
আজাহাদুল ইসলাম আরফাত : ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপে ভাঙন দেখা দেয়। ১৯৮৭ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং, কৈয়ারবিল, বড়ঘোপ এবং আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের খুদিয়ার টেকসহ দ্বীপটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্র গর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।
ভাঙনে কমেই ছোট হয়ে আসছে বাতিঘরখ্যাত দ্বীপ কুতুবদিয়া। ষাট দশকের ৬০ বর্গকিমির এই দ্বীপের আয়তন এখন মাত্র ১৭ বর্গকিমি। স্থায়ী ও পরিকল্পিত বেড়িবাঁধের অভাবে দ্বীপটি দিনে দিনে সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে উদ্বাস্তু হতে চলেছে দ্বীপের দেড় লাখ মানুষ। দেশের মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে ৯০০ খ্রিস্টাব্দে জেগে ওঠা কুতুবদিয়া দ্বীপের অস্তিত্ব।
গত চার যুগে কুতুবদিয়া দ্বীপের একটা বড় অংশ বঙ্গোপসাগরে ভেঙে চলে গেছে। একের পর এক বড় বড় ঝড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে। অধিবাসীরা ধীরে ধীরে ছেড়ে যাচ্ছে পিতৃপুরুষের ভিটা, লবণখেত, ফসলের মাঠ আর মাছের ঘের। তাদের পেশা হচ্ছে দিনমজুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) কুতুবদিয়া দ্বীপের ১৪ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত সিসি ব্লক ও মাটির কাজ করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রায় ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। বাঁধ মেরামতের কাজ হচ্ছে দেখে এলাকাবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু বেড়িবাঁধের ব্লক তৈরিতে সাগরের লবণাক্ত বালি আর নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগ উঠে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। তবে বাঁধ মেরামত বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঈগলরীজ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন (বিডি) লি. এর সাইট ইঞ্জিনিয়ার শাহীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে ব্লক নির্মাণ কাজে নিম্নমানের পাথর আর লবণ বালি ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পায়। এ প্রেক্ষিতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু সতর্ক করা হয়। ফলে লবণ বালি আর নিম্নমানের পাথর ব্যবহার না করার জন্য বলা হলেও ঠিকাদার তা মানেন নি। এতে তৈরি হওয়া ব্লক বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। ফলে এখন নিয়মিত জোয়ারেই দ্বীপের বড় অংশ তলিয়ে যায়।

এদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের প্রান্তে একেবারেই অরক্ষিত অবস্থায় কুতুবদিয়া। দ্বীপের মোট ৪০ কিমি বেড়িবাঁধের সাড়ে ১৩ কিমি এখন অরক্ষিত। এই বেড়িবাঁধ সংস্কার না করায় কুতুবদিয়ার বড় একটি অংশ এখন সাগরের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট-বাড়িঘর ঢুকে যাওয়ায় ৪ হাজারের বেশী পরিবারের দুর্ভোগের অন্ত নেই। দুর্গত লোকজনের বাড়িতে রান্না করারও অবস্থা নেই। এমন অবস্থায় সুযোগ পেলেই কুতুবদিয়ার মানুষ চলে যাচ্ছে কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, রামু, চকরিয়া, ডুলাহাজারা ও পেকুয়া; খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলার সদর, চট্টগ্রামের সদর ও আনোয়ারা উপজেলায়।
সম্প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্বীপটির ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সরকার কুতুবদিয়ায় জ্বালানি খাতের বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। তবে শিল্পোদ্যোগগুলো ভাঙনপ্রবণ এই দ্বীপের নাজুক পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি করতে পারে। কুতুবদিয়া দ্বীপ অনেক বিপন্ন জলচর বা উভচর প্রাণী ও পাখির আবাসকেন্দ্র।
এদিকে ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে “গ্রাম হবে শহর” স্লোগানের ছিটেফোঁটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না কুতুবদিয়ায়।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮- এ বলা হয়েছে, ‘আমার গ্রাম–আমার শহর’: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগরসুবিধা সম্প্রসারণ: আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করব। শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেব। আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। পাকা সড়কের মাধ্যমে সকল গ্রামকে জেলা-উপজেলা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। ছেলেমেয়েদের উন্নত পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। সুপেয় পানি এবং উন্নত মানের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সুস্থ বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। কর্মসংস্থানের জন্য জেলা-উপজেলায় কলকারখানা গড়ে তোলা হবে। ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি সর্বত্র পৌঁছে যাবে।
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় এসব সুবিধা পৌঁছে দেয়া দূরে থাক, পাশের সমতলের উপজেলা পেকুয়ার সুযোগ-সুবিধাও নেই কুতুবদিয়ায়। দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কুতুবদিয়া দ্বীপের বিরাজমান যাবতীয় ব্যবধান, দূরত্ব ও অসংগতি দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও দেখা যাচ্ছে না সরকারকে। এখনো কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ নেই, বেশির ভাগ বেড়িবাঁধ ভাঙা। ভাঙনের কারণে এবং বেড়িবাঁধের অভাবে দ্বীপটি ও দ্বীপের মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে।
এ অবস্থায় কুতুবদিয়া দ্বীপ রক্ষায় টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নিলে হবে না। দরকার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা। আর দ্বীপবাসী ছিন্নমূল হলে সমস্যা বাড়বে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায়।
এ পরিস্থিতিতে কুতুবদিয়ার স্থানীয় অধিবাসীদের রক্ষা ভাঙন ঠেকাতে হবে, জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। নয়তো লবণ ও সামুদ্রিক মাছের বড় উৎস এই দ্বীপ, এখানকার অধিবাসী এবং প্রস্তাবিত বিনিয়োগ—সবকিছু বিপদে পড়বে।
লেখক : পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।