বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

নিয়ম নয়, বোয়ালখালীর এসিল্যান্ডের ইচ্ছাই সব

প্রকাশিতঃ সোমবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯, ৬:১০ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : জমির পরিমাণ ২ দশমিক ৩৭৬৮ একর। উক্ত ভূমি অধিগ্রহণের জন্য নোটিশ জারি হয়েছে। জমিটির মালিকানা দাবি নিয়ে আদালতে মামলাও বিচারাধীন। কোনো কিছুকেই পরোয়া করেননি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসিল্যান্ড) একরামুল ছিদ্দিক। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মাত্র এক মাসের মধ্যেই পাল্টে দিয়েছেন কোটি টাকার জমিটির মালিকানা। পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির এই ঘটনা নজিরবিহীন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বোয়ালখালীর জৈষ্ঠ্যপুরা মৌজার বিএস জরিপের ৩ নং খতিয়ানের ৬০ ও ৮০ নং দাগের ৭ দশমিক ৯০ একর ভূমি ভোগ-দখলে আছেন ওসমান গণি। উক্ত ভূমিটি অধিগ্রহণের জন্য এলএ মামলার (১৭/২০১৫-১৬) শুনানির কার্যক্রম চলছে। নিয়ম অনুযায়ী অধিগ্রহণের নোটিশ জারি হলে সেখানে আর নামজারি করা হয় না। এরই মধ্যে ২০১৮ সালে উক্ত খতিয়ানের ২ দশমিক ৩৭৬৮ একর ভূমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন বোয়ালখালীর শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোকাররমের ভাই মোজাম্মেল হক। যদিও মামলাটি (২২৫/২০১৮) এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এ অবস্থায় ২ দশমিক ৩৭৬৮ একর জমির নামজারির জন্য গত ২৬ সেপ্টেম্বর বোয়ালখালী উপজেলা ভূমি অফিসে মামলা (৩-৬৮৯/১৯) করেন মোজাম্মেল হক। বিষয়টি জানতে পেরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আপত্তি জানান ওসমান গণি। এতে অধিগ্রহণের নোটিশ জারি ও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। অনুরোধ করা হয় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন নামজারি কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়।

উক্ত আবেদনকে পাত্তা না দিয়ে মোজাম্মেল হক ও তার মা ফুলসাফা বেগমের আবেদনের প্রেক্ষিতে নামজারি কার্যক্রম শুরু করেন বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক। এরপর ২ অক্টোবর নামজারির জন্য প্রস্তাব পাঠান আমুচিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার পান্না দত্ত। একইদিন নথি উপস্থাপন করা হয়।

যদিও অভিযোগ উঠেছে, তহসিলদার পান্না দত্ত প্রথমে নামজারির জন্য প্রস্তাব দেননি। তিনি অধিগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদন দেন। কিন্তু সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক সেটি ফেরত পাঠান। তার চাপে পান্না দত্ত প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য হন। প্রথমে আপত্তি আবার পরে প্রস্তাব দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তহসিলদার পান্না দত্ত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এমনটা হতে পারে। ভুলবশত।’ প্রস্তাব দিয়েছেন কারো চাপের কারণে? পান্না দত্ত বলেন, ‘হতে পারে। আমাদেরকে তো পলিটিক্যাল দিক থেকে আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে প্রেশার দেয়। যেহেতু আমরা ভূমি অফিসে আছি, এটা আমাদের অপরাধ। কেন যে আমি ভূমি অফিসে চাকরি নিয়েছি!’

এদিকে ২ অক্টোবর নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কানুনগোকে মতামত দিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কানুনগোর মতামত নেয়া হয়নি। এতে নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন সার্ভেয়ার রাজন কুমার বড়ুয়া।

এরপর ১০ অক্টোবর নামজারি মামলার প্রথম ধার্য্য তারিখে আদেশে লেখা হয়েছে, ‘ওসমান গণি আপত্তি দাখিল করেছেন। শুনানির জন্য নোটিশ দেয়া হোক।’ কানুনগো মতামত দিয়েছেন কিনা সেটা উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া প্রথম নোটিশে অভিযোগকারীর নাম নেই।

২০ অক্টোবর মামলার দ্বিতীয় ধার্য্য তারিখে উল্লেখ করা হয়, ‘নোটিশ জারিপূর্বক ফেরত পাওয়া গেছে। বিবাদীগণ অনুপস্থিত।’ এরপর ২৯ অক্টোবর বিবাদীকে অনুপস্থিত দেখিয়ে নামজারি অনুমোদন করে ফেলা হয়। একদিন পর ৩০ অক্টোবর চেয়ারম্যান মোকাররমের ভাই মোজাম্মেল হক ও মা ফুলসাফা বেগমের নামে সৃজন করা খতিয়ানে স্বাক্ষর করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল, তহসিলদার ও সার্ভেয়ার। প্রস্তাবে মতামত না নেয়ার পাশাপাশি খতিয়ানেও কানুনগোর স্বাক্ষর নেয়া হয়নি। যদিও কানুনগো থাকা অবস্থায় সার্ভেয়ার কখনো প্রস্তাব কিংবা খতিয়ানে স্বাক্ষর করতে পারেন না।

অভিযোগ উঠেছে, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে নামজারির অনুমোদন দিতে গিয়ে স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপত্তি দায়ের করার সময় ওসমান গণি যে স্বাক্ষরটি করেছেন সেটির সাথে নোটিশ গ্রহণকারীর স্বাক্ষরের মিল নেই। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ওসমান গণি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২০ অক্টোবর হাজির হওয়ার জন্য আমি কোন নোটিশ পাইনি। নোটিশ গ্রহণকারী হিসেবে থাকা স্বাক্ষরটি আমার নয়। ন্যায়বিচারের জন্য দিনের পর দিন ভূমি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। অথচ নামজারির আদেশে বলা হচ্ছে আমি নাকি নোটিশ পেয়েও হাজির হইনি।’

এদিকে নামজারির মাধ্যমে মোজাম্মেল হক ও তার মা ফুলচাপা বেগমের যে নতুন খতিয়ান সৃজন হয়েছে সেটার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন ওসমান গণি। একই বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর পরামর্শে বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর রিভিউ করেছেন তিনি। উক্ত বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর অভিযোগও করেছেন ওসমান। তিনি বলেন, ‘প্রতিকার পাওয়া দূরে থাক, এখন উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে প্রতিপক্ষ।’

বিবাদীকে অন্ধকারে রেখে অবিশ্বাস্য গতিতে নামজারি করার অভিযোগের বিষয়ে বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে আগে বলা হয়েছিল ৪৫ দিনের মধ্যে নামজারি শেষ করতে হবে। এখন আবার বলে দিয়েছে ২৮ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এটা না করলে আমাদেরকে শোকজ দেবে। সে হিসেবে সময়ের আরো দুইদিন বেশী লেগেছে নামজারি করতে। কাজেই নিষ্পত্তির সময় নিয়ে অভিযোগ করা যাবে না।’

যদিও বোয়ালখালীতে এমন বেশকিছু নামজারি মামলার খোঁজ মিলেছে, যেগুলো এক বছরেও শেষ হচ্ছে না।

অধিগ্রহণের নোটিশ জারি ও মামলা থাকার পরও নামজারি অনুমোদন প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র আছে, যদি মামলা চলমান থাকে কিন্তু আদালতের কোন আদেশ বা স্থগিতাদেশ আসেনি, সে ক্ষেত্রে নামজারি করা যাবে।’ অধিগ্রহণের নোটিশ থাকা জমির নামজারি অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাব ফরমে অধিগ্রহণের বিষয়ে কিছুই লিখেননি তহসিলদার।’

নামজারিতে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে একরামুল ছিদ্দিক বলেন, ‘নামজারির আবেদনটি পাঠানোর পর তহসিলদার প্রস্তাব দিয়েছে। তাকে বলেছি, একটি আপত্তি এসেছে। আপনি রেকর্ড ঠিক আছে কিনা দেখবেন। তিনি ইতিবাচক প্রস্তাব দিয়েছেন। কানুনগো ছুটিতে থাকায় সার্ভেয়ার রাজন বড়ুয়াকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। আর ওসমান গণি নোটিশ দেয়ার পর আসেনি, আমাকে কোন ডকুমেন্টও দেয়নি।’ ওসমান গণির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলেও দাবি করেন বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিক।