
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম অঞ্চলের করোনা শনাক্তের পরীক্ষার একমাত্র ঠিকানা ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতাল বা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিসেস (বিআইটিআইডি)।
দেশে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার এই হাসপাতালে ১০ করে ২০ শয্যার দুটি আইসোলেশন ইউনিটে করোনা-আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি করোনা ভাইরাস পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই এই হাসপাতালের দিকেই নজর করোনা-আতঙ্কে থাকা চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের।
সোমবার (৩০ মার্চ) হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে করুণ চিত্র। কর্তব্যরত চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার মাঝেই যেন একধরনের ভীতি ও গাছাড়াভাব। রোগী দূরের কথা, সুস্থ মানুষ গিয়েও ডাক্তার-নার্সদের দেখা পাচ্ছেন না। হাসপাতালজুড়েই একটা সুনসান নীরবতা, ভয়, আতঙ্ক।
এ অবস্থায় সোমবার দুপুর ২টার দিকে একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে গিয়ে কথা বলার জন্য কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না হাসপাতালে। কয়েকবার আওয়াজ দেওয়ার পর কাছে না এসে দূর থেকে একজন নার্স জানালেন অনুসন্ধান কক্ষে খোঁজ নিতে। দেখা গেলো, অনুসন্ধান কক্ষটি পুরোপুরি ফাঁকা।
হাসপাতালটির পরিচালক প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আবুল হাসান চৌধুরীর কক্ষের কাছে গিয়ে জানা গেলো তিনি আছেন। ভেতরে খবর পাঠানোর কিছুক্ষণ পর জানানো হলো, তিনি এখন কক্ষে নেই।
এরপর একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। নাম তার প্রণব বড়ুয়া, হাসপাতালের সহযোগি অধ্যাপক তিনি। কড়া নজরদারি, আতঙ্কের মাঝেও ব্যতিক্রম তিনি, দিব্যি ফুরফুরে, স্বাভাবিক।হাতে গ্লাভস নেই, মুখে মাস্ক নেই, নেই পিপিই বা করোনা-ভাইরাস সুরক্ষার প্রস্তুতি। এ পরিস্থিতিতেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, হ্যান্ডশেক করে পাশে বসালেন।
তার আলাপ থেকেই বেরিয়ে এলো করোনা-আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় এই অঞ্চলের মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠা হাসপাতালটির সকরুণ চিত্র।
তিনি জানালেন, করোনা শনাক্তের পরীক্ষা এই হাসপাতালে হয় না। মূলত নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। কোথাও কোনো তথ্য পেলে তাদের লোক গিয়েই রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তা পাঠানো হয় ঢাকায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর)। সেখান থেকেই ঘোষণা করা হয় পরীক্ষার ফলাফল। আর এই পরীক্ষার ফল জানতে চট্টগ্রামের রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ৭২ ঘণ্টা বা ৩ দিন।
ডা. প্রণব বড়ুয়া আরো জানান, করোনা ভাইরাস শনাক্তের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে সোমবার পর্যন্ত ২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ট্রিপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)। এর মধ্যে ১৫ জনের পাওয়া রিপোর্টে করোনা সংক্রমণের আলামত পাওয়া যায়নি। হাতে আসেনি বাকি ৫ জনের রিপোর্ট।
রিপোর্ট প্রাপ্তিতে এত দীর্ঘসূত্রিতা বা বিলম্ব হলে এত ডাকঢোল পিটিয়ে লাভ কী, নির্ভরতার হাসপাতালই বা হলো কী করে, কেউ যদি করোনা আক্রান্ত হয়েও থাকেন রিপোর্ট হাতে আসার আগেও তো ওই রোগীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠতে পারে- এমন অভিমতের পর ডা. প্রণব বড়ুয়া জানালেন, তাদের কিছু করার নেই। লজিস্টিকস যা আছে তাতেই তাদের কাজ করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, আইসোলেশন ইউনিটে মাত্র ২ জন রোগী ভর্তি আছেন। স্বাভাবিক রোগের বেডগুলোও অনেকটা ফাঁকা। করোনা ভীতির কারণে রোগীরা স্বাভাবিক রোগের চিকিৎসাও পাচ্ছেন না। কয়েকদিন আগে চন্দনাইশের একজন হার্ট অ্যাটাকের রোগী হাসপাতালটিতে চিকিৎসা না পেয়ে নগরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি হন। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় শনিবার রাতে বাবলু বড়ুয়া নামের ওই রোগী মারা গেছেন বলে জানা গেছে।
কিন্তু ডা. প্রণব বড়ুয়ার দাবি, স্বাভাবিক ওয়ার্ডে চিকিৎসা পাচ্ছেন রোগীরা। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে শনিবার বাবলু বড়ুয়ার মৃত্যুবরণের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, চমেক হাসপাতাল, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে হার্ট অ্যাটাকের রোগীটা এখানেও এসেছিল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম চিকিৎসা দিতে। পরে রয়েল মেহেদিবাগ একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি মারা যান। অবহেলার শিকার রোগীটা সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো বাঁচতে পারতো। যোগ করেন তিনি।