রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

নির্বিচারে পাহাড় কেটে ‘জামায়াত নেতার’ মাটি বিক্রি, মরল শ্রমিক

| প্রকাশিতঃ ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১০:৩১ পূর্বাহ্ন


জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলের তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়া এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলছে। মাটি বিক্রি করতেই অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে এসব পাহাড়৷ জাহাঙ্গীর কাসেম নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই পাহাড় কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কাসেম একসময়ের দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে কক্সবাজার জেলা জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেন তিনি। সম্প্রতি আমার বাংলাদেশ পার্টিতে (এবি পার্টি) যুক্ত হয়েছেন জাহাঙ্গীর কাসেম। তবে এলাকায় এখনো ‘জামায়াত নেতা’ হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর কাসেম।

এদিকে ইট তৈরির মৌসুম শুরু হওয়ায় পাহাড় কাটা বেড়ে গেছে। পাহাড় কেটে মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে ৫ শতাধিক পাহাড় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত ৪ বছরে পাহাড় কাটার সময় মাটিচাপা পড়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার (১২ ডিসেম্বর) ভোররাত ৩ টার দিকে খুরুশকুলের তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ায় ‘জামায়াত নেতা’ জাহাঙ্গীর কাসেমের নেতৃত্বে পাহাড়া কাটার সময় মাটিচাপা পড়ে রহমত উল্লাহ (৩২) নামের এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহত রহমত উল্লাহ খুরুশকুল তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ার আলতাজের ছেলে।

খুরুশকুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন বলেন, প্রতিদিনের মতো শনিবার গভীর রাতে তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ার বেলালের পয়েন্টে পাহাড় কাটার সময় পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে এক শ্রমিক নিহত হয়েছে। পাহাড় খেকো জাহাঙ্গীর কাসেম ও মনিউল হকের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের হয়ে পাহাড় কাটতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি আরও বলেন, নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীর কাসেমের মালিকানাধীন ডাম্পারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে। পাহাড় কাটার বিষয়ে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করার পরও অভিযুক্তরা এখনো রাতের অন্ধকারে একের পর এক পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর কাসেম মুঠোফোনে বলেন, ‘আপনার সাথে যোগাযোগ করতে একজনকে বলছি। সে আপনার সাথে যোগাযোগ করবে।’ এটা বলেই সংযোগ বিছিন্ন করে দেন তিনি।

পরে এক মিনিট পর পাহাড় কাটায় আরেক অভিযুক্ত মনিউল হক এ প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডাম্পার নিয়ে গত শুক্রবার থেকে শ্রমিকরা কোথায় গিয়েছিল জানি না। এদের মধ্যে শনিবার একজনের লাশ পেয়েছি। বাকি দুইজনের ফোন এখনো বন্ধ পাচ্ছি।’ এসময় প্রতিবেদকের সহযোগিতা প্রয়োজন জানিয়ে বিকাশ নাম্বার চান মনিউল হক। কয়েকজন সাংবাদিক তার সাথে যোগাযোগ করেছিল তাদেরকেও টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন মনিউল।

অভিযোগ উঠেছে, মাটিচাপায় শ্রমিক নিহতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে মোটা অংকের প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন জাহাঙ্গীর কাসেম ও তার লোকজন। যদিও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে নিহতের পরিবারকেও দেয়া হয়েছে মোটা অংকের টাকা দেয়ার প্রস্তাব।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় নিহত শ্রমিক রহমত উল্লাহকে জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। তবে নিহতের ঘটনায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা বা অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনিরুল গিয়াস।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সদরের খুরুশকুলের বেশ কয়েকটি চক্র প্রতিনিয়ত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। এসব চক্র নিয়মিত পাহাড় কাটলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয় না প্রশাসন। ফলে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। দীর্ঘ বছর ধরে জাহাঙ্গীর কাসেম পাহাড় কাটার সাথে জড়িত। তার নেতৃত্বে খুরুশকুলে কমপক্ষে ৩০টি মতো পাহাড় কাটা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বনবিভাগের তথ্য ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নে পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র জামায়াত নেতা সরওয়ার কামাল, তার ভাই জয়নাল আবেদীন, সাবেক জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর কাসেম, মনিউল হক, খুরুশকুল কুলিয়াপাড়া এলাকার বিএনপি নেতার ছেলে জিয়াবুল হক, সাবেক ইউপি সদস্য মৃত আব্দু শুক্কুরের ছেলে নবাব মিয়া ও তার ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক মো. রফিক।

এ ছাড়াও সদ্য র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ আটক হওয়া বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন, চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি কায়সার আলম, তার ভাই মো. মামুন, জানাপাড়া এলাকার গিয়াস উদ্দিন, পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার শাহিন প্রকাশ বর্মাইয়া শাহিন, কুলিয়াপাড়া এলাকার আজিম বহদ্দার, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকার এবাদুল্লাহ, হামজার ডেইল এলাকার মো. রুবেল, মো. রফিক, পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার আব্দু শুক্কুর, একই এলাকার শফি প্রকাশ বর্মাইয়া শফি, সাহাব উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটার সাথে জড়িত। এদের বেশিরভাগের নামে পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলা রয়েছে।

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিশেষ টহল টিমের ইনচার্জ এ কে এম আতা এলাহী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কাসেম ও মনিউল হকের বিরুদ্ধে আগেও ওই এলাকায় পাহাড় কাটার দায়ে একাধিক মামলা করেছে বনবিভাগ। তাদের হয়ে পাহাড় কাটতে গিয়ে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি ওই এলাকায় পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে কক্সবাজারে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সংযুক্তা দাশ গুপ্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড় কাটতে গিয়ে শ্রমিক নিহতের বিষয়টি আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। যদি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার সাথে পাহাড় খেকোদের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার সুইটি একুশে পত্রিকাকে বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পাশাপাশি ওই এলাকায় পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে আগামী দুই-একদিনের মধ্যে অভিযান চালানো হবে। তাদের সাথে আঁতাতের প্রশ্নই আসে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।