
ইমরান এমি : করোনা সাধারণ মানুষের জন্য এসেছে অভিশাপ হয়ে। আবার এই করোনাকেই কেউ কেউ বরণ করছে ‘আশির্বাদ’ হিসেবে। করোনাকালে পরিবহন স্বল্পতার সুযোগে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী ও চালকরা। অনেকে শত চেষ্টা করেও প্রয়োজনের সময় অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না।
আজ বুধবার সকালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা এলাকার কোহিনুর আকতার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে রেফার করেন। চট্টগ্রামে নেয়ার জন্য অনেক খোঁজাখুজির পর একটি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেলেও দাম দ্বিগুণ বাড়তি। ২ হাজার টাকার ভাড়ার জায়গায় দাবি করা হয় চার হাজার টাকা।
চন্দনাইশ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। এ দূরত্বের ভাড়া অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালায় ১ হাজার ৮০০ টাকা বলা হলেও নেওয়া হয়েছে তার দ্বিগুণ।
রোগীদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া, রোগীদের জিম্মি করে ভাড়া আদায়সহ নানা অভিযোগ-ভোগান্তির কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সে বছরের ২ এপ্রিল থেকে এ নীতিমালা কার্যকর হলেও করোনা মহামারী সময়ে মানা হচ্ছে না সেটা। রোগীদের কাছ থেকে যা ইচ্ছে তাই ভাড়া আদায় করার অভিযোগ উঠেছে।
২০১৮ সালের মার্চে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আজম নাছির উদ্দীন আ্যম্বুলেন্স নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির আহবায়ক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, চমেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়সল ইকবাল চৌধুরী, বিআরটিএ’র উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর উপস্থিতিতে আ্যম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়ে একটি নীতিমালা ঘোষণা করেন।
নীতিমালার মতে, নগরীতে আসা-যাওয়া মিলে ১০ কিলোমিটারে নন এসি ছোট ও বড় অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া ৮০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ৯০০ টাকা। ২০ কিলোমিটারে নন এসি ছোট ও বড় এক হাজার ২০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ১ হাজার ৩০০ টাকা।
৩০ কিলোমিটারে নন এসি ছোট ও বড় ১ হাজার ৮০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ১ হাজার ৯০০ টাকা। বিমানবন্দর পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটারে নন এসি ছোট ও বড় ২ হাজার ২০০ টাকা এবং এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ২ হাজার ৫০০ টাকা।
আন্তঃনগরে নন এসি ছোট গাড়ি (১৮০০ সিসির নিচে) ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ১৪ টাকা। বড় গাড়ি (১৮০০ সিসি ও তার চেয়ে বেশি) ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ টাকা। এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ১৯ টাকা।
এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ১৯ টাকা। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রতি কিলোমিটারে ১০ শতাংশ বেশি। ফ্রিজার ভ্যানের ওয়েটিং চার্জ গন্তব্যে পৌঁছার পর প্রথম ঘণ্টা ফ্রি। এরপর গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ঘণ্টায় ৩০০, পরিবহনের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতিঘণ্টা ৩৫০ টাকা। অক্সিজেনের জন্য নতুন সিলিন্ডার প্রতি ২২০ টাকা গ্রাহককে দিতে হবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, বিআরটিএ, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখা, মালিক সমিতির মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালাটি তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু করোনা মহামারীর এ সময়ে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের অজুহাতে নীতিমালা বহির্ভূত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যার কারণে প্রশ্ন উঠেছে অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালার বাস্তবায়ন নিয়ে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের সিইও বিদ্যুৎ বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার জন্য যে নীতিমালা রয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা তদারকি করতে হবে। একজন মানুষ যখন অসুস্থ থাকে তখন দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন তারা হাসপাতালে পৌঁছানোর তাড়ায় টাকার চিন্তা করেন না। তাই রোগীদের কাছ থেকে যেন বাড়তি ভাড়া কোনভাবে নিতে না পারে সে জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যেতে পারে। এছাড়া যারা রোগী তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি রশিদ দেয়ার নিয়ম চালু করা গেলে পরে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, নীতিমালার বাইরে গিয়ে কোন অ্যাম্বুলেন্সের বাড়তি ভাড়া আদায় করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্টও বিষয়টি দেখছে। করোনা মহামারীতে কেউ যেন বাড়তি ভাড়া আদায় বা রোগী বহনে হয়রানি করতে না পারে আমরা সেদিকে সজাগ আছি।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য জানা যায়নি।