মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

চবি উপ-উপাচার্যের ঢাকায় এত কী কাজ?

| প্রকাশিতঃ ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৬:৩৪ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নিয়ম অনুযায়ী কোনো অফিসিয়াল কারণে উপাচার্য যদি একদিনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করেন তাহলে রেজিস্ট্রার দফতরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক অফিসে আগের দিনই চিঠি দিয়ে তা অবহিত করার রীতি রয়েছে। এ চিঠিতে কোন কাজে, কত দিনের জন্য অনুপস্থিত থাকবেন সে বিষয়টি উল্লেখ থাকে। কখন তিনি ফিরে আসবেন তার সম্ভাব্য সময়ও উল্লেখ থাকে ওই চিঠিতে। এবং এই চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সার্বিক জরুরি নির্দেশনাও প্রদান করা থাকে।

তবে ১৩ জুন নজিরবিহীনভাবে নিজে নিজে ‘উপাচার্য’ পদে যোগদান করা উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার এই নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না। তিনি কখনো কখনো চিঠি ইস্যু না করেই দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। একদিনের ছুটি নিয়ে সাতদিনও অনুপস্থিত থাকার নজির রয়েছে।

সবচেয়ে সমালোচনার বিষয়, চিঠি দিলেও তিনি কোন কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে উপস্থিত থাকছেন সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ থাকে না তাতে। ‘জরুরি কাজ’ উল্লেখ করেই দায় সারেন তিনি। তবে সরকারি কোনো মিটিংয়ে উপস্থিত হতে ঢাকায় গেলে তখন তার কারণ উল্লেখ করেন। কিন্ত এর বাইরে দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও তার কারণ হিসেবে ‘জরুরি কাজ’ বলেই চালিয়ে দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও গত ১২ সেপ্টেম্বর উপাচার্য দপ্তরের একটি নোটিশে ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে ‘জরুরী কাজে’ ঢাকা যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করে চিঠি ইস্যু করেন। ওই চিঠি অনুযায়ী ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার কথা। কিন্তু ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া গত ১৫ থেকে ১৭ অক্টোবর কার্যদিবসেও তিনি ঢাকায় ছিলেন। কিন্তু কেন তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কারো। ১৮ ও ১৯ অক্টোবর (শুক্র ও শনিবার) তিনি অফিস করেন। পরদিন ২০ অক্টোবর তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। কিন্তু এ বিষয়েও কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি। ২১ অক্টোবর তিনি অফিস করেন।

এদিকে ২৩ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে এক সভায় যোগদান করতে ড. শিরীণ ২২ অক্টোবর সকালে ঢাকা যাবেন বলে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে মিথ্যাচার করেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি ২১ অক্টোবর রাতেই চট্টগ্রাম থেকে ফ্লাইটে ঢাকায় চলে গিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ হাজার শিক্ষার্থী, ৯০০ শিক্ষক, চার হাজার কর্মচারীর অভিভাবক হিসেবে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া ড. শিরীণ ২২ অক্টোবর অফিস করে সন্ধ্যায় বা বিকেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নানা কাজ এগিয়ে যেত বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অভিমত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে উপাচার্যের মত দফতরের দায়িত্বপালন করতে গিয়ে এতদিন ঢাকায় অবস্থানের ঘটনা বিরল। সরকারি কোনো সভা কিংবা কোনো আমন্ত্রণে, প্রয়োজনে যদি উপাচার্যকে ঢাকা অবস্থান করতে হয় তাহলে অবশ্যই আগের দিন চিঠি ইস্যুর রীতি রয়েছে। হঠাৎ কোনো কাজ পড়লেও যাওয়া যায়। কিন্তু ড. শিরীণ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চিঠি ইস্যু করে খুব কম সময়ই ঢাকা গেছেন। চিঠি ইস্যু করলেও শুধুমাত্র ‘জরুরী প্রয়োজন’ উল্লেখ করে চলে গেছেন।

উপ উপাচার্য থাকাকালীন সময়েও কোনো কারণ উল্লেখ না করেই শিরীণ আখতার ঢাকা চলে যেতেন। মূলত উপাচার্যের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেতে সরকারি বিভিন্ন দফতরে তদবির করতেই তিনি এতবার ঢাকা যাচ্ছেন কিনা সে প্রশ্নটিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অভিযোগ, উনি কি ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবহার করে হরহামেশা ঢাকা যাচ্ছেন নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যবহার করে বিমানযোগে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ পর্যন্ত তিনি কত লাখ টাকা খরচ করেছেন সে বিষয়েও তদন্ত হওয়া উচিত। এসব তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে নজিরবিহীন পিলেচমকানো কোনো তথ্য।

শুধু এ কয়েকদিনই নয়; বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বপালনকালে উপ উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার অসংখ্য খোলার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। তবে শুক্রবার ও শনিবার বন্ধের দিন তাকে অফিস করতে দেখা যায়। এ কারণে শুক্রবার ও শনিবার বন্ধের দিনেও অফিস করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের কর্মকর্তাদের।

অফিস খোলা থাকার দিনে উপাচার্য অফিসে না থাকায় বন্ধের দিন রেজিস্ট্রার দফতরের বিভিন্ন অফিস খোলা রাখতে বাধ্য হন কর্মকর্তারা। আবার বন্ধের দিনে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত চারুকলা ইনস্টিটিউটেও অফিস করেন উপ উপাচার্য ড. শিরীণ। এ সময় ফাইল নিয়ে হাজির থাকতে হয় কর্মকর্তাদের। এ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে চবি ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এক ব্যক্তি ফোন ধরেন, তিনি নিজেকে শিরীণ আখতারের পিএস ইউনুস পরিচয় দেন এবং প্রফেসর শিরীণ মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।