতের বিনিয়োগই পরবর্তীতে রপ্তানিজাত পণ্যের আকারে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে ঢুকছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার এমন অনকে ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে তা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে না এনে ৩য় কোনো দেশে রপ্তানি করছেন। ‌

আশার কথা হলো, ইদানীং কোরিয়ার আমদানিকারকরা বাংলাদেশের সিরামিক পণ্য, মৎস্য (যেমন : ইল ফিস, ক্র্যাব), বহুবিধ পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, নিত্য পারিবারিক ব্যবহার্য পণ্যের ক্ষেত্রেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। পুরো কোরিয়া জুড়ে ‘DAISO’ শো-রুমের প্রায় ১৩শ’ শাখা রয়েছে। যেখানে রয়েছে পারিবারিক প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য প্রায় সব পণ্যের বিশাল ও বাহারী সমারোহ। এই কোম্পানিও বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে আগ্রহী। কোরিয়াতে পলিথিন নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষিতে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ, কাগজের প্লেট, কাগজের কাপ, কাগজের প্যাকেট ইত্যাদি পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ ধরনের পণ্যের চাহিদা আগ্রহ বাংলাদেশের উৎপাদনকারীদের পণ্য বহুমুখী করণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিককালের চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিরোধের কারণে অনেক কোরিয়ার ব্যবসায়ীদের তাদের কারখানা ৩য় দেশে স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা করছেন এবং সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও তাদের বিবেচনায় আছে।

বিগত জুলাই, ২০১৯ মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী মি. লি নাক ইয়ন এর বাংলাদেশ সফরকালে কোরিয় বিজনেস ডেলিগেশনের বাংলাদেশ সফর ও সেমিনার এক্ষেত্রে বেশ জোরালো ভূমিকা রেখেছে। সে সময় এবং পরবর্তীতে দু’দেশের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন শহরে অবস্থিত আঞ্চলিক ও পণ্যভিত্তিক চেম্বারগুলোতে গিয়ে সেমিনার আয়োজন করে বাংলাদেশকে তুলে ধরার যে চলমান প্রচেষ্টা তাও এক্ষেত্রে একটা ধনাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশমুখী কোরিয়ান ব্যবসায়ীদের এ আগ্রহকে ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের কোরিয়ার পণ্য ভিত্তিক মেলাগুলোতে নিজেদের পণ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একই সাথে কোরিয়ার বসবাসরত বাংলাদেশী ব্যবসায়ীগণ বেশি করে কোরীয় ব্যবসায়ীদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে নিজেদের এ ব্যবসায়ে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ নিতে পারেন। অনেকদিন থেকে যেসব বাংলাদেশী কোরিয়ায় অবস্থান করার কারণে কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন তাদের পক্ষে কোরীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলা সহজ এবং অনেকে এ সুবিধার সুযোগ গ্রহণ করে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে ব্যবসায়ী কার্যক্রম শুরু করেছেন।

আশা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে এ প্রবণতা আরো বাড়বে এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়বে এবং একই সাথে কোরিয়াতে বাংলাদেশের রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ কোরিয়া যেহেতু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন র‌্যাংকিং (Innovation Index) এ প্রথম সারির দেশ তাই বাংলাদেশে কোরিয়ার বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত স্থানান্তর দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে কোরীয় বিনিয়োগকারীর জন্য বাংলাদেশে কর্তৃক ইইউ ও অন্যান্য দেশ হতে প্রাপ্ত জিএসপি সুবিধার সুযোগ নেয়া সম্ভবপর হবে। অর্থাৎ এটি দু’দেশের জন্যই Win-Win অবস্থা সৃষ্টি করবে। তাই আগামীতে এ দুটো দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো জোরালো হবে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

লেখক : কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইং), বাংলাদেশ দূতাবাস, সিউল