শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

কক্সবাজার সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য আসছে ভারত থেকে, দাবি জেলেদের

| প্রকাশিতঃ ২০ জুলাই ২০২০ | ৬:২২ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : করোনাকালে জনশূন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যে প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল তা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। বর্তমানে কক্সবাজার সৈকতের প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব।

জানা গেছে, গত ১০ জুলাই থেকে হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে সৈকতে ভেসে আসছে শত শত টন প্লাস্টিক বর্জ্য, মদের বোতল, ছেঁড়া জালসহ নানান রকম বর্জ্য। ছেঁড়া জাল ও বর্জ্যে আটকে মারা যাচ্ছে সামুদ্রিক কাছিম ডলফিনসহ নানান প্রাণী। এতে কক্সবাজার সৈকতের পরিবেশ মারাত্মক দূষণ ও হুমকির মুখে পড়েছে।

কক্সবাজার সৈকতে বর্জ্য ও মদের বোতল প্রথমে সংশ্লিষ্টদের নজরে আনে প্লাস্টিক ব্যাংক বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাকের আলম জানান, গত ১০ জুলাই থেকে তারা সৈকতে প্লাস্টিক সংগ্রহে অভিযানে নামেন। মানবশূন্য সৈকতে নেমে শত শত টন বর্জ্য ও মদের বোতলের অবিশ্বাস্য স্তুুপ দেখতে পান তারা।

বিষয়টি নিয়ে সাকের আলম ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরে পোস্ট দিলে তোলপাড় শুরু হয়।

দেখা গেছে, কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসা পরিবেশ বিনষ্টকারী ও দূষণ সৃষ্টিকারী প্লাস্টিক বর্জ্য, মদের বোতলগুলো সব বিদেশী কোম্পানীর তৈরি পণ্য। এসব পণ্য সাধারণত বাংলাদেশে খুব একটা দেখা যায় না।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, এসব বিষাক্ত বর্জ্য গুলো পাশ্বর্বতী দেশ থেকে আসছে এটা নিশ্চিত। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব বর্জ্য বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে পরিবেশবান্ধব পরিছন্ন সৈকত গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনগুলো।

কক্সবাজার সৈকতের বিষাক্ত বর্জ্য নিয়ে আলোচনা চলছে জেলেদের মাঝেও। জেলেরা বলছেন, এসব বর্জ্য পাহাড়ি ঢলে পাশের দেশ ভারত থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর হয়ে কক্সবাজার সৈকতে আসছে। সাগরের একাধিক পয়েন্টে আরও হাজার হাজার টন বর্জ্য তারা দেখতে পেয়েছেন। এসব বর্জ্য ধীরে ধীরে কক্সবাজারের খুব কাছাকাছি চলে আসছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা।

জেলেদের নেতা শামশুল আলম মাঝি একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভের পটোয়ারটেক পয়েন্টের মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য দেখা গেছে। এসব ভারতের তারিনা বিলার হয়ে কক্সবাজার সৈকতে এসেছে। একইভাবে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে পঁচাখালীর বাত্তি নামক একটি পয়েন্ট ও সোনাদিয়ার পশ্চিম দিকে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তুুপ তারা দেখতে পেয়েছেন।

শামশুল আলম মাঝির মতে, ভারী বর্ষণে ভারতের পাহাড়ি ঢলে একটু একটু করে বর্জ্য গুলো এসে জমে গেছে বঙ্গোপসাগরে। যা পানির উপর থেকে খেয়াল করলে যে কেউ বুঝতে পারবে। সাগরের যেখানে বর্জ্যের স্তুুপ জমে আছে সেখানে কয়েক কিলোমিটার পানি গুলো কালো দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ডনফিন, কাছিমসহ নানান সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ সেখানে আটকে আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

জেলেদের তথ্য অবগত করে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্স ইনস্টিটিউট এর এনভায়রমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগ এর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, কিভাবে কোথা থেকে এসব বিষাক্ত বর্জ্য আসছে সেটি জানতে বাতাস, পানি ও ঢলের স্রোতের পরিমাপ ও বর্জ্যের স্যাম্পল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এরপর এ বিষয়ে বলা যাবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ শুরু করেছেন।

তিনি আরও বলেন, জেলেদের তথ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জেলেরা সাগরের যেসব স্থানে বর্জ্য দেখেছেন বলে তথ্য দিয়েছেন প্রয়োজনে সেখানে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারাও পরিদর্শনে যাবেন।

আগামী দুই-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে গঠিত জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে, সেখানে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

এদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে ১১টি পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রায় ৩ শতাধিক কর্মী সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে। সৈকত থেকে বর্জ্য সম্পূর্ণভাবে অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কক্সবাজার জেলা মো. কামাল হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, সৈকতে যদি বর্জ্য আরও আসে তা অপসারণের জন্য সেভাবে প্রস্তুতি নেয়া আছে। বর্জ্য কিভাবে কোথা থেকে এলো তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।