শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

করোনা ঝুঁকিতেও প্রণোদনা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছে বিচার বিভাগ

প্রকাশিতঃ সোমবার, জুন ১, ২০২০, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ


ঢাকা : করোনাভাইরাস সঙ্কটের শুরু থেকেই প্রণোদনা ছাড়াই আদালতের বিচারকরা নীরবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উচ্চ আদালতের বিচারপতি থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের কয়েকজন বিচারকও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ইতিমধ্যে। তবুও দায়িত্ব পালনে অনড় করোনার নীরব যোদ্ধা আদালতের বিচারকরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধিতে কোনো আসামি গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করার বিধান রয়েছে। এই করোনাকালেও খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ থেমে নেই। মাস্ক পড়েও মারামারি করতে দেখা যাচ্ছে। এসব ঘটনার মামলার আসামিদের পুলিশ গ্রেপ্তারও করছে।

প্রতিদিনই শত শত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নেওয়া হচ্ছে আদালতে। আর ওই সব আসামির রিমান্ড, জামিন ও অন্যান্য বিষয়ে শুনানিও গ্রহণ করতে হয় বিচারকদের। তাদের শুনানি গ্রহণ করার জন্য নিয়মিত কোনো না কোনো আদালতকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

করোনার সময়ও খাসকামরায় আসামির জবানবন্দি গ্রহণ, আসামিদের সঙ্গে কথা বলা, আসামির সঙ্গে থাকা পুলিশের সঙ্গে কথা বলা, মামলার নথি পর্যালোচনা করা, আবার আদালতে ওই সব আসামির বিভিন্ন আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ- সবই করে চলেছেন বিচারকরা।

দেশের বিচারিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১১ মে বিচার শুরু হয় ভার্চুয়াল আদালতের। ৩৫০টির বেশি ভার্চুয়াল আদালত গঠন করে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন আদালতের বিচারকদের। নতুন এই পদ্ধতির দায়িত্বও পালন করছেন বিচারকরা। এভাবে করোনার দিনগুলোতে অন্য জরুরি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতই বিচার বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে নীরবে। এ ছাড়া বিচারকরা এক দিনের সমপরিমাণ বেতন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন।

জানা গেছে, দেশের প্রতিটি কারাগারে ধারণা ক্ষমতার কয়েকগুণ বন্দি আছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের কোন কোন কারাগারে ধারণ ক্ষমতার ৫-৭ গুণ বন্দিও রাখা হচ্ছে। এমন অবস্থায় মাত্র ১০ কার্যদিবসে কারাগারে থাকা ২১ হাজার আসামি ভার্চুয়াল আদালতে জামিন পেয়েছেন। প্রতিদিনই প্রায় দুই হাজার আসামির জামিন হচ্ছে। ফলে কারাগারে বন্দির চাপ কমে এসেছে, লঘু অপরাধে দীর্ঘদিন বন্দি থাকা ব্যক্তিরা মুক্তি পাচ্ছেন।

এদিকে ৩১ মে থেকে দেওয়ানি মামলার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে আদালতে। ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য বিচারকদের নিজেদের উদ্যোগে ডিভাইস-ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য সরকারি উদ্যোগে ডিভাইস-ইন্টারনেট ব্যবস্থা করা হয়নি বলে বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে জানা গেছে।

করোনা ঝুঁকি নিয়ে এভাবে দায়িত্ব পালন করলেও আদালতের বিচারকরা প্রণোদনার আওতায় আসেননি। সংক্রমণ প্রতিরোধে সুরক্ষা সামগ্রীও পাননি। তবুও বরাবরের মত নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন বিচারকরা।

যদিও করোনা তাতে ছাড় দেয়নি। করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন একজন বিচারপতি। কাজ করতে গিয়ে স্টাফ, পুলিশসহ অনেকের সংস্পর্শে আসা বিচার বিভাগের একজন জেলা ও দায়রা জজ এবং আরেকজন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অবশ্য নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে বিচারকদের। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বিচারকদের ও বিচারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং বিচারকাজে জড়িত সবার খোঁজখবর, সুবিধা-অসুবিধা দেখার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করার নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আইনসচিব আইন মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তাকে মনিটরিং সেলের দায়িত্ব দেন। দুই কর্মকর্তা হলেন আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শেখ গোলাম মাহবুব ও এস মোহাম্মদ আলী।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বিচার বিভাগের উপর। করোনা মহামারির মধ্যে আদালতের বিচারকরা যেভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা করোনার নীরব যোদ্ধা।