রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

চীনে ক্যান্টন ফেয়ার : বাড়ছে বাংলাদেশি ক্রেতা

| প্রকাশিতঃ ২৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৬:২০ অপরাহ্ন

ফায়সাল করিম, চীন থেকে : বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আমদানি-রফতানি মেলা ক্যান্টন ফেয়ারকে ধরা হয় চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের বেঞ্চমার্ক বা মাপকাঠি। এই মেলার বাণিজ্যিক গতি-প্রকৃতি, অংশগ্রহণকারী ও ক্রেতা দেশ এবং ব্যবসায়িক হিসেব-নিকেশ দেখে বুঝে নেওয়া হয় চীনাপণ্য বাজারের গতি কোন মুখী। ক্যান্টন মেলার সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান নিলে এটা পরিস্কার হয়, চীন-মার্কিন বাণিজ্য দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে সেখানেও।

মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে এ বছরও দুই দেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে চীন থেকে মার্কিন আমদানি বছরের প্রথম আট মাসে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এদিকে চীনকে ফেলে মেক্সিকো আমেরিকার বৃহত্তম পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে নাম লিখিয়েছে। তাদের হিসেবে, চীন থেকে মার্কিন আমদানি বছরে ৪৩ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে আর মেক্সিকো থেকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

বাণিজ্যের গতিপথ পরিবর্তন : আমদানি রপ্তানির এই নতুন প্রবণতায় চীন ঝুঁকেছে নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনার দিকে। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতির হুমকি মাথায় রেখেই তারা ধীরে ধীরে এক অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সাজিয়েছে নতুন বাণিজ্যনীতি। এতে এশিয়া, আফ্রিকা, লাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে দেশটি। ক্যান্টন মেলার সাম্প্রতিক কয়েকটি আসরের তথ্য নিলে চীনের সেই ঝোঁক চোখে পড়ে। মেলার মুখপাত্র শু বিং জানান, গেল এপ্রিলে ক্যান্টন মেলার ১২৫ তম আসরে এক অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর সাথে মোট বাণিজ্য হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। যা মেলার মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং আগেরবারের চেয়ে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এছাড়া মেলার ওই আসরে আমদানি-পণ্য প্রদর্শনীতে মোট ৬৫০টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬০ ভাগই এসেছিল এক অঞ্চল এক পথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলো থেকে।

চীনা বৈদেশিক বাণিজ্য কেন্দ্রের তথ্যমতে, এর আগে ২০১৮ সালে মেলার ১২৪ তম আসরে এসব দেশের সাথে মোট বাণিজ্য হয়েছিল ৯ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। যা আগের আসরের চাইতে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি এবং মেলার মোট বাণিজ্যের ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। মেলার ১২৩ তম ও ১২২তম আসরে চীনের মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর সাথে মোট বাণিজ্য হয়েছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার ও ৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। এই দুটি আসরের বাণিজ্যের পরিমাণ আগের আসরগুলোর চাইতে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ও ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি ছিল।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে মেলার গ্রীষ্মকালীন পর্বে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেয় উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। মেলার এই দুটি আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রেতাদের মনোযোগ আর্কষণ করে দেশীয় এই ব্র্যান্ডটি। ১১৯ ও ১২১ তম আসর দুইটিতে ইউরোপ-আমেরিকা বেশ কয়েকটি দেশ ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বড় অঙ্কের রপ্তানি আদেশ পায় তারা।

ক্রেতার সংখ্যায় অগ্রগতি; বাড়ছে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ : গেল ছয়টি মেলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মেলার মোট ক্রেতার অনুপাতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এক অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর অংশগ্রহণ। ক্যান্টন মেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতি বছর মেলায় ক্রেতার সংখ্যা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগের আসরগুলোকে। বাড়ছে নতুন ক্রেতার সংখ্যাও। মেলার সবশেষ গ্রীষ্মকালীন আসরে মোট ক্রেতার ৪৫ দশমিক ০৩ শতাংশই ছিল এক-অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর, যার মধ্যে নতুন ক্রেতাই ছিল ৫২ দশমিক ৬৮ ভাগ। মেলার এই আসরে দেশগুলো থেকে ক্রেতার সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার।

ক্যান্টন মেলা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বিগত দুই বছরে মহাপরিকল্পনার অংশীদারী দেশগুলো থেকে মেলায় গড়ে ৮০ হাজার ক্রেতা অংশ নিয়েছে যা মোট অনুপাতের ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। মেলার ১২০ তম আসরে ক্রেতার সংখ্যা ৮১ হাজার ৬০৪ জন থাকলেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে ১২১ তম আসর থেকে ব্যাপকহারে বাড়তে থাকে সংখ্যা। এই আসরে মেলায় মহাপরিকল্পনার অংশীদারী দেশগুলো থেকে অংশ নেয় প্রায় ৯০ হাজার ক্রেতা। পরের চারটি আসরে এই সংখ্যা সর্বনিম্ন ৮৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৯১ হাজার পর্যন্ত রেকর্ড করেছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে ২০১৬ সাল থেকে মেলার প্রতিটি আসরে বাংলাদেশী ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশী স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মেলা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি আসরে ৫ থেকে ৬ হাজার বাংলাদেশী ক্রেতার সমাগম ঘটেছে ক্যান্টন মেলায়। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই নতুন ক্রেতা থাকে বলে জানান তারা।

ব্যবসায়িক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা : ক্যান্টন ফেয়ারের মুখপাত্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য কেন্দ্রের উপপরিচালক শু বিং জানান, ক্যান্টন মেলায় ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ বা এক-অঞ্চল-এক-পথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর অংশগ্রহণ আরো ব্যাপক হারে বাড়াতে নানা কর্মসূচি ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চীন সরকার। ক্যান্টন মেলা কর্তৃপক্ষ গ্লোবাল পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম চালু করে চীন এবং মহাপরিকল্পনার দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা উন্নত করতে কাজ করছে। এসব দেশে ক্যান্টন মেলার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সুবিধা প্রচারের জন্য তৈরি করা হয়েছে নানা ধরনের প্ল্যাটফর্ম। তিনি বলেন, এ বছর মেলা কর্তৃপক্ষ ৩২টি এক অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশে ৪৮টি শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থার সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান চীনের ক্যান্টন মেলার প্রচার, প্রদর্শনী, পরিদর্শন এবং নানা ধরনের তথ্য-সহায়তা নিয়ে কাজ করবে।

বাংলাদেশে ক্যান্টন মেলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চুক্তিবদ্ধ আছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। ক্যান্টন ফেয়ার গ্লোবাল পার্টনারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় দেশীয় এই ব্যবসায়িদের সংগঠন মেলা কর্তৃপক্ষকে নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়া ২০১৮ সালে মেলার ১২৪তম আসরে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএসের একটি প্রতিনিধিদল। নতুন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করে বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে ক্যান্টন মেলায় চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বাংলাদেশের কাজে লাগানোর ধারণা পেতে তারা বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেছিলেন।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের কর্মসূচি মেলায় নতুন নতুন ক্রেতার সমাগম ঘটাবে বলে আশাবাদী চীন। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ক্যান্টন মেলার সামগ্রিক পরিসংখ্যানে এসব দেশের অংশগ্রহণ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে ধারণা করছে তারা।

১২৬ তম আসর : মেলার চলমান আসরেও এক অঞ্চল একপথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলো ব্যাপক প্রাধান্য পাচ্ছে। এই আসরে পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে তাদের ২১ টি দেশের ৩৬৭টি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। এবার মেলায় মোট সাড়ে ছয়শ’ বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য প্রদর্শনী করছে, যার ৬০ শতাংশই মহাপরিকল্পনার দেশগুলো থেকে আসা। এদিকে গেল আসরগুলোর মত এবারও এক অঞ্চল এক পথ মহাপরিকল্পনার দেশগুলো থেকে প্রায় লাখখানেক ক্রেতার সমাগম ঘটতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মহাপরিকল্পনার অন্তত ২৫টি দেশের ক্রেতারা ভীড় করবেন।

মেলায় গিয়ে দেখা গেল, আগের কয়েকটি আসরের মত বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন অনেক ক্রেতা। মেলায় প্রথম ধাপ থেকেই এবার বাংলাদেশিদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। এদের মধ্যে পুরোনো ব্যবসায়ী যেমন আছেন তেমনি এসেছেন তরুণ উদ্যেক্তা ও নতুন ব্যবসায়ী। মেলার দ্বিতীয় ধাপে হোম ডেকোর প্রদর্শনী অংশে কথা হল চট্টগ্রামের তরুণ ব্যবসায়ী কে এম মেজবাহ উদ্দিনের সাথে।

তিনি জানালেন, মূলত আমদানি ব্যবসার সাথে জড়িত হলেও ক্যান্টন ফেয়ারে এসেছেন ঘরসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যের সম্পর্কে ধারণা পেতে। বললেন ‘অনেক বছর ধরে হোম ডেকোর ও ইন্টেরিয়র পণ্য নিয়ে নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলেও সময় ও সুযোগের অভাবে তা হয়ে ওঠেনি। তবে ক্যান্টন ফেয়ারে এসে খুব অল্প সময়ে এবার নানা ধরনের হোম ডেকোর পণ্য দেখার সুযোগ হয়েছে, যা আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করবে।’

মেলায় চীনের শিয়ামেন নিউসান কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক কেইট লি জানান, তার প্রতিষ্ঠান মূলত খেলনা উৎপাদন করে। তবে নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাস্তবতার সাথে তাদের লড়াই করে সামঞ্জস্য রাখতে হচ্ছে। এবার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড থেকে ছোট ছোট অনেক অর্ডার পেয়েছেন যা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বড় রপ্তানি আদেশ না পাওয়ার ধাক্কা সামলে উঠতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

একুশে/এফকে/এটি