
মোহাম্মদ রফিক : কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (কেজিডিসিএল) জামানত ও সংযোগ ফি জমা দেওয়ার পরও চট্টগ্রামের প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক গ্যাস (আবাসিক) পাচ্ছেন না। গ্যাস দেয়ার আশ্বাসে এসব গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া ৩০ কোটি টাকা ব্যাংকে এখন সুদে-আসলে ৫০ কোটি টাকা হয়েছে।
এরপরও চট্টগ্রামে বাসা-বাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান হচ্ছে না। প্রায় ১১ বছর বন্ধ থাকার পর গত জুলাই মাসে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেয়ার বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আনা প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
পরিস্থিতি এমন যে, এক পা এগিয়ে যায় তো দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে বছরের পর বছর গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় ডিমান্ড নোট জমাদানকারী ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহকের ভোগান্তির সীমা নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের বাসা-বাড়িতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছে থাকলেও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) এর শীর্ষ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তার কারণে গ্যাস সংযোগ প্রদানের সিদ্ধান্তটি ঝুলে আছে ১১ বছর ধরে। এ নিয়ে নতুন সংযোগ প্রত্যাশী গ্রাহকরা চরম ক্ষুব্ধ।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহক ডিমান্ড নোটের বিপরীতে ৫ হাজার টাকা করে প্রায় ৩০ কোটি টাকা সরকারি ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা হিসেব করে বলেছেন, এক বছরে ১ কোটি টাকার বিপরীতে সুদ আসে ৬ লাখ টাকা৷ এ হিসেবে গত ১১ বছরে ৩০ কোটি টাকার বিপরীতে সুদ জমা হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। সুদ এবং আসল মিলে ব্যাংকে মোট জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি টাকা। তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের জমানো টাকা থেকে ‘লাভের গুড়’ খাচ্ছে কারা, প্রশ্ন এ কর্মকর্তার।
কেজিডিসিএল সুত্র জানিয়েছে, বাসা-বাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে গত আগস্ট মাসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নীতিমালা চূড়ান্তের কাজ সম্পন্ন করেছে। নতুন সংযোগ দেয়ার বিষয়ে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে জানানোর কথা থাকলেও এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়েজ আহমেদ।
জানা গেছে, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি শুরুর পর গ্যাস সংকট কেটে যাওয়ার প্রেক্ষিতে গত জুলাই মাসে আবাসিকে গ্যাস সংযোগের বন্ধ দুয়ার খোলার একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরকারের উপর মহল থেকে একটু আশার আলো দেখা দিলেও রহস্যজনক কারণে হঠাৎ করে সেই আলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
ফলে বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামের ২৫ হাজার গ্রাহকের আবেদন আটকা পড়ে আছে ১১ বছর ধরে। ওই সময় প্রায় দশ হাজার গ্রাহকের আবেদন আটকা পড়ে। শুধু নতুন সংযোগই বন্ধ থাকছে না, একই সাথে চুলা বাড়ানো (লাইন এক্সটেনশন) বন্ধ আছে ১১ বছর ধরে। এর আগে যখন বাসা-বাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ ছিল তখনও বিদ্যমান সংযোগে চুলা বাড়ানোর অনুমোদন দিত কেজিডিসিএল৷ কিন্তু পরবর্তীতে সব ধরনের সংযোগ ও চুলা বাড়ানো বন্ধ করে দেয়ায় হাজার হাজার মানুষ সীমাহীন সংকটে পড়েন।
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট খতিবের হাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ৫ তলা ভবনের দশটি ফ্ল্যাটে পাঁচটি পরিবারে পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ আছে। অন্য পাঁচটির নেই। সে পরিবারগুলো সিলিন্ডার কিনে রান্না-বান্নার কাজ সারছে। ১২ বছর আগে ডিমান্ড নোট বাবদ ২৫ হাজার টাকা করে ব্যাংকে জমা দিয়েছি। নতুন সংযোগের অপেক্ষায় কেটে গেল এক যুগ।
জানা গেছে, এভাবে চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন এলাকায় নতুন সংযোগ না পেয়ে হাজার হাজার মানুষ সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চরম ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেজিডিসিএল’র একজন কর্মকর্তা বলেন, গত জুলাই মাসে পেট্রোবাংলার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ দেয়ার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই নীতিমালা অনুসারে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়া গ্রাহকদের প্রথম দফায় গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সরকারের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে চট্টগ্রামের প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক গ্যাস সংযোগ পাবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।